Apan Desh | আপন দেশ

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ যাত্রা থামিয়ে শেষ আটে নরওয়ে

ক্রীড়া ডেস্ক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ০৯:০৮, ৬ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ০৯:১০, ৬ জুলাই ২০২৬

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ যাত্রা থামিয়ে শেষ আটে নরওয়ে

ছবি সংগৃহীত

ম্যাচ শুরুর আগে প্রশ্ন ছিল গত দুই দশকে যা পারেনি। এবার কি সে অসম্ভবকে সম্ভবে পরিনত করতে পারবে? কিন্তু নাহ! এবারও পারল না। ২০০২ সালের পর থেকে নকআউট পর্বে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষ মানেই বিশ্বকাপ যাত্রার ইতি ব্রাজিলের। দুই দশক পরেও ব্যতিক্রম ঘটেনি সে তিক্ত অভিজ্ঞতার। শুরুতে পাওয়া পেনাল্টি কিংবা এন্দ্রিক- মার্তিনেল্লিদের পাওয়া সহজ সুযোগ, ভাগ্যটাও আজ ছিল সেলেসাওদের বিপক্ষে।

প্রথমার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হলেন ব্রুনো গিমারায়েস। দ্বিতীয়ার্ধে গোলরক্ষক ওরিয়ান নিলান্ডকে একা পেয়েও জাল খুঁজে নিতে পারলেন না এন্দ্রিক। একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া করার কড়া মাশুল গুণতে হলো ব্রাজিলকে। ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে বিদায় ঘণ্টা বেজে গেল রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। গোলপোস্টের নিচে নিলান্ডের দৃঢ়তার সঙ্গে শেষদিকে আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলের সুবাদে জিতে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করল নরওয়ে।

বাংলাদেশ সময় রোববার (০৫ জুললাই) রাতে নিউইয়র্ক নিউজার্সি স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর ম্যাচে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়েছে নরওয়ে। শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগে আরেকটি পেনাল্টি থেকে বদলি নামা নেইমারের লক্ষ্যভেদ কেবল সেলেসাওদের হারের ব্যবধানই কমায়।

সেলেসাওদের সামনে এমন এক পরিসংখ্যানগত জটিলতা দাঁড়িয়েছিল, যা তাদের বৈশ্বিক মর্যাদার সঙ্গে একেবারেই বেমানান। কারণ নরওয়ের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাসটা পুরোপুরি তাদের বিপক্ষে। এবারও সে অমীমাংসিত ধাঁধার সমাধান বের করতে পারেনি কার্লো আনচেলত্তির দল। নরওয়ের সঙ্গে পাঁচবারের দেখায় এটি তাদের তৃতীয় হার, বিশ্বকাপের মঞ্চে দ্বিতীয়। এর আগে ১৯৯৮ সালের আসরের গ্রুপ পর্বেও একই ব্যবধানে হেরেছিল তারা। দুই দলের বাকি দুটি ম্যাচ হয়েছে ড্র।

১৯৯০ সালের পর এ প্রথম বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেয়া ব্রাজিলের হেক্সা মিশন আরও একবার পড়ল মুখ থুবড়ে। অন্যদিকে, নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখল নরওয়েজিয়ানরা।

মাত্র ৩৪ শতাংশ সময় বল পায়ে রাখলেও পাল্টা আক্রমণে গোলমুখে ভীতি ব্রাজিলই বেশি ছড়ায়। কিন্তু ফিনিশিংয়ে দুর্বলতা ডুবিয়েছে তাদের। বিপরীতে, বলের দখল রেখে খেলা নরওয়ের অল্প সংখ্যক সুযোগ পেলেও তা দারুণভাবে কাজে লাগান হালান্ড। আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ও ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে ৭ গোল নিয়ে যৌথভাবে এবারের আসরের গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষে উঠলেন তিনি।

ম্যাচে থিতু হওয়ার আগে তৃতীয় মিনিটেই ব্রাজিলের জালে বল পাঠান প্যাট্রিক বার্গ। তবে নরওয়ের এগিয়ে যাওয়ার আনন্দ স্থায়ী হয় কিছুক্ষণ মাত্র। বার্গকে পাস দেয়া আলেক্সান্ডার সরলথ অফসাইডে থাকায় বাতিল হয় গোলটি।

ব্রাজিলের সামনে লিড নেয়ার সুবর্ণ সুযোগ আসে ডি-বক্সে মাথেউস কুনিয়াকে ক্রিস্টোফার আইয়ের ফেলে দিলে। শুরুতে আবেদনে সাড়া না দিলেও পরে ভিএআরের সাহায্য নিয়ে পেনাল্টি দেন রেফারি। তবে ১৪তম মিনিটে গিমারায়েস স্পট-কিক থেকে হন ব্যর্থ। বামদিকে ঝাঁপিয়ে বল রুখে দিয়ে নরওয়েকে বাঁচান গোলরক্ষক নিলান্ড। রান-আপে কিছুটা থেমে নেয়া গিমারায়েসের শটে তেমন জোরও ছিল না।

৩৫তম মিনিটে প্রথমবারের মতো গোলমুখে শট নেয় নরওয়ে। অ্যান্টোনিও নুসার পাসে মার্টিন ওডেগার্ডের কোণাকুণি শট বাইরের দিকে জালে লাগে। দুই মিনিট পর দুরূহ পরিস্থিতি থেকে হালান্ডের প্রচেষ্টা পরীক্ষায় ফেলতে পারেনি ব্রাজিলের গোলরক্ষক আলিসনকে।

আরও পড়ুন<<>>আর্জেন্টিনা-মেসিবিরোধী প্রচারণায় টাকা দিচ্ছে এক প্রতিষ্ঠান

চার মিনিট পর নরওয়ের ডি-বক্সে ওডেগার্ডের কাছ থেকে বল কেড়ে নেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। এরপর গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলির সঙ্গে বল দেয়া-নেয়া করে বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছে যান তিনি। তবে তার কোণাকুণি শট পা দিয়ে দারুণভাবে রুখে জাল অক্ষত রাখেন নিলান্ড।

প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ব্রাজিল বেঁচে যায় আলিসনের দৃঢ়তায়। ছুটতে থাকা হালান্ডকে আটকাতে মার্কিনিয়োস ও গ্যাব্রিয়েলের চ্যালেঞ্জ করেন একসঙ্গে। আলগা বল চলে যায় ওডেগার্ডের পায়ে। খুব কাছ থেকে তার নেওয়া শট ঝাঁপিয়ে ঠেকান আলিসন।

প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধের শুরুটা হয় একই ধাঁচে। নরওয়ে বল দখলে রেখে খেলতে থাকে, ব্রাজিল পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে সুযোগ খুঁজতে থাকে। তবে বিরতির পর ব্রাজিল হতাশ করার ধারা জারি রাখলেও হালান্ডের নৈপুণ্যে নরওয়ে ঠিকই গোল আদায় করে নেয়।

৫৯তম মিনিটে ম্যাচের অচলাবস্থা ভেঙে ব্রাজিলকে এগিয়ে দেয়ার সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পান আগের মিনিটে কুনিয়ার বদলি নামা এন্দ্রিক। পাল্টা আক্রমণে বাম দিক থেকে দুর্দান্ত এক থ্রু বল বাড়ান ভিনিসিয়ুস। তখন সামনে কেবলই গোলরক্ষক। প্রথম ছোঁয়াটা ভালো হলেও এন্দ্রিকের দ্বিতীয় ছোঁয়াটা কিছুটা জোরে হয়ে যায়। ততক্ষণে গোলপোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসা নিলান্ডের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে শেষমেশ শট নিলেও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি তিনি।

তিন মিনিট পর আবার নরওয়ের ত্রাণকর্তা নিলান্ড। ডি-বক্সের প্রান্ত থেকে রায়ানের শট একজনের গায়ে লেগে সামান্য দিক পাল্টালেও দারুণ ক্ষিপ্রতায় রুখে দেন তিনি। জাপানের বিপক্ষে আগের ম্যাচে ব্রাজিলের জয়ের নায়ক মার্তিনেলির জায়গায় ৬৭তম মিনিটে মাঠে নামেন নেইমার। তবে ৩৪ বছর বয়সী অভিজ্ঞ তারকা বদলাতে পারেননি দলের ভাগ্য।

নিষ্প্রভ থাকা হালান্ড জ্বলে ওঠেন ৭৯তম মিনিটে। বাঁ দিক থেকে আন্দ্রেয়াস শেলদেরাপ নিখুঁত ক্রস ফেলেন ডি-বক্সের ভেতরে। গ্যাব্রিয়েলকে ফাঁকি দিয়ে লাফিয়ে উঠে হেডে গোল করে নরওয়েকে লিড দেওয়ার পাশাপাশি ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দেন হালান্ড।

সমতার খোঁজে থাকা ব্রাজিল ৮৬তম মিনিটে ফের আটকে যায় নিলান্ড নামক বাধার দেয়ালে। এন্দ্রিকের শট আইয়েরের পায়ে লেগে ক্রসবার ঘেঁষে জালে জড়াতে যাচ্ছিল। দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে অসাধারণভাবে বল রুখে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক।

এরপর নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে সেলেসাওদের ফেরার সব আশা শেষ করে দেন হালান্ড। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে বদলি নামা শেলদেরাপের কাছ থেকে বল পেয়ে ডি-বক্সের বাইরে থেকে আচমকা জোরাল নিচু শট নেন তিনি। ঝাঁপিয়ে পড়লেও তা ঠেকানোর কোনো উপায় জানা ছিল না আলিসনের।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই নিয়ে টানা ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে জাল খুঁজে নিলেন হালান্ড। শুধু তাই নয়, চোখ কপালে তোলার মতো বিষয় আছে আরও। নরওয়ের জার্সিতে সবশেষ ১৪টি ম্যাচে ২৭টি গোল করলেন তিনি।

যোগ করা আট মিনিট সময়ের শেষদিকে কাসেমিরো ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হন লিও ওস্টিগার্ডের দ্বারা। পেনাল্টি থেকে নিলান্ডকে অবশেষে পরাস্ত করে গোল পাওয়ার হাসি ফুটে ওঠে নেইমারের মুখে। কিন্তু ম্যাচের ফল বদলাতে সেটা যথেষ্ট ছিল না। বরং কিছুক্ষণ পর শেষ বাঁশি বাজতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমারসহ ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা।

ইতিহাস গড়ার পর বাঁধভাঙা আনন্দে মাতোয়ারা নরওয়ে এখন নতুন চ্যালেঞ্জের অপেক্ষায়। কোয়ার্টার ফাইনালে হালান্ডের প্রতিপক্ষে হবে এবারের বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মেক্সিকো অথবা ১৯৬৬ সালের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়