প্রতিকী ছবি
যুব হচ্ছে জীবনের একটা পর্যায়, যাকে সাধারণত কৈশোর থেকে যৌবনে উত্তরণের সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় ব্যক্তি পর্যায়ে বাড়তি কিছু সুবিধা ও অধিকার ভোগ করলেও মানুষ পূর্ণ বয়স্কের মর্যাদা পায় না। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘যুব’র ব্যাপ্তি ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়স পর্যন্ত। তবে বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত নরনারীকে যুবক–যুবতী বলে গণ্য করা হয়।
যেভাবেই তাদের সংজ্ঞায়িত করা হোক না কেন, যুবসমাজকে তাদের নিজের অধিকারের বিষয়ে সচেতন করতে হবে। তাদের একটি শক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। একটি সমাজ সভ্যতা এবং রাষ্ট্রের পরিবর্তন-পরিবর্ধন ভাঙা এবং গড়ার সবচেয়ে বড় কারিগর যুবসমাজ। কারণ তারুণ্য মানেই উদ্দীপনা, উৎসুক, কৌতূহলী। তারুণ্য মানে বাধা না মানা। তীব্র স্রোতে পাড়ি দেয়া-ই তরুণদের ধর্ম। তারুণ্য একটি অদম্য শক্তি, অপ্রতিরোধ্য ঝড়। একটি দৃপ্ত শপথ। এগিয়ে যাওয়ার দুরন্ত বাসনা। এক অপরাজেয় মনোভিত্তি। তারুণ্য হচ্ছে অসাধ্য সাধনের কারিগর। অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর সৃষ্টির উন্মাদনা-ই তারুণ্যের গৌরব। বদ্ধ কুঠিরের দুয়ার চূর্ণ করে যাওয়াটা এর অর্জন। চেতনাদৃপ্ত তরুণরা যখন জেগে ওঠে তখন সকল প্রতিবন্ধকতার সকল চড়াই-উতরাই মাড়িয়ে তারা বিজয় ছিনিয়ে আনে। তাদের ডায়েরিতে পরাজয়, হীনতা, নিচুতা নেই। বিজয়ের পুষ্পমালা তাদের পদচুম্বন করে। আর তারাই কেবল পারে জাতিকে একটি সোনালি সমাজ উপহার দিতে।
একটি সমৃদ্ধ, উন্নত ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনে যুবসমাজের ভূমিকা অপরিসীম। তারুণ্যের অদম্য শক্তি, সৃজনশীলতা, সাহস ও উদ্ভাবনী চিন্তাই পারে একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে। তাই জাতীয় যুব দিবস শুধু উদ্যাপনের দিন নয়, বরং যুবসমাজের স্বপ্ন, প্রত্যাশা, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
জাতীয় যুব দিবসে দেশের তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা অনেক। তাদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। শিক্ষিত ও দক্ষ যুবকদের একটি বড় অংশ এখনো বেকারত্বের বোঝা বহন করছে। প্রতিবছর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে অসংখ্য তরুণ কর্মজীবনে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকলেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে তাদের অনেকের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে। যুবসমাজ চায় যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার অনুকূল পরিবেশ।
বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। তাই যুবসমাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হলো আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ। শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং বাস্তবমুখী শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা, ভাষাগত যোগ্যতা এবং পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের বিশ্ববাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে গ্রাম ও শহরের তরুণদের মধ্যে প্রযুক্তিগত সুযোগের বৈষম্য দূর করার দাবি রয়েছে।
যুবসমাজের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। অনেক তরুণ নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে নতুন কিছু গড়ে তুলতে চান। কিন্তু পুঁজি, প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শের অভাবে অনেক উদ্যোগ শুরুতেই থেমে যায়। তাই তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, বিনিয়োগ সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
এ ছাড়া যুবসমাজ একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রত্যাশা করে। তারা চায় মাদক, সন্ত্রাস, সহিংসতা ও সামাজিক অবক্ষয়মুক্ত পরিবেশ। পাশাপাশি খেলাধুলা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, স্বেচ্ছাসেবা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের অংশগ্রহণের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।
দেশের উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ডে যুবসমাজের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও রয়েছে। তরুণদের মতামত, চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনায় যুব প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। কারণ, তরুণদের বাদ দিয়ে তরুণদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়।
তবে শুধু রাষ্ট্র বা সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। যুবসমাজকেও দায়িত্বশীল, মানবিক, দেশপ্রেমিক ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে থেকে জ্ঞান, দক্ষতা, সততা এবং পরিশ্রমকে জীবনের মূলমন্ত্র করতে হবে। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
জাতীয় যুব দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুবসমাজ কোনো দেশের বোঝা নয়, বরং সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করা গেলে তারাই হয়ে উঠবে উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির অন্যতম প্রধান শক্তি। তাই যুবসমাজের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং নেতৃত্ব বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, যুবসমাজের প্রত্যাশা পূরণ মানেই দেশের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা। তারুণ্যের শক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলেই গড়ে উঠবে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। জাতীয় যুব দিবসে এটাই হোক সবার অঙ্গীকার—যুবকদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি, তাদের মেধার বিকাশ এবং রাষ্ট্র গঠনে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































