Apan Desh | আপন দেশ

বেইলি রোড ট্রাজেডি: ৪৬ লাশের দায় কাফনে, গণপূর্তের প্রধান খালেকুজ্জামান

বিশেষ প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৩:৩৫, ২৫ জুন ২০২৬

আপডেট: ১৪:৫৪, ২৫ জুন ২০২৬

বেইলি রোড ট্রাজেডি: ৪৬ লাশের দায় কাফনে, গণপূর্তের প্রধান খালেকুজ্জামান

প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী, গ্রিন কোজি কটেজ ও গণপূর্ত। ফাইল ছবি।

রাজধানীর বেইলি রোডে ‘কাচ্চি ভাই রেষ্টুরেন্ট’। এখানেই পুড়ে মারা গেছেন ৪৬জন মানুষ। গণমাধ্যমে শিরোনাম ছিল ‘বেইলি রোড ট্রাজেডি’। ঘটনার শুরুটা বলতেই আতকে উঠেন যে কেউই। ওই ট্রাজেডির শিকার ১৩জন এখনো দুর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছেন।

কিন্তু এ মৃত্যুর নেপথ্যে যারা ছিলেন তাদের অন্যতম তৎকালীন রাজউক কর্মকর্তা প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর গায়ে কোনো আঁচড় লাগেনি। অর্থের দাপটে আপাতত তদন্তকারীর ফাইলে তার নাম উঠেনি। উল্টো তিনি পেয়েছেন পদোন্নতি। নিহতের স্বজনরা যখন কবরস্থানে মোনাজাত করেন সে দৃশ্য দেখেই তিনি প্রবেশ করেন সেগুনবাগিচার পূর্ত ভবনে। গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে তিনি।

আপন দেশ-এর অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, আলোচিত ট্রাজেডির দায় এড়াতে পারে না প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। সংশ্লিষ্টরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ লেভেলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য দাবি নিয়ে মাঠে নামতে যাচ্ছে নিহতের স্বজনরা।

আরও পড়ুন<<>> সিটি ব্যাংক এমডি মুজিববাদী মাসরুর আরেফিন এখন ব্যাংকখাতের ভয়

ভয়াবহ ঘটনাটি ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারির। ওইদিন সন্ধ্যায় ১৬৮, বেইলি রোডের ‘গ্রিন কোজি কটেজ' ভবনের ‘কাচ্চি ভাই’ নামক রেষ্টুরেন্ট থেকে অগ্নিকান্ডের সূচনা ঘটে। ওই ঘটনায় ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। আরও অন্তত ১৩ জন দগ্ধ ও আহত হন। মানুষ পোড়ার গন্ধ যেন অবলোকনকারীদের নাকে এখনো লেগে আছে। দীর্ঘরাত নাগাদ শুধু পুড়ছিলই। ভয়াবহ ঘটনাটি বিশ্ব মিডিয়ার প্রচার-প্রকাশিত হয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীর প্রযুক্তি ব্যবহার করেও মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যায়নি। প্রাণহানীর ঘটনা তদন্তে নামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। দুই বছর তদন্ত শেষে সম্প্রতি আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে সিআইডি। 

আদালতসূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ ভবনের মালিকপক্ষ আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রমজানুল হক নিহাদসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে সিআইডি।

যে দুর্বলতায় মরদেহের সংখ্যা বাড়ল

অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর সামনে আসে ভবনটির নকশার বেশ কিছু দুর্বলতা। বহুতল ভবনটিতে কার্যত একটি মাত্র সিঁড়ি ছিল, যা জরুরি অবস্থায় বিকল্প পালানোর পথ হিসেবে যথেষ্ট নয়। অগ্নিকাণ্ডে এ সিঁড়িটিই ধোঁয়ায় ভরে গেলে মানুষ আটকা পড়ে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী আলাদা ফায়ার এক্সিট থাকা বাধ্যতামূলক, কিন্তু এখানে তা ছিল না বা কার্যকর ছিল না। সিঁড়ির প্রস্থ কম এবং ঘুরানো হওয়ায় দ্রুত নিচে নামা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে আতঙ্কের মুহূর্তে।

ভবনটির বিভিন্ন তলায় রেস্টুরেন্ট থাকলেও আগুন বা ধোঁয়া আটকে রাখার জন্য পর্যাপ্ত কম্পার্টমেন্টেশন ছিল না। ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়া বের হওয়ার জন্য যথাযথ শ্যাফট বা ভেন্টিলেশন না থাকায় ধোঁয়া দ্রুত পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে- যা মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়। স্প্রিংকলার, ফায়ার অ্যালার্ম, ফায়ার ডোর- এসব আধুনিক সিস্টেম নকশায় ছিল না বা কার্যকর ছিল না। ভবনটি মূলত আবাসিক/মিশ্র ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হলেও বাস্তবে তা বহু রেস্টুরেন্টে রূপান্তর করা হয়- যা নকশার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

আরও পড়ুন<<>>> পালাচ্ছে বসুন্ধরা

আর্কিটেকচারদের মতে, ভবনের নকশায় সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল- অগ্নি-নিরাপত্তাকে প্রাধান্য না দেয়া। এক্সিটের অভাব, ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা এবং অননুমোদিত ব্যবহার- সব মিলিয়ে এটি একটি ‘ডিজাইন ফেইলিওর’- এর উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়।

আর্কিটেকচার ইকবাল হাবীব আপন দেশ’কে বলেন, বেইলি রোডে ‘গ্রিন কোজি কটেজ'ট্রাজেডিটি দেশের অন্যতম নির্মম ঘটনা। এখানে অনেকজনই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। সঠিক তদন্ত হলে- কাচ্চিভাই রেষ্টুরেন্টের মালিক থেকে শুরু করে ভবন মালিক, ভবন নির্মাণকারী, নকশা অনুমোদনকারী ও প্রণয়নকারী কেউই দায় এড়াতে পারে না। রাজউক বিষয়গুলো সঠিকভাবে তদারকি করলে শুধু বেইলি রোড কেনো এমন বহু ভবনের দুর্ঘটনা এড়ানো যেতো।

ওইদিন অতিরিক্ত ডিআইজি নাসিরুল ইসলাম নাসিরের মেয়ে লামিশা ইসলাম মাহিও মারা গেছেন। রাজধানীর ৩৭৭ মগবাজার মধুবাগের বাসিন্দা সৈয়দ মোবারক কাউসারসহ একই পরিবারের ৫জন মারা গেছেন। বেচে থাকা সুরাইয়া জামান আপন দেশকে বলেন, ঘটনার দিন তিনি বাইর ছিলেন।

বেইলি রোডের আগুনে এক পরিবারের পাঁচজন নিহত। ফাইল ছবি।

নকশা অনুমোদনকারী প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানবিহীন সিআইডির তদন্ত রিপোর্ট প্রশ্নে তিনি বলেন, নকশা প্রণয়ন-অনুমোদন থেকে শুরু করে ভবন তৈরী ও পরিচালনার সঙ্গে যারা জড়িত সবাই আসামি হবার কথা। কিন্তু সিআইডি এভাবে রিপোর্ট দিলে আমাদের প্রশ্ন থেকে যায় তারা পক্ষপাদুষ্ট কিনা? অনেক দিন হলো, আমরা দোষীদের শাস্তি চাই।    

রাজউক সূত্রে জানা যায়, প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ২০১১ সালে অথরাইজড অফিসার প্রেষণে রাজউকে আসেন। সে সময় বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের নকশার অনুমোদন দেন তিনি। নকশাগত ত্রুটি নিয়ে ভবনটির নির্মাণকালে বিষয়টি নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা হলেও পরে রহস্যে চাপা পড়ে।  

প্রশাসনিক দণ্ডপ্রাপ্ত খালেকুজ্জামান

গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, খালেকুজ্জামান গণপূর্ত ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা। চাকরিজীবনের বেশ সময় কেটেছে অস্ট্রেলিয়ায়। স্ত্রী-সন্তান অস্ট্রেলিয়ায় থাকায় সেখানে তিনি বহুবার যাতায়াত করেন। তবে ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে উচ্চতর শিক্ষাছুটির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পর লঘুদণ্ড দেয় পূর্ত মন্ত্রণালয়। তার বেতন স্কেলও এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়।

এরপর নিজ জেলার বাসিন্দা ফরিদপুরের প্রভাবশালী সাবেক দুদক কমিশনার মোজ্জাম্মেল হক খানের মাধ্যমে তদবির করেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। একপর্যায়ে গোপালগঞ্জের বাসিন্দা সাবেক পূর্তসচিব শহীদ উল্লা খন্দকারের আমলে একটি আবেদন করে তিনি। শেখ হাসিনার পছন্দের আমলা শহীদ উল্লা খন্দকারের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে জনপ্রশাসন খালেকুজ্জামানের সাজা হিসেবে জ্যেষ্ঠতা স্থগিত রাখার সুপারিশ করে।

আরও পড়ুন<<>> ১৩ হাজার কোটি টাকা চুরি করেও রেলে আফজালের ডিজিগিরি!

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ০১৭৪***৫৮০০ নম্বরে একাধিকবার কল করলে তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াট্সঅ্যাপে মেসেজ দিলেও এ প্রতিবেদন লেখা পরযন্ত ফিরতি জানাননি। 

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের ২৮ অক্টোবর প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানকে চলতি দায়িত্ব হিসেবে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেয়া হয়। এখানের কর্মকাণ্ড নিয়ে আপন দেশ-এর পরের পর্বে পড়ুন ‘খালেকুজ্জামানের গণপূর্ত’

আপন দেশ/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়