সারা বিশ্ব ‘মা দিবস’ উদযাপনে ব্যস্ত। মাকে নিয়ে আবেগঘন পরিবেশের অবতারণা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। মায়ের স্মৃতি, স্বপ্ন, সংগ্রাম নিয়ে কথা চালাচালি চলছে। এমন আবহ যখন বিশ্বময়, তখন সন্তান হারানোর বিষাদে হাহাকার করছেন গাজার হাজারো মা। দখলদার ইসরায়েলি তান্ডবে সন্তানের রক্তে রঞ্জিত মরদেহ নিয়ে বিলাপ করছেন তারা। শুকিয়ে গেছে চোখের জল, ফুরিয়েছে ভাষা।
২০২৪ সালে এসেও ফিলিস্তিনি মায়েরা শত বছর আগের পরিস্থিতিতে দিনাতিপাত করছে! ছোট্ট একটি অবরুদ্ধ ভূখণ্ডে অভুক্ত পেটে, স্বামী-সন্তান-স্বজন হারানোর অব্যক্ত কষ্ট বুকে নিয়ে দিন পার করছেন তারা। গাজায় ফিলিস্তিনি মায়েরা কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তা তাদের না দেখলে বুঝা দায়।
মা দিবস গাজার ৩৩ বছর বয়সী মা আলা আল-কাতরাভির জন্য একদমই ভিন্ন অনুভূতি। চার সন্তান কারমেল, অর্কিড, কেনান ও ইয়ামিনকে হারিয়ে আলার সঙ্গী হয়েছে কান্না। আরবি সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী আলা গত ডিসেম্বরে স্বামী মুসা কান্দিল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এরপর স্বামী-সন্তানরা যে বাড়িতে ছিল, সেখানে ইসরায়েলি সৈন্যরা হামলা চালায়।
আরও পড়ুন>> ফিলিস্তিনের বিপক্ষে ভোট দিলো ৯ দেশ
আলার সন্তানরা ফোনে বলেছিল, ‘মা, আমাদের বাঁচাও, এখান থেকে বের করার চেষ্টা করো।’ আলা অসহায় বোধ করছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তারা আমার কাছে সাহায্য চাইছিল; কিন্তু আমি কিছুই করতে পারিনি। যখন তাদের সেই কাতর কণ্ঠস্বর মনে পড়ে, মরে যেতে ইচ্ছে হয়।’ চার সন্তানকে হারিয়ে তখন থেকে কান্নাই সঙ্গী আলার।
উম মোহাম্মদ সাবিহা মধ্য গাজা থেকে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন রাফাহ শহরে। তিনি বলেন, ইসরায়েলি আগ্রাসনে আমরা যে কঠিন পরিস্থিতিতে বাস করছি, তাতে আমি দুঃখিত একজন মা। আমার মনে আছে, আমাদের বাড়িতে মা দিবস উদযাপনের সুন্দর অনেক স্মৃতি রয়েছে।
তিনি জানান, ওই দিনটিতে তার সন্তানরা উপহার নিয়ে আসত; কিন্তু আজ এক দুঃখের দিন। সন্তানদের বাঁচাতে তারা রাফাতে এসেছেন। আবার এখান থেকেও পালাচ্ছেন।
ফিলিস্তিনি মায়েদের দুর্দশা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। বেশিরভাগ নারীই তাদের প্রিয়জন ছাড়া জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়েছেন। শহরজুড়ে খাদ্য সংকট, দুর্ভিক্ষ। কোথাও কোনো খাবার নেই। মাঝে মাঝে ত্রাণের গাড়ি আসলেও ধারেকাছে ঘেষতে পারছেন না নারীরা। যুদ্ধের মধ্যে এ আরেক যুদ্ধ।
নাজাহ আল-আক্কাদ (৭০) বলেন, আমার ছেলে আমাকে তিন নাতি-নাতনিসহ রেখে গেছে। ইসরায়েলি হামলায় আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছি। এখন আমার তিন নাতি-নাতনি বাকি আছে।
আরও পড়ুন>> ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের হুমকি বাইডেনের
তিনি জানান, সেখানে খাবার নেই, পানি নেই। বাজারেও পর্যাপ্ত খাবার নেই, কিছু কিছু দোকানে থাকলেও, আকাশচুম্বী দাম। বিশেষ করে গাজাতে নবজাতকদের দুধের হাহাকার সবচেয়ে বেশি। তাঁবুতে দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম আর রাতের বেলা প্রচণ্ড ঠান্ডা। এ যেন মায়েদের সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার এক যুদ্ধ।
ফিলিস্তিনি মায়েরা জানেন না কোনোদিন তারা জন্মভিটায় ফিরে যেতে পারবেন কিনা। সন্তান হারানো মায়েরা জানেন না কীভাবে নিজেদের সামলাবেন তারা। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি মা কঠিন সময় পার করছেন ধ্বংসস্তূপের মাঝে।
গত বছরের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনে অন্তত ৩৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যাদের সিংহভাগই নারী ও শিশু। মায়ের কোল ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে হাজার হাজার শিশু। এ হামলার ফলে অসংখ্য মা তাদের সন্তানদের হারিয়েছে, আবার হাজারও শিশু মা ও পরিবারকে হারিয়ে অনাথ হয়ে পড়েছে।
আপন দেশ/এসএমএ
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































