ছবি: আপন দেশ
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় নন্দিনী কান্ত রায় (০৭) নামে এক শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের পর এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে একদল বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী নন্দিনীর হত্যাকারী সন্দেহে এক ব্যক্তিকে আটক করে।
ঐ ব্যক্তিকে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নিলে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী তাকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এসময় পুলিশ ও বিক্ষুদ্ধের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় পুরো গ্রাম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এ সময় জেলা পুলিশ সুপার (এসপি), আদিতমারী থানার ওসিসহ প্রায় ২০ জন আহত হয়েছেন। বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) গাড়িসহ প্রশাসনের সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে। এ ঘটনায় দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। নন্দিনী ফলিমারী গ্রামের নলিনী কান্তের মেয়ে। আর সন্দেহভাজন ব্যক্তি হলেন একই গ্রামের রণজিৎ কুমারের ছেলে বিধান চন্দ্র রায় (২২)। বাবা-ছেলে দুজনই পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, সোমবার (১৫ জুন) বিকেল থেকে হঠাৎ নন্দিনীকে (৭) খুঁজে পাচ্ছিল না তার পরিবার। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান মেলেনি। মঙ্গলবার সকালেও অনুরূপভাবে খুঁজতে বের হয় তার পরিবার ও স্থানীয়রা। এক পর্যায়ে তার বাড়ির পাশে একটি ভুট্টাক্ষেতে নরম মাটি দেখে তাদের সন্দেহ হয়। এরপর সেখানে গর্ত খুঁড়ে নন্দিনীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয়রা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায় পুলিশ।
এর মধ্যে স্থানীয় একজন সোমবার সন্ধ্যায় বিধান চন্দ্র নামে এক যুবককে ওই ভুট্টাক্ষেত থেকে কোদাল নিয়ে ফিরতে দেখেছিলেন বলে দাবি করেন। সে সন্দেহে তার বাড়িতে যান স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা। তারা ওই বাড়ি ভাঙচুর করে ভেতরে প্রবেশ করে বিধানকে আটক করে। তখন ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ বিধানকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। এ সময় অভিযুক্ত বিধানকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেরা বিচার করার দাবিতে মব সৃষ্টি করে পুলিশের ওপর হামলা চালায় এবং অবরুদ্ধ করে রাখে একদল লোক।
আরও পড়ুন<<>>নরসিংদীতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, যুবক নিহত
খবর পেয়ে লালমনিরহাট জেলা পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান ঘটনাস্থলে গেলে তিনিও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন ঘটনাস্থলে যাওয়া ক্রাইমসিন ইউনিটও। একে একে সদর থানা, কালীগঞ্জ থানা, জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট, বডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করে। বিক্ষুব্ধ জনতা তাদেরকেও অবরুদ্ধ করে। ফলে পুরো গ্রাম রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এ পরিস্থিতিতে তাদের উদ্ধারে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন জেলা প্রশাসক (ডিসি) রাশেদুল হক প্রধান, বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমামসহ জেলা উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তাদেরও অবরুদ্ধ করা হয়। এভাবে প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকেন জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের লোকজন। এ সময় থেমে থেমে প্রশাসনের ওপর হামলা চালায় বিক্ষুব্ধরা।
পরে সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে অভিযুক্ত বিধান ও তার বাবাকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে প্রশাসনের লোকজন। এ সময় শেষ দফায় প্রশাসনের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট-পাটকল ছুড়ে লোকজন। তাদের ছোড়া ইট-পাটকল ও লাঠির আঘাতে লালমনিরহাট এসপি আসাদুজ্জামান, আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হকসহ ২০ জন আহত হয়েছেন। জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের সাতটি গাড়ি ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধরা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকাজুড়ে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, মাদকসেবী বিধান চন্দ্র প্রতিবেশী নন্দিনীকে ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে মুখ বেঁধে ধর্ষণ ও হত্যা করে মরদেহ বস্তায় ভড়িয়ে মাটিতে পুঁতে রাখে। গ্রেফতার এড়াতে নিজের বাড়িতে বাইরে থেকে তালা দিয়ে ভেতরে আত্মগোপন করেন বিধান। সে বাড়ি বিক্ষুব্ধ জনতা ভাঙচুর করে বিধানকে আটক করে।
এসপি আসাদুজ্জামান বলেন, সকাল থেকে আমি নিজেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। ইটের আঘাতে আমি নিজেও আঘাত পেয়েছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিন রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আমাদের বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনায় ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। নন্দিনী হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র ও তার বাবাকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি কাজে বাধা দানের ঘটনায়ও একটি মামলা দায়ের করা হবে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক বলেন, নৃশংস এ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আপাতত ওসিকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































