Apan Desh | আপন দেশ

নাটোরে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক

মোল্লা মো. আরিফুল ইসলাম, নাটোর প্রতিনিধি, আপন দেশ

প্রকাশিত: ২২:১১, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নাটোরে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক

ছবি: আপন দেশ

নাটোর জেলার সাত উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে মাদকের বিস্তার ঘটেছে। জেলা সদর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও বিভিন্ন আড্ডাস্থলে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক কেনাবেচা ও সেবন হয়ে উঠেছে সহজলভ্য বিষয়। এতে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা। 

স্থানীয়দের আশঙ্কা, মাদকের বিস্তার যুবসমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তবে নাটোর সদর, নলডাঙ্গা, সিংড়া, বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, লালপুর ও বাগাতিপাড়া সাত উপজেলাতেই নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযান চলার পরও মাদকের সরবরাহ ও খুচরা বিক্রি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। 

অভিযান হচ্ছে, তবু সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে না

সাম্প্রতিক অভিযানের তথ্য বলছে, নাটোরে বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধারের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। গত ০২ সেপ্টেম্বর নাটোর সদর উপজেলার বনবেলঘরিয়া বাইপাস বাসস্ট্যান্ড এলাকায় র‌্যাবের যৌথ অভিযানে ১০ কেজি ২০০ গ্রাম গাঁজাসহ দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। র‌্যাবের তথ্যমতে, গাঁজা নীলফামারী থেকে সংগ্রহ করে নাটোর হয়ে রাজশাহীর পুঠিয়ায় নেয়ার প্রস্তুতি চলছিল। 

আরও পড়ুন<<>>জঙ্গল সলিমপুরে আবারও যৌথ অভিযান

এর কয়েক দিন পর ১০ সেপ্টেম্বর বড়াইগ্রামের মানিকপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয় কেজি গাঁজাসহ দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া ১৪ সেপ্টেম্বর লালপুরে পৃথক অভিযানে ৪০০ পিচ ইয়াবা ও ১০ বোতল ভারতীয় অবৈধ মাদকদ্রব্য ফেয়ারডিলসহ দুজনকে আটকের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।

এ ধরনের অভিযানকে স্বাগত জানালেও স্থানীয়দের প্রশ্ন যারা মাঠপর্যায়ে মাদক বিক্রি করছে, তাদের পাশাপাশি বড় সরবরাহকারী, পরিবহনকারী ও অর্থের জোগানদাতারা থাকছে ধরা-ছোঁয়ার বাহিরে। 

মূল সরবরাহকারীরা কি আড়ালে?

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সময় মাদকসহ সেবনকারী কিংবা খুচরা বিক্রেতারা আটক হলেও মাদকের উৎস ও সরবরাহ চেইনের ওপর আরও গভীর নজরদারি প্রয়োজন। তারা জানান, মাদক কোথা থেকে আসছে, কারা পরিবহন করছে, কোথায় মজুত হচ্ছে এবং কীভাবে তা বিভিন্ন উপজেলা ও এলাকায় পৌঁছাচ্ছে এসব বিষয় চিহ্নিত করতে সমন্বিত গোয়েন্দা তৎপরতা প্রয়োজন। 

স্থানীয়রা জানান, মাদকসেবীদের একটি অংশ নেশার টাকা পরিবারের কাছ থেকে জোগাড় করছে। এরা যেকোনো সময় বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তবে নির্দিষ্ট চুরি, ছিনতাই বা অন্য অপরাধের সঙ্গে মাদকের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

মাসিক লেনদেনের অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন

মাদক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি মাসিক লেনদেন বা মাসোয়ারা। ভাটদাঁড় এলাকার স্থানীয় এক বাসিন্দার অভিযোগ, অনেক এলাকায় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়মিত অর্থ দেয়ার বিনিময়ে মাদক ব্যবসা চলার সুযোগ দেয়া হয়। এমনকি অভিযান চালিয়ে মাদকসেবী আটকের পর পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নাটোর জেলা কার্যালয়ের এক গাড়িচালকের দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের বিষয়েও অভিযোগ উঠেছে। 
অভিযোগকারীদের দাবি, সংবেদনশীল দায়িত্বে দীর্ঘদিন একই এলাকায় থাকলে মাদক স্পট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।
তবে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে।

সামাজিকভাবে বাড়ছে উদ্বেগ

এ বিষয়ে নাটোর সিটি কলেজের প্রভাষক আলী আল মাসুদ মিলন বলেন ,তরুণ সমাজকে বাঁচাতে হলে এখনই মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বই পড়া, খেলাধুলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

বিশিষ্ট সমাজসেবক ও নাটোর সিটি কলেজের অধ্যাপক ড. জিয়াউল হক বলেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি করে না, এর প্রভাব পুরো পরিবারের উপর পড়ে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে নিয়মিত কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীরা কেন মাদকে জড়িয়ে পড়ছে, সে কারণও খুঁজে বের করতে হবে।

অভিভাবক কামরুল হাসান বলেন, সন্তান বাইরে গেলে অনেক অভিভাবকই উদ্বিগ্ন থাকেন। শুধু সেবনকারী নয়, যারা মাদক সরবরাহ করছে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

সংস্কৃতিব্যক্তিত্ব অধ্যাপক অলক চৌধুরী বলেন, তরুণদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, পাঠাগার ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে।
নিয়মিত অভিযান চলছে।

নাটোর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিচালক রীফা রাওনাক নীতু বলেন, তার দফতরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। মাদক উদ্ধার, আসামি গ্রেফতার ও আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চলছে।

তিনি বলেন, মাদক নির্মূল একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের সহযোগিতাও প্রয়োজন।

নাটোর জেলার এএসপি ইফতেখার আলম বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাদক উদ্ধার ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধেও পুলিশ নজরদারি করছে।

জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদককে সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

আপন দেশ/এসআর

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়