সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন এনসিবি নেতারা। ছবি আপন দেশ
দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে বিএনপির প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার ঘটনাকে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ হিসেবে দেখছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
পাশাপাশি ‘রাজপথে কোনো আন্দোলন করা যাবে না’, সরকারের এমন অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে দলটি বলছে, এমন আচরণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ছায়া দেখছে তারা।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানাতে মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলা মোটরে নিজেদের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যরা।
এদিনই এনসিপি এ কমিটির ঘোষণা দেয়। সার্জিস আলমকে চেয়ারম্যান করে গঠিত এ কমিটির সদস্য সচিব সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ। সদস্য হিসেবে রয়েছেন আরও চারজন।
ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি, খুলনা, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক পদে এদিন বিএনপির ছয় নেতা দায়িত্ব নিয়েছেন। তাদের দায়িত্ব দিয়ে রোববার (২৩ ফেব্রুয়ারি) প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।
এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সার্জিস বলেন, 'বিএনপি কর্তৃক দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ক্ষমতা দখল করার সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেছে তারা।'
২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ১৯ অগাস্ট দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করে প্রশাসক বসানো হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা উঠতে শুরু করেছে।
এরই মধ্যে ছয় সিটি করপোরেশেনে প্রশাসক নিয়োগ করল সরকার।
এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অথবা পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তারা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কয়েকদিন আগেই স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা ছিলেন আসিফ মাহমুদ।
দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনেরই মেয়াদ শেষে হয়েছে তুলে ধরে আসিফ মাহমুদ দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচনের দিন-তারিখ ঘোষণার আহ্বান জানান।
মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর নির্বাচনের তোড়জোড় না করে ছয়টি সিটি করপোরেশনে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় বিএনপির তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, “দলীয় বিভিন্ন জায়গায় হেরে যাওয়া প্রার্থীদের এক ধরনের প্রাইজ পোস্টিং দিল তারা। আমরা মনে করি, এই সিদ্ধান্ত নতুন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ।
'আমরা দেখেছি প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। সেখানে নির্দিষ্টভাবে মেয়াদ উল্লেখ করা হয়নি। প্রজ্ঞাপনটা দেখে মনে হচ্ছে আমৃত্যু হয়তোবা তারা প্রশাসক থাকবেন।'
আসিফ বলেন, '১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়াদই শেষ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় নির্বাচন না দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া একই সঙ্গে অগণতান্ত্রিক এবং নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট করবে। যারা প্রশাসক হয়েছেন তারা যদি প্রশাসক থেকে নির্বাচন করেন বা তার দলের কাউকে সহায়তা করেন তাহলে তো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে না। দলীয় লোক চেয়ারে বসে থাকা অবস্থায় নিরপেক্ষ নির্বাচনের সম্ভাবনাটা কমে যায়।'
রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করা যাবে না, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর এমন বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন এনসিপি নেতারা।
সরকার গঠনের পর গেল বুধবার সচিবালয়ে প্রথম কর্মদিবসে নিজের দপ্তরে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'বাংলাদেশে মব কালচার শেষ। মব কালচারকে আর কোনোভাবে উৎসাহিত করা যাবে না। দাবি দাওয়া থাকবে, তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় উত্থাপন করতে হবে। মিছিল সমাবেশ করতে পারবে, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি অব্যাহত থাকবে কিন্তু দাবি আদায়ের ক্ষেত্রে মহাসড়ক বন্ধ করা যাবে না।'
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এখন আন্দোলনের নামে রাস্তা অবরোধ করা যাবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন ছোট-খাট কারণে রাস্তা অবরোধ করা হয়েছে। আমরা এটাকে সমর্থন করি না। কিন্তু একই সঙ্গে কারও যৌক্তিক দাবিতে আওয়াজ ওঠানো, কথা বলার অধিকার যেন কোনভাবেই হ্যাম্পারড না হয়। সেটা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব।… কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আমরা দেখছি বলা হচ্ছে কোনো ধরনের আন্দোলন করা যাবে না। এটা সংবিধানের পরিপন্থি। এ ধরনের অ্যাপ্রোচ আমরা আগের (আওয়ামী লীগ) সরকারের সময় দেখেছি। তখন যে কোনো ইস্যুতে আন্দোলনে নামলেই সেটার ওপর দমন-পীড়ন চালানো হতো।'
গত দুদিন ধরে পুলিশের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'পুলিশের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় রেইডের নামে সাধারণ জনগন ও সাংবাদিকদের ওপরেও হামলা হয়েছে। আমরা নিন্দা জানাই। আমরা মনে করি সরকার এসবের মাধ্যমে জনগণকে ভয়ের মধ্যে রাখতে চাচ্ছে।
'আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাবো, অভিযানের নামে জনগণকে হয়রানি করা এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সাধারণ জনগণের ওপর হামলা এগুলো বন্ধ করতে হবে। আমরা জানি প্রত্যেকটি থানায় কিন্তু ইনফরমেশন আছে কারা মাদকের কারবারি, কারা চুরি করে, কারা ছিনতাইকারী। কারা চুরি করে কারা ছিনতাই করে সুনির্দিষ্টভাবে এসব নিয়ে কাজ করুক। আমরা মনে করি তা না করে জনগণকে শিকার বানানো হচ্ছে।'
সংবাদ সম্মেলনে প্রথমেই এনসিপি নেতা হান্নান মাসউদ সংসদ নির্বাচনের সময় তার গাড়িতে, তার স্ত্রীর ওপর হামলার অভিযোগ তোলেন। সরকারের কাছে এসব হামলা বন্ধের দাবিও জানান সংসদের সর্ব কনিষ্ঠ এই সংসদ সদস্য।
সংবাদ সম্মেলনে সার্জিস আলম দলের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলেন।
অন্য দলগুলোর ‘অবমূল্যায়িত’ নেতাদের এনসিপি থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও জানান তিনি।
এনসিপির এ নেতা বলেন, “বাংলাদেশে এমন অনেক রাজনৈতিক দল আছে যাদের যোগ্য নেতা-কর্মীদের স্থানীয় পর্যায়ে মূল্যায়ন করা হয় না। সেখানে নতুন করে লবিং শুরু হয়। নতুন করে টাকার খেলা শুরু হয়। সেইসব জায়গায় দীর্ঘ সময় যারা কষ্ট করে এসেছেন কিন্তু প্রাপ্য সম্মানটুকুও পাননি- আমরা আপনাদেরও আহ্বান জানাই। জনগণের আস্থা থাকার পরেও আপনি যদি দলীয়ভাবে মূল্যায়িত না হন আপনার জন্য, আপনাদের জন্য এনসিপির দরজা সবসময় খোলা থাকবে। আমরা আপনারা মিলে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করবো। কাউকে ইঞ্জিনিয়ারিং করার সুযোগ দেব না।'
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































