Apan Desh | আপন দেশ

গতি হারিয়েছে সাজিদ হত্যাকাণ্ডের বিচার!

ইবি প্রতিনিধি, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৪:২৯, ১৭ জুলাই ২০২৬

গতি হারিয়েছে সাজিদ হত্যাকাণ্ডের বিচার!

ছবি: আপন দেশ

হলের পুকুর থেকে ভাসমান অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার হওয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী শহীদ সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ঠিক এক বছর আগে এ দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হল-সংলগ্ন পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয় আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাজিদের মরদেহ। 

প্রথমে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও পরে ফরেনসিক ও ভিসেরা প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয় পানিতে ডুবে নয়, শ্বাসরোধ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে তাকে।

তবে হলের পুকুর থেকে সাজিদের ভাসমান মরদেহ উদ্ধারের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো হত্যার কূলকিনারা করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে সাজিদ হত্যার বিচার আদৌ হবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহ দানা বেঁধেছে। 

বিচার তো দূরের কথা, খুনিদের পরিচয়ও নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। প্রশাসনের একের পর এক আশ্বাস, তদন্তকারী সংস্থার দীর্ঘসূত্রতা আর অমীমাংসিত বিভিন্ন প্রশ্নের জালে আটকে আছে সাজিদ হত্যার বিচার কার্যক্রম। এদিকে আদরের একমাত্র পুত্র সন্তান হারিয়ে তিলে তিলে যেন শেষ হয়ে যাচ্ছেন সাজিদের মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যরা।

গত বছরের ১৭ জুলাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হলের পুকুর থেকে ভাসমান অবস্থায় সাজিদ আব্দুল্লাহর মরদেহ উদ্ধার করে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। ফরেনসিক রিপোর্টে সাজিদকে শ্বাসরোধ করে হত্যার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় গত ৪ আগস্ট ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় হত্যা মামলা করেন সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ দেলওয়ার। 

মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। মামলাটি প্রথমে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার পুলিশ তদন্ত করলেও পরে পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে সিআইডিতে চলে যায়। সে থেকে শুরু। সাজিদ হত্যার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের আশ্বাস আর সিআইডির "তদন্ত চলছে" বয়ানে ঝুলে আছে সাজিদ হত্যার বিচার কার্যক্রম। উপরন্তু সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন অমীমাংসিত প্রশ্ন৷

সাজিদের মরদেহ উদ্ধারের পরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ইবি শিক্ষার্থীরা। ১৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন চত্বরে দেখা যায় স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ সমাগম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ, প্রতিটি সেশন, প্রতিটি সংগঠনের সদস্যরা এসে জড়ো হয় প্রশাসন ভবনের সামনে। মুহুর্মুহু স্লোগান আর শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভ কাপিয়ে তোলে ক্যাম্পাস এলাকা। অবস্থা বেগতিক দেখে বিকালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের ১৫দফা দাবী মেনে নিয়ে স্বাক্ষর করে। অনেকেই ভেবেছিল, এহেন নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কোনমতেই ধামাচাপা পড়বে না, বিচার হবেই। কিন্তু হয়নি৷

সাজিদ হত্যার বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সময় ক্লাস পরীক্ষা বর্জন, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, প্রতীকী কফিন মিছিল, মুখে কালো কাপড় বেধে মৌন কর্মসূচি সহ বিভিন্ন উপায়ে সহপাঠী হত্যার বিচার চেয়ে প্রশাসনের দ্বারে ঘুরতে দেখা যায় ইবি শিক্ষার্থীদের। 

তবে হত্যার এতদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো সন্দেহভাজন হিসেবেও কাওকে গ্রেফতার করতে পারনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উপরন্তু ক্যাম্পাস অস্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে আন্দোলন দমাতে তৎপর হয় প্রশাসন এবং ছাত্রনেতাদের একটি মহল। হত্যার বিচার চেয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ায় নজিরবিহীন ভাবে শোকজ করা হয় দুই ছাত্রনেতাকে। এছাড়াও বিভিন্ন সময় আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা শিক্ষার্থীদের দেয়া হয় বিভাগীয় এবং মানসিক চাপ।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা যেন প্রশাসনকে বেকায়দায় ফেলতে না পারে সেজন্য অনেকটা প্রশাসনের প্রেস্ক্রিপশনেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করার গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে তা আবদ্ধ করা হয় আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ব্যানারে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে ডেকে নিয়ে প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর, রাজনৈতিক ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে সাজিদের বন্ধু ইনসান ও অন্যান্যদের চাপ দিয়ে বাধ্য করা হয় আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দিতে। এরপর আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে আল কুরআন বিভাগ কয়েকদিন মহাসমারোহে আন্দোলন করলেও কয়েকদিন পর তা আমেজ হারায়। এভাবে একপর্যায়ে হারিয়ে যায় সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যার বিচার দাবিতে করা আন্দোলনের গতি। 

আরও পড়ুন<<>>সএসসির ফল প্রকাশের সম্ভাব্য সময় জানাল শিক্ষা বোর্ড

ঘটনার পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল ঘটনাকালের সিসিটিভি ফুটেজ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে ফুটেজ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কোথাও বলা হয়েছে ফুটেজ নেই, কোথাও প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা এসেছে, আবার কোথাও আংশিক তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে সিসিটিভি রহস্যেরও কোনো স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সামনে আসেনি। ফলে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রশ্ন থেকেই গেছে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আলামত আদৌ সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না।

এদিকে হত্যার তদন্তের কাজে ইবি থানা ও সিআইডি অনেকটা ব্যর্থ হলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে। তাতে দেখা যায়, সাজিদ হত্যার পরে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাজিদের ব্যবহৃত শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ১০৯ নং কক্ষটি থেকে কোন আলামত পাওয়া যায় কি-না দেখতে বেডটি উলটপালট করে এবং ওই অবস্থায় কক্ষটি সিলগালা করে রাখা হলেও দ্বিতীয় দফায় ২৩ জুলাই সংশ্লিষ্টরা যেয়ে সাজিদের রুমটি পরিপাটি অবস্থায় দেখতে পান। 

প্রশাসনের অগোচরে রুমে তৃতীয় কারো প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে বলে সন্দেহ হলে ওই রুমের সিলগালাকৃত তালার চাবির খোঁজ করা হয়। এ সময় জানা যায়, মরদেহ উত্তোলনের পর সাজিদ আব্দুল্লাহর ব্যবহৃত রুমটি তাৎক্ষণিকভাবে তালাবদ্ধ করে সিলগালা করার জন্য যে তালাটি রুমে লাগানো হয়েছিল সে তালাটি হল মসজিদের। 

উক্ত তালার তিনটি চাবি, যার একটি চাবি হলের একজন কর্মচারীর নিকট, একটি হল মসজিদের ঈমামের নিকট এবং অপর চাবিটি সাদ্দাম হোসেন হলে অবস্থানরত একজন ছাত্রের নিকট রয়েছে বলে উঠে এসেছে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্টে। 

এছাড়াও, ওই সময় রুমে কে প্রবেশ করেছে তা জানতে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি হলের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সিসিটিভি ফুটেজ স্থাপনকারী টেকনিশিয়ান জানান, ক্যামেরা স্থাপনের পর (১৯ জুলাই) হল প্রভোস্ট যাতে অ্যনড্রোয়েড ফোনে সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে সেজন্য নির্দিষ্ট পাসওয়ার্ড সেট করা হয়েছিলো। কিন্তু ২০ জুলাই কে বা কারা এ ক্যামেরার পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে ক্যামেরার নিয়ন্ত্রন প্রভোস্টের মোবাইল নাম্বার হতে তার নিজের নাম্বারে পরিবর্তন করে দিয়েছে।

এতে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হওয়ায় ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি নতুন করে যে মোবাইল নাম্বর সেট করা হয়েছে সে নাম্বারে ফোন করে। তখন জানা যায়, উক্ত নাম্বারটি হলের একজন থোক বরাদ্দের কর্মচারী মো. আব্দুল কাদেরের। তবে কেন তিনি সিসি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ প্রভোস্টের ফোন থেকে নিজের ফোনের নিয়েছেন সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি কমিটির নিকট এর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি বলে উল্লেখ করেছে প্রশাসনের গঠিত কমিটি। পরবর্তীতে সিআইডি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর এ ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে কি-না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

হলের ওই কর্মচারীকে চাপ দিলে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা সাজিদের পরিবার, সহপাঠী ও শিক্ষার্থীদের। এছাড়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপের মুখে কিছুদিন পরপর ইবির প্রক্টর অফিসে সিআইডির ব্রিফিংয়ের আয়োজন করলেও প্রায় একইধরনের আশাবাদ একাধিকবার ব্যক্ত করায় তা শিক্ষার্থীদের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ আছে সে আপডেট ব্রিফিংও। হত্যার ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তদন্ত কর্মকর্তা পর্যন্ত পরিবর্তন করা হয়। তবে তাতেও মেলেনি খুনির সন্ধান।

সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ দেলওয়ার বলেন, এক বছর হতে চলেছে আমার ছেলের বিচার এখনো হলো না। তাহলে কি বিচার হবে না? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন - পুলিশ প্রশাসন কেউ কিছুই এখনো জানাতে পারেনা। আমি নিজেই মাঝে মধ্যে ফোন দেই কিন্তু তারা কোনো খোঁজ নেয়না। শিক্ষার্থীরা নাকি ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি করেছিলো, সে ব্যাপারেও প্রশাসনের কেও কিছু বলেনি। মাঝে মধ্যে শুধু ছাত্র সংগঠনের কেউ কেউ খোঁজ নেয়। এতগুলো মানুষের মধ্যে থেকে আমার ছেলেটাকে মেরে ফেলা হলো, অথচ কেউ কিছুই দেখলো না? সিআইডি কে ফোন দিলে বলে তদন্ত চলছে। বছরের পর বছর যদি তদন্ত চলতেই থাকে তাহলে বিচার হবে কবে?

এছাড়া বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বেশ কিছু প্রশ্নের ব্যাপারেও বলেছেন সাজিদের বাবা। তার মতে, ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্টে কিছু সন্দেহের ইঙ্গিত আছে। ওরে রুমে কেও একজন ঢুকেছে, সিসি ক্যামেরার কন্ট্রোল নিয়েছে। এটা তো সন্দেহের। আবার ঘটনার দিন রুমমেটরা কেও ছিল না, এটাও বা কেমন। আবার আশপাশের রুমে তো কেও না কেও ছিলো। তারাই বা কী বললো, কী করলো জানিনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে এতগুলো ছেলেমেয়ে, কেওই কিছু জানে না - এমন তো হতে পারে না। 

তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে বর্তমানে মামলার দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা সিআইডি ইন্সপেক্টর মহব্বত হোসেন বলেন, আমি এ মামলার দায়িত্ব পেয়েছি ১ মাস আগে। মামলার তদন্ত চলমান। তদন্ত চলাকালীন অবস্থায় কোনো তথ্য জানানো সম্ভব না। তবে আমরা সাক্ষ্য নিচ্ছি, জিজ্ঞাসাবাদ করছি, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এনালাইসিস করছি। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কতদিন সময় লাগতে পারে সেটি নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না। তবে কোনো ধরনের ক্লু পেলে আমরা দ্রুত সমাধান করতে পারবো ।

আপন দেশ/জেডআই

 

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়