মো. আতাউর রহমান
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে থেকেই বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। ২০২৪ সালের পর সংকটময় মুহূর্তে ব্যাংকটির হাল ফেরাতে এবং সাধারণ মানুষের আমানত রক্ষা করতে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছিল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু ঘটছে উল্টোটা।
যাদের ওপর ব্যাংকটিকে বাঁচানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, তারাই এখন ব্যাংকটি ধ্বংসের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। দায়গ্রস্থ ব্যাংকটির রক্ষকই এখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
ব্যাংকটির বর্তমান স্বতন্ত্র পরিচালক মো. আতাউর রহমানকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ৩৯২(ক) তম সভায় চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে উঠেছে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার, চরম স্বজনপ্রীতি এবং কোটি কোটি টাকার বিশাল নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ। তার এ লাগামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের আমানতে চলা এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংকটি ছিল ব্যাংকলুটেরা এস আলমের কব্জায়। তার অনিয়মের বর্নণা বলাবাহুল্য। গত প্রায় দুই বছর ধরে ব্যাংকটিতে ভিন্ন কায়দায় দুর্নীতির রাজত্ব চলছে। এর ফলে ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা চরম ক্ষুব্ধ ও জিম্মি হয়ে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানটিকে বাঁচাতে তারা এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
স্বজনপ্রীতির আড়ালে অনিয়মের শুরু অনুসন্ধানে জানা গেছে, চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেওয়ার পরপরই মো. আতাউর রহমান ব্যাংকটিকে নিজের পারিবারিক আখড়ায় পরিণত করার প্রক্রিয়া শুরু করেন। ব্যাংকিং খাতের কোনো ধরনের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তিনি তার নিজের পুত্রবধূ ও ভাতিজাদের ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন।
২০২৫ সালের শেষের দিকে চেয়ারম্যান তার পুত্রবধূ তানজিনা সুলতানা রিমাকে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যাংকে চাকরি দেন। ৩৮ বছর বয়সী এ নারীর কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তা সত্ত্বেও তাকে আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধাসহ মাসিক ৪০ হাজার ৯৫০ টাকা বেতনে ‘অ্যাসিসটেন্ট অফিসার’ পদে নিয়োগ দেয়া হয়। যার স্মারক নং- BCL/HO/HRD/24/2025/1480 এবং তারিখ: ২৬-১১-২০২৫। রাজধানীর রাজারবাগের বাসিন্দা হওয়ায় যাতায়াতের সুবিধার কথা বিবেচনা করে রিমাকে দিলকুশা শাখায় পদায়ন করা হয়।
এছাড়া ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা ছাড়াই চেয়ারম্যান তার ভাতিজা সাইফুল ইসলামকে ‘সিনিয়র অফিসার’ পদে নিয়োগ দেন। যার স্মারক নং- BCL/HO/HRD/24/2025/1250, তারিখ- ১৬-১০-২০২৫। সাইফুল ইসলামের জন্য মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৩,০০০ টাকা। যার মধ্যে বেসিক ৩০ হাজার, বাসা ভাড়া ১৩ হাজার ৫০০, এবং অন্যান্য ভাতা অন্তর্ভুক্ত)।

সাইফুল ইসলামের ঠিকানা মিরপুর-১২ নম্বরের সি ব্লকে। চেয়ারম্যানের আরেক ভাতিজাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সিকিউরিটিজ হাউজের সিইও পদে বসানো হয়েছে। এ স্বজনদের প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করা হচ্ছে এবং তাদের কথামতো অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গণ-পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ইতিহাসে এবার এক নজিরবিহীন ও কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটিয়েছেন চেয়ারম্যান আতাউর রহমান। তিনি ব্যাংকের সব নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে একযোগে ৩১৮ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছেন। ব্যাংকিং খাতে একসাথে এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার পদোন্নতির ঘটনা সত্যিই বিরল।
এ গণ-পদোন্নতির পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারি ও ঘুষ বাণিজ্য। অভিযোগ উঠেছে যে, এ বিশাল পদোন্নতি বহরের গুটি কয়েক ব্যক্তি ছাড়া বাকি প্রায় সবার কাছ থেকেই মোটা অঙ্কের ঘুষ নেয়া হয়েছে। পদোন্নতি পাওয়ার জন্য কর্মকর্তাভেদে ১ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ এ একটি খাত থেকেই কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।
পদোন্নতি বাণিজ্যের পাশাপাশি ব্যাংকে সমানতালে চলছে লাভজনক পদে পুনর্বাসনের তদবির ও বদলি বাণিজ্য। ব্যাংক ও ব্রোকার হাউজের প্রায় শতাধিক কর্মকর্তাকে সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে টার্গেট করে দূর-দূরান্তে বদলি করা হয়েছে। এ বদলি আতঙ্কের পেছনেও রয়েছে মোটা অঙ্কের টাকার খেলা। ব্যাংকের অডিট প্রধান সরোয়ার হোসেনকে বড় ধরনের অনিয়মের কারণে ধোলাইখাল শাখার ম্যানেজার হিসেবে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু মোটা অঙ্কের অবৈধ লেনদেনের বিনিময়ে তাকে আবারও আগের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ব্যাংকিং পাড়ায় অত্যন্ত জোরেশোরে চাউর রয়েছে যে, প্রায় অর্ধকোটি টাকার একটি বড় চুক্তির মাধ্যমে সরোয়ারের ফাইলটি পরিচালনা বোর্ডে তোলার জোর প্রস্তুতি চলছে। যদিও ব্যাংকের নির্বাহী পরিষদ এ অনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে।
আরও পড়ুন<<>> কমার্স ব্যাংকের ছায়া এমডি পুত্রবধূ, চেয়ারম্যান শ্বশুর
নতুন অর্ধশত নিয়োগে টার্গেট কোটি টাকা। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক যখন চরম তারল্য সংকট। এনবিআরের ৪৩ কোটিসহ ভয়াবহ আর্থিক মন্দায় জর্জরিত, তখন ব্যাংকের উন্নয়ন না করে নিজের পকেট ভারী করার এক নতুন মিশন হাতে নিয়েছেন চেয়ারম্যান। তিনি এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইভিপি) ও কার্ড ডিভিশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল পদে আরও অর্ধশতজন নতুন কর্মী নিয়োগ দিয়েছে-দিচ্ছে।
এ নতুন নিয়োগের মূল লক্ষ্যই হলো কোটি টাকার বাণিজ্য। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে পদভেদে অঙ্কে রফা করা হয়েছে। এ বিশাল নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার চূড়ান্ত ছক কষেছেন তিনি। এছাড়া একটি বিশেষ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এ নিয়োগে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে এ পদের জন্য মৌখিক পরীক্ষাও সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন চলছে চূড়ান্ত নিয়োগপত্র দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা। এ নিয়োগ সম্পন্ন হলে ব্যাংকের আর্থিক বোঝা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
ভয়ে মুখে কুলুপ কর্মকর্তাদের চেয়ারম্যানের এ দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যাংকের ভেতরে কেউ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এক অজানা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
ব্যবস্থাপনা শাখার জনৈক কর্মকর্তা বলেন, শুনছি- খুব শিগগিরই পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে নতুন বোর্ড গঠন করা হবে। হয়তো ২/৩ মাস লাগবে। তবে এরই মধ্যে চেয়ারম্যান স্যার নতুন নিয়োগ বাণিজ্যে নেমেছেন। বোর্ড ভাঙ্গার আগেই নিয়োগ কাজ শেষ করতে চান তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আপন দেশ’কে জানান, চেয়ারম্যানের যেকোনো অবৈধ সিদ্ধান্ত বা অনৈতিক আদেশের সামান্যতম বিরোধিতা করলেই মুহূর্তের মধ্যে দূরবর্তী কোনো শাখায় বদলির চিঠি ধরিয়ে দেয়া হয়। সৎ কর্মকর্তারা চাকরি হারানোর ভয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি বিধি বহির্ভূতভাবে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) জন্য বরাদ্দকৃত বিলাসবহুল গাড়িটি এখনো ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন চেয়ারম্যান আতাউর রহমান, যা সম্পূর্ণ ক্ষমতার অপব্যবহার।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
নিয়োগ বদলি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, যেকোনো ব্যাংক প্রয়োজনে নতুন নিয়োগ বা কর্মকর্তাদের বদলি করতে পারে। তবে প্রক্রিয়াটি অবশ্যই অত্যন্ত স্বচ্ছ হতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তা বাধ্যতামূলকভাবে জানাতে হবে। কমার্স ব্যাংকের এ সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি এখনো আমাদের নজরে আসেনি। অভিযোগ পেলে সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বিস্তারিত বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
চেয়ারম্যানের স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের বিষয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওবায়দুল হক প্রতিবেদককে বলেন, আমি এপ্রিলে যোগদান করেছি। আগের বিষয়গুলো খোঁজ নেয়া হয়নি। নতুন নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু জনবল নেয়া হচ্ছে তবে সংখ্যাটা এখন মনে নেই। তার জন্য বরাদ্দকৃত গাড়ী এখনো পাননি বলে জানান এমডি।
আলোচিত সিনিয়র অফিসার সাইফুল ইসলামের অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আমার পারসোনাল তথ্য আপনাকে দিতে সম্মত না।
সাধারণ মানুষের কষ্টের উপার্জিত আমানত নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলার শেষ কোথায় এবং এ বিশাল দুর্নীতি সিন্ডিকেটের সুরাহা কবে হবে- এখন এটাই কমার্স ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল প্রশ্ন।
আপন দেশ/এমবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































