ছবি: এআই জেনারেট
হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। একের পর এক সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি মিছিল-সমাবেশ, অবস্থান কর্মসূচি এবং কোথাও কোথাও ১৪৪ ধারা- সব মিলিয়ে শিক্ষাঙ্গনে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সাম্প্রতিক বিরোধকে ঘিরে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে- এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক হিসাব? হঠাৎ একই সময়ে কেন ক্যাম্পাসগুলোতে সংঘাতের আবহ? আর এ উত্তাপ কি কেবল আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, নাকি জাতীয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণের প্রতিফলন?
মঙ্গলবার (০৪ আগস্ট) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ সেই প্রশ্ন আরও সামনে এনেছে। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সমস্যা সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে প্রবেশের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে জানা গেছে। পরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে জবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. আব্দুল আলিম আরিফ, ছাত্রদলের আহবায়ক কমিটির সদস্য ইয়াসিন সাইফসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। সংঘর্ষের পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শিবির সদস্যদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে পরে পরিস্থিতি শান্ত থাকার কথা জানানো হয়।
আরও পড়ুন<> বিরোধীদল আ. লীগের ভাষায় কথা বলছে: মির্জা ফখরুল
তবে জবির ঘটনা একা নয়। মাত্র এক দিন আগে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনীতে ব্যানার প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষে অন্তত সাতজন আহত হন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় পাঁচজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহতসহ মোট ২০ জন শিক্ষার্থী আহত হন।
পরদিনই ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির একই সময়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে। সংঘর্ষের আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে ১৪৪ ধারা জারি করে। অর্থাৎ একটি সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন ফের সংঘাতের আশঙ্কা- যা পরিস্থিতির গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সংঘাত কি কেবল ক্যাম্পাসের?
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর তৎপরতা ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ ও সতর্কতা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি ঐতিহাসিকভাবেই জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে একটি ক্যাম্পাসের সংঘাত অন্য ক্যাম্পাসেও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
আরও পড়ুন<. বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪৪ ধারা জারি
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তার, ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জায়গা তৈরি- সবকিছু মিলিয়েই উত্তেজনা বাড়তে পারে। জাতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তিত বাস্তবতায় ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যকার পুরোনো বিরোধও নতুন মাত্রা পেতে পারে।
ইস্যু আড়ালের ইস্যু,ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ শিক্ষার্থী
সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছেন, ছাত্রদল-শিবির সংঘাতকে সামনে রেখে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিভিন্ন ইস্যু থেকে জনদৃষ্টি সরিয়ে দেয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তাদের কেউ কেউ এটিকে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরকে ঘিরে থাকা নানা বিতর্ক, অভিযোগ ও সমালোচনা আড়াল করার একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখছেন। তবে এ বক্তব্যের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্নটি হলো- কারা এ সংঘাত থেকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। সংঘাতের ফলে কোন ইস্যুগুলো আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যাচ্ছে?
আরও পড়ুন<> হোটেলে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টা, ববি শিক্ষক বরখাস্ত
রাজনীতির হিসাব যাই হোক, এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের। ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ হলে আতঙ্ক ছড়ায়, স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়, বন্ধ হয়ে যেতে পারে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম। ১৪৪ ধারা জারি হলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়- বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের রাজনৈতিক বিরোধ তখন আর শুধু দুই সংগঠনের বিষয় থাকে না; তা পুরো শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশকে প্রভাবিত করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক কর্মসূচিও থাকবে। কিন্তু সে মতপার্থক্য যদি লাঠি, হামলা, পাল্টাপাল্টি মিছিল কিংবা প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞায় গড়ায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই- ক্যাম্পাস কার জন্য?
সামনে আরও উত্তাপ!
জবি ও বেরোবির পর এখন নজর ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। একই ধরনের সংঘাত সেখানে ছড়িয়ে পড়ে কি না, সেটিই বড় উদ্বেগ। কারণ একটি ক্যাম্পাসের সংঘাত যখন অন্য ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, তখন তা দ্রুতই বৃহত্তর ছাত্ররাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
তাই এখন শুধু সংঘর্ষ থামানো নয়, সংঘাতের কারণ চিহ্নিত করাই জরুরি। কারা উত্তেজনা তৈরি করছে, কারা তা উসকে দিচ্ছে এবং কারা এর রাজনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে- এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে ক্যাম্পাসের উত্তাপ সাময়িকভাবে কমলেও সংকট থেকে যাবে।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































