Apan Desh | আপন দেশ

অস্থিরতা, পোশাক শিল্পে থাবা

ড. মাহবুব হাসান

প্রকাশিত: ১৩:৪৩, ২ নভেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৪:২০, ২ নভেম্বর ২০২৬

অস্থিরতা, পোশাক শিল্পে থাবা

ছবি: আপন দেশ

আমরা দেখলাম বেতন বাড়ানোর দাবিতে গামের্ন্ট শ্রমিকেরা গাজিপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেছিলো। আপাতত সেখানে অবরোধ নেই। সেখানে অনেক বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিকদের জন্য একটি বেতন কাঠামো কমিটি গড়ে দিয়ে সরকার বলেছে তারা ন্যায্য মজুরি পাবেন। পোশাক শ্রমিকদের দাবি তাদের বেতন মাসিক ন্যুনতম ৩০ হাজার করা হোক।

যদি তাদের জন্য ৩০ হাজার টাকা সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করা হয়, তাহলে কি সরকারের বা দেশের পোশাক শিল্পের ক্ষতি হবে? এ প্রশ্নের উত্তর হবে, ক্ষতি হবে, আবার হবেও না। দুইভাবেই এ দাবির বিষয়টি বর্ণনা করা যেতে পারে। ক্ষতি হবে গার্মেন্টস মালিকদের। তাদের গাটের ভেতরে জমে থাকা লাভ থেকে ওই বাড়তি অর্থ শ্রমিকের পকেটে যাবে। 

গার্মেন্ট মালিকদের বিত্তবান হওয়ার পেছনে কি কেবল তাদের বিনিয়োগই অবদান রাখছে? নাকি সে অবদানের পেছনে শ্রমঘন নারী/পুরুষ শ্রমিকদের অবদান সেখানে আছে? আপনার গার্মেন্টের মেশিনারিজ থাকলেও কিছুই উৎপাদিত হবে না, যতক্ষণ পর্য়ন্ত সে কারখানায় শ্রমঘন নারীপুরুষের কর্মদক্ষ হাত না লাগে। 

আপনি ফেব্রিকস আনেন বিদেশ থেকে, মোটা দামে কিনে। সেখানে তো তেমন কোনো বার্গেনিং চলে না। আপনি সেলাইয়ের সুতা কেনেন বিদেশ থেকে, সেখানেও আপনার কোনো তদবির তেমন কাজে লাগে না। তাহলে যে শ্রমিকের শ্রমে আপনার প্রোডাক্ট উৎপাদিত হয়, যা বিদেশে রফতানি করে আপনি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন, উৎফুল্ল হন, সে টাকার জোরে সমাজের একজন কেউকেটা (গোখরো সাপ) হয়ে সমাজকে শাসন করেন, তার সব অবদান তো ওই নারী/পুরুষ গার্মেন্ট শ্রমিকের। সেটা কি আপনি/আপনারা মনে রাখেন? আমি জানি বলবেন আপনার টাকায় তো কারখানা তৈরি হয়েছে। আসলে আপনি মিথ্যা বলছেন। আপনি কারখানা তৈরি করতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। সে ঋণ ফেরতের ব্যবস্থাও আছে। সে ঋণের কিস্তি ফেরৎ না দিতে পারলে তারা আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে।

এটাই একটি সিস্টেম। তবে, শ্রমিক দিয়ে কাজ করাটাও একটা সিস্টেম। কেবল এ সিস্টেমের বিরুদ্ধেই আপনাদের যত ক্ষমতার রোয়াব দেখান। সরকার সব সময় আপনাদেরই পক্ষে। কখনোই তা রাজনৈতিক বক্তৃতায় এটা বলবেন না। উল্টো বলবেন, শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকাবার আগেই তার পাওনা পরিশোধ করতে হবে। শ্রমিকের অধিকার সব কিছুর আগে। তারা সত্য বলেন। তারা ওই সব শ্রমিকেরই অভিভাবক। তারা দেশ ও রাজনৈতিক বিবেকের অভিভাবক। তারা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিরও অভিভাবক।

আরও পড়ুন<<>>কোন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জেন-জি?

তারপরও কথা থেকে যায়। কী সে কথা?
তারেক রহমানের সরকারের কাজ দেখে এটাই মনে হচ্ছে যে এবার সত্যই দেশ আমলাদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসছে। মেহনতি মানুষের জন্য, কম আয়ের মানুষের জন্য, নারী ও গ্রামীণ পুরুষের উৎপাদনের পক্ষে সরকার অসাধারণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। গরিব মানুষের নিত্যদিনের ক্ষতিকে যাতে আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে স্বস্তি ও শান্তিতে রাখা যায়, কৃষক কার্ড, শ্রমিক কার্ড, নারী ও মহিলাদের জন্য কার্ড---- অর্থাৎ উৎপাদক শ্রেণির ক্ষতিকে পোষানোর জন্য যে ইতিবাচক পদক্ষেপ তারেক রহমান নিয়েছেন, তা ৫৬ বছরের ইতিহাসে ছিলো না। এ ইতিহাস কি আমরা ভুলে যাবো? এ-দেশের উৎপাদক কৃষক শ্রমিকরা ভুলে যাবে? এদেশের খেটে খাওয়া কোটি কোটি জনতা কি ভুলে যাবে?

না যাবে না। তারা কেবল রাজনীতিকদের এ প্রণোদনাই মনে রাখবে না, তারা কথা বলার যে অধিকার, গণতান্ত্রিক সরকারের রাজনৈতিক চরিত্রের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও ভুলে যাবে না।

কেবল শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের বিষয়টি অবহেলিতই রয়ে গেলো। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন কাঠামো যখন আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছিলো, তখনও কারো মনে এ প্রশ্ন জাগেনি যে গার্মেন্ট সেক্টরের শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর কথা। তারা যে দেশের রেমিটেন্স যোদ্ধা, তারা যে প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে, সে কথাটাও তারা মনে রাখেননি। নন-প্রোডাকটিভ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বেতন বাড়ানোর সাড়া জাগানো খবর আমরা পড়েছি/জেনেছি। এবং সে রোয়েদাদের বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। কিন্তু গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য বেতনবাড়ানোর কোনো কাঠামো গঠন হয়নি। অবশেষে, যখন তারা কাজের জায়গায় না গিয়ে রাস্তায় জড়ো হলো, শ্লোগান দিতে থাকলো যে তাদের ন্যুনতম বেতন ৩০ হাজার করতে হবে, তখন টনক নড়লো আমলাকুল পরিবেষ্টিত রাজনৈতিক সরকারের।

আমলারা কী বিলিয়ন বিলয়ন ডলারের রেমিটেন্স আয় করে? নাকি আয় করে ও ই হতদরিদ্র শ্রমঘন গার্মেন্ট শ্রমিকেরা? এর জবাবে গার্মেন্ট মালিক দাবি করবেন তারাই করেন। আমলারাও বলবেন আমরাই চালাই তাদের। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে শ্রমিকেরাই ওই রেমিটেন্সের আসল মালিক। তাহলে সরকার কেন সামান্য বেতন বাড়ানোর দাবিকে মেনে নেননি?

গার্মেন্ট পরিবেশের পানি ঘোলা করার পর সরকার শ্রমিকদের জন্য বেতন কাঠামো ঘোষণা করেছেন। এ কাজটি তারা করতে পারতেন যখন আমলাদের বেতন রোয়েদাদ ঘোষণার সব কাজ করছিলো, সে সময়ই শ্রমিকদের জন্য বেতন কাঠামো ঘোষিত হলে, তারা রাস্তায় নামতে উৎসাহী হতো না। এবং তাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে পতিত স্বৈরাচারের নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র লীগ/যুবলীগের সন্ত্রাসীরা নামতে পারতো না। তারা শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে গিয়ে নেমেছে। কারণ সামনের মাসটি ডিসেম্বর, আর ওই মাসে পলাতকা হাসিনা দেশে আসবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলা করতে পারলে হাসিনার দেশে আসার পথ অনেকটাই পরিস্কার হয়। একজন মন্ত্রী বিএনপির বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলেছেন হাসিনার আশ্রয়দাতাদের পক্ষ থেকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের লোকেরাও প্রকাশ্যে উসকে দিচ্ছে।

এ সবই জানা হলেও গণতান্ত্রিক সরকার তেমন কোনো ভয় পায়নি বা গুরুত্ব দেয়নি। কেন না, হাসিনা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামি। দেশে আসলেই তাকে ওই দন্ড নিতে হবে। কিন্তু হাসিনা তো দন্ড নেবার জন্য রাজী নন। তিনি আবারো অবৈধ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির জোরে ক্ষমতায় বসতে চায়। আমরা বিশ্বাস করি, সেটা তিনি করতে পারবেন না। নরেন্দ্র মোদি যতোই মদদ দেন না কেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতি তার অভিলাষের পক্ষে নেই আর থাকবেও না। আট মাসের বিএনপি সরকার রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠার সব কাজ করে চলেছেন। কেবল পুলিশকে তিনি ব্যবহার করতে চাননি। পুলিশকে কঠোর হতে দেননি। এ সুযোগটাই আওয়ামি দোসর সন্ত্রাসীরা কাজে লাগিয়ে দেশে হত্যার দামামা বাজিয়ে তুলছেন।

এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, সরকার বুঝতে পারছেন যে নরোম আচরণ মানে দুর্বলতা ভেবেছে পতিত জনেরা। এটা ভাবেননি যে সরকার গণতান্ত্রিক পরিবেশের ভেতরে পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করতে চান না। কিন্তু আওয়ামি কালচার হচ্ছে দমন-পীড়নের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি, নৃশংসতাই তাদের অভিলাষ। তাই তারা ভেবেছিলো এ সরকার কঠোর ভূমিকা নেবে না। গাজিপুরে বিজিবি মোতায়েন দেখেই বোঝা যায় এবার আর কোনো রকম ছাড় দেবে না সরকার। আবার সংকটের মাথায় বেতন বাড়ানোর রোয়েদাদ কাঠামো ঘোষণা করে এটা প্রমাণ করেছে যে সরকার তাদের অধিকার ভুলে যায়নি।

আমরা কী চাই গার্মেন্ট শ্রমিকশ্রেণির জন্য? তাদের দাবি অনুযায়ী ন্যুনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হোক। এত কম টাকায় একটি পরিবারের সংসার চলতে পারে কি না আমলারা তা বুঝে দেখুক। সরকার নিজেও বুঝে দেখুক যে যারা এতো অবদান রাখছে, তাদের দাবি যাথর্থ কি না।

আপনারা তুলনাটি এভাবেও করতে পারেন যে নন-প্রোডাক্টটিভ খাতের সরকারি বেতন আর প্রোডাক্টিভ খাতের বেতনের পার্থক্য কতোটা। আবার এ চিন্তাই প্রাধান্য দিতে বলি যে গার্মেন্ট শ্রমিকরা হাড়ভাঙা শ্রম দিয়ে আয়ের যে পথ তৈরি করেছে, তা কিন্তু আমলারা করেননি করতে পারেননি। আমাদের আমলাকুলের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তারা সমাজবিচ্ছিন্ন এবং জনগণ বিচ্ছিন্ন শ্রেণি। তাদের রাজনৈতিক চরিত্র পানির মতো সোজা। যখন যে সরকার আসে তারা সে সরকারের সঙ্গেই তাল মিলিয়ে চলে। কিন্তু এবারই প্রথম আমরা দেখতে পাচ্ছি ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদের অধীনে থেকে তারা প্রশাসনিক ফ্যাসিবাদের মনন-মানসিকতায় সমৃদ্ধ হয়েছে। হাসিনা সরকার লুটপাটর যে দরোজা জানালা খুলে দিয়েছিলেন, তারা সে ওপেন মার্কেটটির হাল ধরতে চান। বর্তমান সরকারে তো জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছেন। জবাবদিহিতার চিন্তা আছে সরকারের। জনগণ যে সব বিশ্বাসের মুখে বিএনপিকে ভোট দিয়েছিলো, যে ৩১ দফার জন্য তারা বিএনপিকে বিজয়ী করেছে, সে ওয়াদা তো পূরণ করতে হবে।

সে ওয়াদার অনেক কিছুই করা হয়নি এখনো। সামনে তো আরও সাড়ে চার বছর আছে। সে সময়ের মধ্যে নিশ্চয় তারেক রহমানের সরকার লক্ষ্য পূরণে কামিয়াব হবেন। চাকরির সুযোগ তৈরি করার ব্যাপারে এখনো চোখে পড়ার মতো কিছু হয়নি। নতুন শিল্প কারখানা নির্মাণ আর নিয়োগই তরুণ সমাজের মধ্যে নতুন করে বিশ্বাস পোক্ত করবে। দেশের বিদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরিতে সময় লাগবে, কিন্তু বেকার জীবন তো তা মানতে রাজী নয়। তার মধ্যে গার্মেন্ট সেক্টরে যারা আওয়ামি লেসপেনসার/লেজুড় তারা তাদের কারখানা বন্ধ করে রেখেছে। ১৭ বছরের আয় দিয়ে পাঁচ বছর তারা চলতে পারবে---- এ চিন্তা থেকেই তাদের কারখানা অচল। আর যারা সচেতন দেশ ও জাতির জন্য, তারা কারখানা চালু করছে/রেখেছে।

বিষয়টি রাজনৈতিক নয়, এটা বুঝতে হবে সবাইকে। বিশেষ করে আওয়ামি চেতনার লোকদের। বিষয়টি রাজনৈতিক নয়, দেশের একান্ত উন্নয়নের, জনগণের জন্য যা জরুরি। রাজনৈতিক সরকার যাবে আসবে, কিন্তু দেশের স্বার্থ একই থাকবেই। সেখানেই প্রাধান্য দিতে হবে।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়