ছবি: আপন দেশ
জামালপুর সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিআটা গ্রামের একটি সড়ক। এমপির উপস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধন, মিষ্টিমুখ, উন্নয়নের আশ্বাস সবকিছুই ছিল। কিন্তু উদ্বোধনের কয়েক দিনের মধ্যেই সে সড়কের ইট একে একে খুলে ট্রাক ও ট্রলিযোগে সরিয়ে নেয়া হয়। আজও সেখানে পাকা সড়ক নির্মাণ শুরু হয়নি।
পরে জানা যায়, যে কাজের উদ্বোধন করা হয়েছিল, সে কাজের কোনো সরকারি প্রকল্পই অনুমোদিত হয়নি, হয়নি কোনো দরপত্রও। ঘটনার পর এটিকে প্রথমে সাধারণ ইট চুরির ঘটনা মনে করা হলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও বিস্ময়কর তথ্য।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশাসনের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, সুবিধাভোগী এবং সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
টেন্ডার নেই, প্রকল্প নেই—তবু উদ্বোধন!
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত মে মাসে পাকুল্যা-ভাঙ্গুনী ঘাট থেকে গজারিআটা ভাঙা ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়ক পাকা করার ঘোষণা দিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জামালপুর-৫ (সদর) আসনের এমপি শাহ মো. ওয়ারেছ আলী (মামুন), স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাকর্মীরা।
কিন্তু উদ্বোধনের পরদিন থেকেই কথিত ঠিকাদারের লোকজন রাস্তার সলিংয়ের ইট খুলে নেয়া শুরু করে। কয়েক দিনের মধ্যে পুরো সড়কের ইট উধাও হয়ে যায়। এরপর আর কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। পরে এলাকাবাসী এলজিইডিতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ওই সড়কের জন্য কোনো প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি এবং কোনো দরপত্রও আহবান করা হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অনুমোদন ছাড়া একটি উন্নয়নকাজের উদ্বোধন কীভাবে হলো?
ইট সরানোর পর শুরু দ্বন্দ্ব, সামনে আসে নতুন তথ্য
হবদেশ এলাকা থেকে মেঘার বাড়ি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার অংশের ইট অপসারণকে কেন্দ্র করে পরে স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। মূলত বালু সরবরাহের অর্থ লেনদেন ও সুবিধাভোগীদের দ্বন্দ্ব থেকেই ঘটনার নেপথ্যের তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করে।
দিগপাইত ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জালাল মিয়া (জালু) বলেন, তিনি নির্মাণশ্রমিক ও ঠিকাদারি কাজ করেন। তার ভাষ্য, এমপি উদ্বোধনের দুই দিন পর আমিনুল ইসলাম মান্না তাঁকে ডেকে বলেন, তিনি দুটি রাস্তার কাজ পেয়েছেন এবং শ্রমিক লাগবে।
জালালের দাবি, ১৫ ট্রাক বালু সরবরাহ করেছিলেন দিগপাইত ইউনিয়ন মৎস্যজীবী দলের সভাপতি নজরুল ইসলাম ও স্থানীয় যুবদল নেতা লালন। পরে মান্না তার হাত দিয়েই বালুর বিল পরিশোধ করান এবং পরবর্তীতে ওই দুই ব্যক্তিকে আর বালু দিতে নিষেধ করেন। এর জেরে ছোনটিয়া বাজারে তাকে মারধরের শিকার হতে হয়। বিষয়টি এমপির কাছেও বিচার দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তবে সড়কের ইট অপসারণের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তদন্তে ‘চিরকুট’, তাতে বিএনপির একাধিক নেতার নাম
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মূল অভিযুক্ত আবদুল মান্নানের ব্যবহৃত একটি ফাইল থেকে হাতে লেখা একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। ওই চিরকুটে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আশেক মেম্বার, সাধারণ সম্পাদক জালাল মিয়া, সহসভাপতি রাজন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফালু, যুবদল নেতা জনি এবং শ্রমিকদল নেতা আলকেছের নাম লেখা রয়েছে।
আরও পড়ুন<<>>রূপালী লাইফের দুর্নীতি: ২৮ কোটি ভুয়া আয়, ৩২ কোটি গোপন ব্যয়
তদন্তকারীরা চিরকুটটির উৎস, উদ্দেশ্য এবং ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ক যাচাই করছেন। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এর সত্যতা নিশ্চিত হয়নি।
ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আশেক মেম্বার বলেন, আমি কোনোভাবেই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। পরিকল্পিতভাবে আমার নাম জড়ানো হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সুবিধা নিয়েছেন প্রভাবশালীরা
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ইট অপসারণের পুরো সময় স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী মান্নানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। শুধু ইট বিক্রি নয়, বালু ভরাটের সুবিধাও কয়েকজন পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের পর দিন প্রকাশ্যে ট্রাকে ইট বহন করা হলেও প্রশাসন কিংবা দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সময়মতো পদক্ষেপ নিলে সরকারি সম্পদের এত বড় ক্ষতি হতো না।
একই কৌশলে আরও সড়ক, হাতে-নাতে আটক ১১ জন
গজারিআটার ঘটনার পর একই কৌশলে সদর উপজেলার চাঁদপুর এলাকায় আরেকটি সড়কের ইট খুলে নেয়ার সময় স্থানীয়রা সন্দেহ করেন। গত ১৬ জুন এলাকাবাসী প্রতারক চক্রের ১১ সদস্যকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
পুলিশ জানায়, চক্রটির মূল হোতা সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামের আবদুল মান্নান (৫০)। দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকার পর এলাকায় ফিরে নিজেকে ঠিকাদার পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রতারণা শুরু করেন। বর্তমানে তিনি জামিনে মুক্ত থাকলেও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
নারায়ণপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মঞ্জুরুল খান বলেন, গজারিআটার ঘটনায় আলাদা মামলা না হলেও চাঁদপুরের ঘটনায় ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তদন্তে প্রতারণার নানা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
দুর্ভোগে কয়েক হাজার মানুষ
পাকুল্যা-ভাঙ্গুনী ঘাট থেকে গজারিআটা ভাঙা ব্রিজ পর্যন্ত সড়কটি গজারিআটা, গুপীনাথপুর, হাটুভাঙ্গা, ডুয়াইলপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামের প্রধান যোগাযোগপথ। ইট তুলে নেওয়ার পর বর্ষায় সড়কটি কাদাময় ও গর্তে ভরে গেছে। যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ। শিক্ষার্থীরা হেঁটে স্কুল-কলেজে যাচ্ছে। কৃষকরা অতিরিক্ত খরচে ফসল বাজারে নিচ্ছেন। জরুরি রোগী পরিবহনও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এমপির বক্তব্য
এমপি শাহ মো. ওয়ারেছ আলী (মামুন) বলেন, প্রথমে তিনিও বিষয়টি বুঝতে পারেননি। পরে আরেকটি সড়কের বিষয়ে জানতে চাইলে এলজিইডি ও ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন কোনো দরপত্র হয়নি। তখন সন্দেহ হলে দলীয় নেতাকর্মীদের সহায়তায় প্রতারক চক্রের সদস্যদের আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
প্রশাসন যা বলছে
এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ বলেন, সদর উপজেলার তিনটি সড়কের ইট অপসারণের ঘটনায় মামলা হয়েছে। বর্তমানে এসব সড়কে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প চলমান নেই। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতার বলেন, উদ্বোধনের বিষয়টি তিনিও আগে জানতেন না। পরে খোঁজ নিয়ে প্রকল্প না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে এমপিকে জানান। এরপর প্রতারক চক্রকে গ্রেফতার করা হয়।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































