ছবি: আপন দেশ
ফসল তোলার অপেক্ষায় ছিলেন রাজশাহীর পবা উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চলের কৃষকেরা। পটল, শসা, করলা, লাউ, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও টমেটোর খেতজুড়ে ছিল সবুজের সমারোহ। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে সবুজ খেতের চিত্র বদলে গেছে।
কোথাও কোমরসম পানি, কোথাও পচে যাওয়া গাছ। পানিতে ডুবে থাকা জমি থেকে নষ্ট গাছ তুলে ফেলছেন কৃষকেরা। কেউ আবার জমি থেকে পানি সরিয়ে বাকি ফসলটুকু বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
পদ্মার পানি বাড়ায় পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের আলিমগঞ্জ ও কসবা এলাকার চরাঞ্চলের বেশ কিছু সবজিখেত প্লাবিত হয়েছে। এতে ফসলের পাশাপাশি কৃষকের বিনিয়োগও হুমকির মুখে পড়েছে। ফসল ঘরে তোলার আগেই এমন ক্ষতিতে ধারদেনা ও বিনিয়োগের টাকা কীভাবে উঠবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা।
সরেজমিনে কসবা ও আলিমগঞ্জ এলাকার চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, নিচু জমিগুলোর বেশির ভাগই এখনো পানিতে সয়লাব। আগাম জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি ও টমেটোর অনেক গাছ পচে গেছে। পটল, করলা, লাউ ও শসার মাচাও পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে। কোনো কোনো জমিতে কৃষকেরা পচে যাওয়া গাছ তুলে ফেলছেন, আবার কোথাও আইল উঁচু করে পানি আটকে রাখার চেষ্টা করছেন।
কসবা এলাকার কৃষক আকবর আলী একটি জমি থেকে পচে যাওয়া পটলগাছ তুলছিলেন। তার এক বিঘা পটল, ১০ কাঠা শসা ও পাঁচ কাঠা ঝিঙের আবাদ পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পটলগাছ পচে যাওয়ায় সেগুলো তুলে ফেলতে হচ্ছে তাকে।
আকবর আলী বলেন, যে গাছগুলো এখনো কিছুটা ভালো আছে, সেগুলোও মরে যাচ্ছে। সব শেষ হয়ে গেলে আমরা কীভাবে বাঁচব, সেটাই এখন চিন্তা।
আরও পড়ুন<<>>রাঙামাটিতে কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগে সৎ বাবাসহ আটক ২
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কসবা এলাকার পদ্মার চরের বিভিন্ন জমিতে প্রায় সাত দিন পানি জমে ছিল। দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকায় অধিকাংশ সবজির গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কৃষকের জমিতে ফসলের পাশাপাশি চারা ও উৎপাদন খরচও পানিতে গেছে।
কৃষক মো. নজরুল ইসলামের প্রায় ১০ কাঠা করলা, ১০ কাঠা শসা, ১০ কাঠা লাউ, দেড় বিঘা বিভিন্ন জাতের কপি, ১৫ কাঠা পটল ও পাঁচ কাঠা টমেটোর আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার হিসাবে, টমেটোতে প্রায় ১০ হাজার, পটলে ৩০ হাজার, করলায় ১০ হাজার, শসায় ২০ হাজার, লাউয়ে ১৫ হাজার এবং কপিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল।
নজরুল ইসলাম বলেন, কৃষি বিভাগের লোকজন এসে জমি দেখে গেছেন। তবে এখনো কোনো সহায়তা পাননি। একসঙ্গে বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তার বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
আরেক কৃষক শাহরিয়ার রহমান রাসেলের প্রায় ১০ হাজার ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা নষ্ট হয়েছে। ফসল ভালো থাকলে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রির আশা করেছিলেন তিনি। এখন সে সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত।
রাসেল বলেন, কৃষক হিসেবে কোনো ফসল নষ্ট হোক, এটা আমরা চাই না। নিজেরা যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছি পানি সরিয়ে ফসল বাঁচানোর। কিন্তু পানির কাছে শেষ পর্যন্ত পেরে উঠিনি।
পটলচাষি মো. শামিম আল মামুনের ১৫ কাঠা পটলের জমিও পানিতে তলিয়ে গেছে। তার দাবি, এতে অন্তত দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। বর্তমানে পটল তোলার ভরা মৌসুম হওয়ায় উৎপাদনের পাশাপাশি সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্যের ক্ষতিও যুক্ত হচ্ছে।
কৃষকদের ভাষ্য, চরাঞ্চলে প্রতিবছরই নদীর পানি বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তবে এবার ফসল কাটার আগমুহূর্তে পানি ওঠায় ক্ষতির মাত্রা বেশি হয়েছে। অনেকেই জমিতে আগাম সবজি আবাদ করতে গিয়ে ধারদেনা ও নিজেদের সঞ্চয় বিনিয়োগ করেছিলেন। এখন ফসল নষ্ট হওয়ায় সে অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যায় রাজশাহীর পবা, বাঘা ও গোদাগাড়ী উপজেলায় মোট ৩০৯ দশমিক ৫৯ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪৫ দশমিক ২৪ হেক্টর সবজি, ৮৫ দশমিক ৩৯ হেক্টর মাসকলাই, ১১ দশমিক ৪৬ হেক্টর রোপা আমন, ২৫ হেক্টর রোপা আউশ, ১০২ হেক্টর হলুদ, ২৫ হেক্টর পেঁপে, ১০ হেক্টর পেয়ারা এবং ৫ দশমিক ৫০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা।
এর মধ্যে পবায় ৭ দশমিক ২৪ হেক্টর সবজি, ৬ দশমিক ৩৯ হেক্টর মাসকলাই ও শূন্য দশমিক ৪৬ হেক্টর রোপা আমন আক্রান্ত হয়েছে। গোদাগাড়ীতে আক্রান্ত হয়েছে ১০ হেক্টর সবজি, ১৭ হেক্টর মাসকলাই ও ২৫ হেক্টর রোপা আউশ। আর বাঘায় ২৮ হেক্টর সবজি, ৬২ হেক্টর মাসকলাই, ১১ হেক্টর রোপা আমন, ১০২ হেক্টর হলুদ, ২৫ হেক্টর পেঁপে, ১০ হেক্টর পেয়ারা ও ৫ দশমিক ৫০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা।
পবা উপজেলার আলিমগঞ্জ ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জহুরুল হক কসবা এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত জমি পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, উজান থেকে পদ্মার পানি বাড়ায় চরাঞ্চলের জমি প্লাবিত হয়। এতে বিভিন্ন ধরনের সবজি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষকেরা আইল উঁচু করে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ ফসল রক্ষা করতে পেরেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আক্রান্ত ফসল কীভাবে পরিচর্যা করলে অবশিষ্ট ফসল রক্ষা করা সম্ভব, সে বিষয়ে কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোস্তাফা কামাল হোসেন বলেন, পদ্মার আশপাশের এলাকা প্লাবিত হওয়ায় বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহযোগিতা করা হবে।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































