ছবি : আপন দেশ
ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক। একই বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যানও তিনি। পদোন্নতি ও চাকরি স্থায়ীকরণে ‘ভুয়া প্রকাশনার তারিখ’ ব্যবহার ও জার্নালের মেটাডেটা জালিয়াতির অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি তাকে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। জালিয়াতির অভিযোগ উঠা ব্যক্তিকে ইউজিসির গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া নিয়ে চলছে সমালোচনার ঝড়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, জার্নালে ‘নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লেখা প্রকাশিত হয়েছে’ এমন তথ্য জালিয়াতি করে পদোন্নতি ও চাকরি স্থায়ীকরণের অভিযোগ ওঠে অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে সময়মতো লেখা প্রকাশ করতে না পেরে সংশ্লিষ্ট জার্নালের এডিটরের সঙ্গে যোগসাজশে ‘অনৈতিক পন্থায় ভুয়া তারিখ’ দেখিয়ে চাকরি স্থায়ী ও বিভাগে জ্যেষ্ঠতা ধরে রাখার অভিযোগ তুলেছেন নিজ বিভাগে শিক্ষক ও কই বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম।
ড. মামুনের এমন জালিয়াতি নিয়ে গত বছরের মার্চে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম। অভিযোগপত্রের সঙ্গে তিনি একাধিক প্রমাণাদিও যুক্ত করেন।
ঢাবিতে চাকরি স্থায়ীকরণের নিয়ম হলো, প্রার্থীর পদোন্নতির ঠিক এক বছরের মধ্যে ডিজিটাল অবজেক্ট আইডেন্টিফায়ার (ডিওআই) সংবলিত জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে হবে। জার্নালের ইস্যু, ভলিউম, মাস মুখ্য নয়। জার্নাল প্রকাশিত হতে হবে ওই নির্দিষ্ট প্রবেশন সময়ের মধ্যে। কিন্তু ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পদোন্নতি প্রাপ্ত হন ড. মামুন এবং ২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তারিখের মধ্যে প্রকাশিত প্রবন্ধ জমা দেয়ার কথা ছিল তার। তবে ওই সময়ের মধ্যে প্রকাশনা জমা দিতে পারেননি তিনি।
এমনকি জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের তিনজন শিক্ষক একই দিনে সহযোগী অধ্যাপক হন এবং একই তারিখে সবার প্রবেশন দেয়া হয়।
ঢাবির চাকরি বিধি অনুযায়ী, চাকরি কনফার্মেশনের নির্দিষ্ট সময়ে যদি জ্যেষ্ঠ কেউ প্রবন্ধ প্রকাশনা করতে না পারেন এবং অন্যরা করে ফেলেন, তবে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অন্যদের থেকে জুনিয়র হয়ে যাবেন।
২০২৩ সালের ২৯ মে স্থায়ীকরণ কমিটির সভা হয় এবং ড. মামুনের প্রবন্ধ বিলম্বে প্রকাশিত হওয়ায় (সোশ্যাল সায়েন্স রিভিওয়ের একটি প্রবন্ধের অ্যাকসেপট্যান্স লেটার জমা দেয়া হয়) তাকে বাকি দুজন থেকে জুনিয়র করা হয়।
বিষয়টি জানতে পেরে ড. মামুন ‘জার্নাল অব গভর্ন্যান্স, সিকিউরিটি অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট’র এডিটরের যোগসাজশে একটি প্রবন্ধ প্রথমে অনলাইনে প্রকাশ করেন এবং সেখানে প্রকাশের তারিখ দেখান ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি এবং ওই ভুয়া তথ্য দিয়ে নতুন করে এ প্রবন্ধ জমা দিয়ে তিনি চাকরিতে স্থায়ী হন ও অন্য দুই শিক্ষকের থেকে জ্যেষ্ঠ হন। কিন্তু ঢাবিতে স্থায়ীকরণের সময় ডিওআই-সংবলিত প্রবন্ধ চাওয়া হয়, যেন কেউ প্রবন্ধ প্রকাশের তারিখ নিয়ে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন বা জালিয়াতি করতে না পারেন।
এ বিষয়ে ওই সময় গণমাধ্যমকে অভিযোগকারী জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সুস্পষ্টভাবে জার্নাল প্রকাশের তারিখ জালিয়াতি হয়েছে। ড. মামুনের এ প্রবন্ধ যদি ২০২৩-এর ১ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়ে থাকে, তবে ২০২৩-এর ২৯ মে স্থায়ীকরণের আগে তিনি এই প্রবন্ধ জমা দিলেও কেন চাকরি স্থায়ীকরণ হয়নি? কারণ তখন ওই ডিওআই দিয়ে অনলাইনে প্রকাশিতই হয়নি, যা মেটা ডেটা দেখলেই প্রমাণ পাওয়া যায়। সে এ প্রবন্ধে রেজিস্ট্রেশন করেছেই ২০২৩-এর ১ জুন। তাই এর আগে অনলাইনে প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘ড. মামুন ২০২৩-এর ২৯ মে স্থায়ীকরণ সভায় যখন দেখলেন, প্রকাশিত প্রবন্ধ জমা দিতে পারেননি এবং জুনিয়র হয়ে গেলেন, তখন তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নিলেন। ওই প্রবন্ধের মেটা ডেটা চেক করে দেখা যায়, তিনি ডিওআইয়ের জন্য আবেদন করেছেন ২০২৩-এর জুন মাসের ১ তারিখ এবং সেদিনই তার প্রবন্ধ অনলাইনে আসে।’
আরও পড়ুন : দীর্ঘ ছুটিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
তিনি আরও বলেন, ‘তার এই লেখা অনলাইনে তার স্থায়ীকরণ শর্তানুযায়ী ২০২৩-এর ২২ ফেব্রুয়ারি প্রায় সোয়া তিন মাস পর প্রকাশিত হয়। ওই জার্নালের হার্ড কপিতেও এই একই ডিওআই নম্বর দেয়া আছে। এর অর্থ হলো ২০২৩-এর ১ জুন ডিওআই নম্বর পাওয়ার পরই হার্ডকপি প্রিন্ট করা হয়েছে। এর আগে ডিওআই-সংবলিত জার্নাল প্রিন্ট করা অসম্ভব।’
এ বিষয়ে ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগটি মিথ্যা। যিনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তিনি যখন সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক হন, পদোন্নতি বিষয়ে একটি আর্টিকেল জমা দিতে হয়। অগ্রহণযোগ্য জার্নাল লেখার কারণে তাকে কিন্তু শাস্তিস্বরূপ ২টি আর্টিকেল জমা দিতে হয়েছে। উনি আওয়ামীপন্থি শিক্ষক, ৪ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল, শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয় ও তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে উনাকে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখে ঢাবি প্রশাসন। পরবর্তীতে তাকে অ্যাকাডেমিক কাজে যুক্ত করা হলেও, চেয়ারম্যানশিপ থেকে তাকে দূরে রাখা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার আর্টিকেলটির বিষয়ে বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএনডি কমিটি করা হয়, সে কমিটিতেও উনি সিএনডির মেম্বার ছিলেন। তাহলে কেন আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে। একজন লেখক শুধু লেখা জমা দেবে, তবে ডিওআই নম্বর কর্তৃপক্ষ দেয়। ডিওআই নম্বর কোন মাসে নিয়েছে এটা কর্তৃপক্ষের বিষয়। আমার আর্টিকেল যখন অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে, সেটা জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়েছে। হার্ডকপি অনলাইনে পাবলিশ হওয়া এক জিনিস ও ডিওআন থাকা না থাক অন্য জিনিস। এখানে কোনো রকম তথ্য গোপন করার সুযোগ নেই।’
এদিকে, শনিবার (২৩ মে) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. নেছার উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে মামুনকে ইউজিসি সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
আরও পড়ুন : পশুর হাটে ভেটেরিনারি চিকিৎসাসেবায় বাকৃবি শিক্ষার্থীরা
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন আদেশ, ১৯৭৩ (রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর-১০/৭৩)-এর সংশোধিত আইন, ১৯৯৮-এর ২ (বি) ধারা অনুযায়ী ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন, প্রফেসর, ডিপার্টমেন্ট অব জাপানিজ স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে ৪ বছরের জন্য নিম্নবর্ণিত শর্তে নিয়োগ প্রদান করা হলো।
অধ্যাপক মামুনের এ নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকে বলছেন, গুরুতর অভিযোগ থাকা এমন ব্যক্তি কীভাবে ইউজিসির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পায়? তাকে নিয়োগ দেয়ার আগে সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই যাচাই-বাচাই করা উচিত ছিল।
আপন দেশ/এনএম
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































