ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আপসহীন এই নেত্রীর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন এভারকেয়ারের এক নার্স। যা ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
আপন দেশের পাঠকদের জন্য পোস্ট নিচে হুবহু দেয়া হলো।
আমি এই আপসহীন নেত্রী, এক মমতাময়ী নারীর (বেগম খালেদা জিয়ার ) ব্যক্তিগত নার্স হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। এটি আমার জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। খুব কাছ থেকে তাকে দেখেছি, কথা বলেছি, প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ লক্ষ্য করেছি। বাইরে থেকে যাকে আমরা রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় ঘেরা একজন শক্ত নেত্রী হিসেবে দেখি। ভেতরে ভেতরে তিনি ছিলেন আশ্চর্য রকমের সরল ও মানবিক।
তার কথাবার্তায় ছিল সংযম, আচরণে ছিল ভদ্রতা। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি কখনো কাউকে কষ্ট দিতে চাইতেন না। একজন রোগী হয়েও নিজের কষ্ট লুকিয়ে অন্যের খোঁজ নেওয়ার মানসিকতা খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখা যায়।
নার্স হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বারবার ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এমন আন্তরিকতা সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
তিনি সময়ের মূল্য দিতেন, শৃঙ্খলা পছন্দ করতেন। কিন্তু কখনো কঠোর ছিলেন না। সাধারণ মানুষের কথা উঠলেই তার চোখে আলাদা এক অনুভূতি ফুটে উঠত। ক্ষমতা বা পদমর্যাদার গর্ব নয়, বরং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই ছিল তার চরিত্রের বড় দিক।
খুব কাছ থেকে তাকে দেখার পর আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে। সরলতা ও মানবিকতাই একজন মানুষকে সত্যিকারের বড় করে তোলে। এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
এদিকে খালেদা জিয়াকে শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে তার স্বামী এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে দাফন করা হয়েছে। বুধবার বিকেল ৪টা ৪২ মিনিটে তাকে সমাহিত করা হয়।
এর আগে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা শুরুর আগে আবেগঘন সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় তিনি মায়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
বুধবার বেলা ৩টার পর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি সবার কাছে দোয়া চান।
তারেক রহমান বলেন, ‘কারও কাছে যদি মরহুমা খালেদা জিয়ার কোনো ঋণ থেকে থাকে, তাহলে আমাকে জানাবেন। আমি অবশ্যই তা পরিশোধের ব্যবস্থা করব, ইনশাআল্লাহ।’
তিনি আরও বলেন, ‘একই সঙ্গে তার কোনো ব্যবহারে বা কথায় কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে, মায়ের পক্ষ থেকে আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আপনারা দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন তাকে বেহেস্ত নসিব করেন।’
এসময় তারেক রহমানের এই বক্তব্যে জানাজাস্থলে উপস্থিত হাজারো মানুষের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অনেককে চোখের পানি ফেলতে দেখা যায়।
এরপর বেলা ৩টা ৩ মিনিটের দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা তথা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে লাখো লাখো মানুষের উপস্থিতিতে এ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মাওলানা আবদুল মালেক।
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, তিন বাহিনীর প্রধান, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূতরা, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিদেশি অতিথি, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, আলেম-ওলামাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন।
এ সময় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের আশপাশ, বিজয় সরণি, খামার বাড়ি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, মোহাম্মদপুর পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। যে যেখানে পারেন সেখানেই দাঁড়িয়ে জানাজায় যোগ দিয়েছেন।
জানাজার আগে বেগম জিয়ার দীর্ঘ জীবন নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ সংলগ্ন সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত এ জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই সারা দেশ থেকে আসেন লাখ লাখ মানুষ। আশপাশের পুরো এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের মাঠ, বাইরের অংশ, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, আগারগাঁও পর্যন্ত এলাকায় লাখ লাখ মানুষ এ জানাজায় অংশ নেন।
এর আগে, বুধবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নেওয়া হয়। তাকে বহন করা হয়েছে লাল-সবুজ রঙের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো একটি ফ্রিজার ভ্যানে। সেনাবাহিনী হিউম্যান চেইন তৈরি করে রাষ্ট্রীয় প্রোটকলে তার মরদেহ সেখানে আনা হয়।
সকাল ৮টা ৫৪ মিনিটে বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতাল থেকে বের করে গুলশানে নেয়া হয়। শুরুতে তার দীর্ঘদিনের বাসভবন ‘ফিরোজা’য় নেয়ার কথা থাকলেও পরে গাড়িটি তারেক রহমানের গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসায় নেয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর খালেদা জিয়ার স্বজন এবং বিএনপির নেতাকর্মীরা শেষবারের মতো তাকে শ্রদ্ধা জানান। বেলা ১১টা ৫ মিনিটের দিকে ছেলে তারেক রহমানের বাসা থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ বহনকারী ফ্রিজার ভ্যানটি যাত্রা শুরু করে।
আরও পড়ুন : মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন তারেক রহমান
বেগম খালেদা জিয়া চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন তার স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে। বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজ ঢাকায় আসছেন ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুতে বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত (৩১ ডিসেম্বর এবং ১ ও ২ জানুয়ারি) তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার। এ ছাড়া জানাজা উপলক্ষে বুধবার সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
আপন দেশ/এনএম
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































