ছবি : সংগৃহীত
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন শ্রমিক, শিক্ষক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কর্মীরাও। এতে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন। বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় সময় শনিবার (১৭ অক্টোবর) অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেফতার করেছে ফ্রান্সের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সহিংসতায় আহত হয়েছেন ১৫০ জন পুলিশ সদস্য।
ফরাসি সরকারের ভাষায়, বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতা আরও বেড়েছে। আয়োজকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর পাশাপাশি শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরাও বিক্ষোভে অংশ নেন। এদিন দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খবর বিবিসির।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানী প্যারিসে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। শহরের বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ও ভবনে আগুন দেয়া হয়। ঐতিহাসিক প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। আগুনে অন্তত একটি রেস্তোরাঁ পুড়ে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিসে বিকেলের মূল মিছিলটি অনেকটা শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। একদল তরুণ বলেন, তারা শান্তিপূর্ণভাবে পরিবর্তন চান, কিন্তু কিছুই এগোচ্ছে না। পরে কয়েকটি গোষ্ঠী সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। দাঙ্গা পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের দিকে এগিয়ে গিয়ে লাঠিপেটা করতেও দেখা যায়।
প্যারিসের বাইরে ফ্রান্সের আরও কয়েকটি শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। লিওঁ শহরের পর্যটন তথ্যকেন্দ্রে আগুন দেয়ার ঘটনাকে ‘শহরের জন্য একটি ট্র্যাজেডি’ বলে মন্তব্য করেছেন মেয়র গ্রেগরি দুসে। তিনি বলেন, ভবনটি ঐতিহাসিক ও সুপরিচিত হওয়ায় এ ঘটনায় শহরবাসীর হৃদয় ভেঙে গেছে।
স্থানীয় পুলিশের ভাষ্য, কিছু ব্যক্তি দমকলকর্মীদের আগুন নেভানোর কাজে বাধা দেন। লিমোজ শহরের সিটি হলেও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ভবনটির ছাদের একাংশ ধসে পড়ে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সাঁ-এতিয়েন শহরের মেয়র রেজি হুয়ানিকো জানিয়েছেন, গ্রেনেডের বিস্ফোরণে এক তরুণের হাত উড়ে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে তিনি বলেন, এমন মর্মান্তিক ঘটনা কখনোই ঘটা উচিত নয়।
আরও পড়ুন<<>>বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্যারিসের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও মার্সেই, রেন, তুলুজ ও আঞ্জে শহরে মুখোশধারী ব্যক্তিরা সহিংসতায় জড়ান। গ্রেনোবল, আভিনিয়োঁ, পো, মনপেলিয়ে ও ভালঁস শহরেও বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। প্যারিসে পোশাক ও খাবারের দোকানে লুটপাটের পাশাপাশি লিল শহরে অ্যাপলের একটি দোকানেও ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দূরবস্থা নিয়ে বিক্ষোভ
ফ্রান্সের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন। এসব বিদ্যালয়ে সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। শনিবার তাদের সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য ও অন্যান্য বিক্ষোভকারী গোষ্ঠী যোগ দেন।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে রয়েছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা ‘হলুদ জ্যাকেট’ আন্দোলনের সদস্যরাও। ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এক বছরের বেশি সময় ধরে চলেছিল এবং ফ্রান্সের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবাদ আন্দোলনগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিল।
সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গত ৮ অক্টোবর টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে অতিরিক্ত ৩ হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে তাতেও বিক্ষোভ থামেনি, বরং তা আরও তীব্র হয়েছে।
ফ্রান্সে বিক্ষোভ ও সহিংসতা নতুন ঘটনা নয়। তবে এবারের আন্দোলন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন দেশটির রাজনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা মেরিন লে পেন এবং কট্টর বামপন্থী দল লা ফ্রঁস আনসুমিজের নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।
বিক্ষোভে অংশ নেয়া মেলঁশোঁ পরে পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোরভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার অভিযোগ তোলেন। তবে তিনি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগেরও নিন্দা জানান। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু তার মন্তব্যকে ‘বিপজ্জনক ও কপটতাপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেন।
লেকর্নু বলেন, পুলিশকে অত্যন্ত তীব্র সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিছু গোষ্ঠী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে নিজেদের শক্তি যাচাইয়ের প্রস্তুতি হিসেবে বিক্ষোভকে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘কেউ সহিংসতার মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি চাপিয়ে দিতে পারবে না।
লে পেনের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের যৌক্তিক দাবিগুলো কট্টর বামপন্থীরা জিম্মি করে ফেলেছে। সহিংসতা উস্কে দেয়ার জন্য তিনি মেলঁশোঁকে দায়ী করেন।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, সরকারি কার্যালয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং সিটি হলে লুটপাটের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং শাস্তি দেয়া হবে।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































