Apan Desh | আপন দেশ

বিএনপি নেতা পিণ্টুর মৃত্যুবার্ষিকী আজ, ১১ বছরেও কূল কিনারা হয়নি মামলার 

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৩:৫০, ৩ মে ২০২৬

আপডেট: ১৪:৫২, ৩ মে ২০২৬

বিএনপি নেতা পিণ্টুর মৃত্যুবার্ষিকী আজ,  ১১ বছরেও কূল কিনারা হয়নি মামলার 

ফাইল ছবি

আজ ০৩ মে (রোববার) বিএনপি নেতা ও সাবেক এমপি নাসির উদ্দিন আহমেদ পিণ্টুর ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৫ সালের এদিনে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বিনা চিকিৎসার মারা যান তিনি। তাকে শ্লো পয়োজন প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে বলে পিন্টুর পরিবারের অভিযোগ। পাশাপাশি এ ঘটনায় রাজশাহী আদালতে দায়ের করা মামলাটিও গত ১১ বছরে কোনো সুরাহা হয়নি।

তৎকালীন এবং বর্তমানে কারাগারের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কারাগারের সেলেই আকস্মিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক এমপি নাসির উদ্দিন পিন্টু। মৃত্যুর সময় আদরের সন্তান, মা আত্মীয় স্বজন কিংবা স্ত্রীর মুখটা দেখারও সৌভাগ্য হয়নি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক এ সভাপতির। 

পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা অভিযোগ করে বলেছেন, আমার স্বামী মারা যাননি, সরকার পরিকল্পিতভাবে বিনা চিকিৎসায় তাকে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, পিন্টুকে মারার জন্য ঢাকা থেকে রাজশাহী নেয়া হয়েছে। তিনি জনপ্রিয় নেতা। তার জনপ্রিয়তা দেখে সরকার সিটি নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে নিয়ে হত্যা করেছে। তিনি মারা যাননি। শনিবার (০২ মে) পিন্টুর লালবাগের বাসায় সাংবাদিকদের কাছে এমন অভিযোগ করেন নাসিমা আক্তার কল্পনা।

পিন্টুর বোন নারী আসনের এমপি মিষ্টি দাবি করেছেন, হাইকোর্টের একটি আদেশ ছিল পিন্টুকে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেলে রেখে চিকিৎসা করানোর। আমরা আইজি প্রিজনকে এ আদেশের কপি দিলেও তা রাখেননি তিনি। অনুরোধ সত্বেও পিন্টুকে ঢাকা থেকে রাজশাহী নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে পিন্টুর বোন মিষ্টি বলেছেন, যারা এ ঘটনায় জড়িত তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। 

২০১৫ সালের ০৩ মে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পিন্টুর মৃত্যু ঘটে। তার মৃত্যুর খবর শোনার পর পরিবারসহ বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছিল। 

পিন্টুর ভাই রিন্টু দাবি করেছেন, অসুস্থতার কারনে পিন্টুকে কেন্দ্রীয় কারাগারের বাইরে না নেয়ার ব্যাপারে হাইকোর্টের নির্দেশনা ছিলো। কিন্তু এ নির্দেশনা মানা হয়নি। অবহেলার কারনেই আমার ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে। কান্না জড়িত কণ্ঠে রিন্টু সাংবাদিকদের বলেন, একজন ফাঁসির আসামীরও সুযোগ হয় স্ত্রী সন্তানদের সঙ্গে সাক্ষাত করার। আমাদের দুর্ভাগ্য ঢাকার বাইরের কারাগারে নেয়ার কারনে শেষ সময়ে তার সঙ্গে সাক্ষাত বা কথা বলার সে সুযোগ ছিলো না।

এদিকে কারাগারে নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর মৃত্যুর ঘটনায় রাজশাহীর আদালতে মামলা হয়েছে। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ২৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। আদালত মামলা গ্রহণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন। পিন্টুর ভাই নাসিম আহমেদ রিন্টু রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতে এ মামলা করেন। তার পক্ষে আদালতে এজাহার দাখিল করেন আইনজীবী ও তৎকালিন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ত্রাণ ও পূর্নবাসন বিষয়ক সহসম্পাদক শফিকুল হক মিলন। চিকিৎসার অবহেলায় পিন্টুর মৃত্যুর ঘটনায় মামলা দায়ের করার ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো সুরাহা হয়নি। পিবিআইর তদন্ত কর্মকর্তা এবিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজী হয়নি।   

এ মামলার আসামিরা হচ্ছেন, সাবেক এমপি শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ঢাকার সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, আসাদুজ্জামান কামাল, আনিসুল হক, হাজী মো. সেলিম, সোলায়মান সেলিম, ইরফান সেলিম, মনির হোসেন ওরফে কোম্পানি মনির ওরফে স্প্রিট মনির ও এএস শরিফ উদ্দিন ওরফে ব্ল্যাক শরিফ। এছাড়াও তৎকালীন আইজিপি, তৎকালীন আইজি প্রিজন, তৎকালীন ঢাকা ও রাজশাহীর ডিআইজি প্রিজন, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের তৎকালীন সিনিয়র জেল সুপার শফিকুল ইসলাম, জেলার শাহাদত হোসেন, কারা চিকিৎসক আবু সায়েম, কয়েদি রাব্বানী ও বিডিআর বিদ্রোহ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবু কাহার আকন্দকে আসামি করা হয়েছে। 

আরও পড়ুন<<>>‘স্বাধীনতার ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চায় একটি গোষ্ঠী’

ছাত্রদলের সভাপতি থাকা অবস্থায় ২০০১ সালের নির্বাচনে ঢাকার লালবাগ-কামরাঙ্গীরচর চর আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন নাসির উদ্দিন পিন্টু। পরে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হন। পিলখানা হত্যা মামলায় তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। এ ছাড়া একটি অস্ত্র লুটের দায়ে তার ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্রও জমা দিয়েছিলেন। তবে আদালতে সাজা হওয়ায় মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। ফলে নির্বাচন করতে পারেননি তিনি। 

নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল পিন্টুকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কয়েক দিন পরে তিনি অসুস্থ বোধ করলে  তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপর তাকে আবার কারাগারে নেয়া হয়। পরে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে চিঠি দিয়ে কারাগারে চিকিৎসক ডাকা হয়। চিঠি পেয়ে একজন চিকিৎসক গেলেও তাকে কারাগারে ঢ়ুকতে দেয়া হয়নি। ২০১৫ সালের ০৩ মে দুপুরে কারাগার থেকে পিন্টুকে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ কারণে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন-২০১৩ এর ৭ (১) ধারামতে আদালতে মামলার আবেদন করা হয়। 

পিন্টুর ভাই রিন্টু বলেন, আমার ভাইয়ের জনপ্রিয়তা ও বিএনপির প্রতি তার অবদানকে ভয় পাচ্ছিল হাসিনা সরকার। তাই তাকে পরিকল্পিতভাবে পিলখানা মামলায় ফাঁসিয়ে সাজা দেয়া হয়। এরপর কারাগারে নিয়ে হত্যা করা হয়। 

তিনি বলেন, গ্রেফতারের পর নির্যাতনের কারণে আমার ভাই প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তার সুচিকিৎসা নিশ্চিতে পরিবারের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছিল। হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ আই হসপিটালে নিজ খরচে তার নিয়মিত চিকিৎসা চলবে। কিন্তু হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে তাকে ঢাকায় না রেখে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ ও পরে রাজশাহী কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর তার চিকিৎসা না করে সুপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়। আইনজীবী আবদুল মালেক রানা জানান, আদালত মামলা গ্রহণ করে পিবিআইকে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। কিন্তু ঘটনার ১১ বছর অতিবাহিত হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। 

তৎকালিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী জানান, আদালতের রায়ের পর পিন্টুকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে নারায়নগঞ্জ কারাগারে প্রেরণ করা হয়। এরপর সেখান থেকে কাশিমপুর কারাগারে প্রেরণ করা হয়। পিন্টুকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে রাজশাহী সেন্ট্রাল কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

এবিষয়ে রাজশাহী কারাগারের ডেপুটি জেলার মিজানুর রহমান জানান, নাসির উদ্দিন পিন্টু দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। এর মধ্যে বুকে ব্যাথা, হার্টের রোগসহ নানা রোগে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। যে কারণে তাকে হাসপাতাল থেকে কারাগারে নেয়া হয়। ২০১৫ সালের ০৩ মে ভোরে তার বুকে ব্যথা অনুভূত হলে সকাল ১০টার দিকে আবারো হাসপাতালে নেয়া হয়। এরপর বেলা সোয়া ১২টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক পিন্টুকে মৃত ঘোষণা করেন।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়