ছবি: আপন দেশ
এটা দীর্ঘ এক যাত্রার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাওয়ার কাহিনী। অধিকাংশই দ্বিমত থেকে, কিছু দমনপীড়ন আমাকে আহত করায় ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বে থাকা আওয়ামি লীগকে পাশে সরিয়ে রেখেছি। এবং আজও তাই করি। কেন করি, তার ব্যাখ্যা কেউ চাইবেন না। কারণ যুক্তির বিরুদ্ধে কুযুক্তি আছে। আছে যুক্তি-অযুক্তি বা কুযুক্তির বাইরের বিষয়ও। ফলে তর্ক সেখানে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। সেই তর্কের জট ছাড়ানো যায় না। কেন না, দুপক্ষই নিজের নিজের যুক্তি-তর্কের বাহানায় মগ্ন থাকে।
এক সময় সেই দুজনই দুই মেরুদূর সম্পর্কের নিখিলে বসবাস করে। সামাজিক এই ভিন্ন মতের পর আর সম্পর্ক অটুট থাকে না। এভাবেই শত্রুতা বাড়ে। এভাবেই ভিন্ন মত ষড়যন্ত্রের আকশিতে ঝুলতে থাকে। এটা সমাজের জন্য, প্রগতির জন্য, অগ্রগামি চিন্তার ভিন্নতাকে গোড়াতেই আটকে দেয়। তখন ভয় কাজ করে। তখন শত্রুকে হত্যায়ও কসুর করে না।
আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কিছু পাওয়ার আশা করিনি। কিন্তু পরিচিতিপত্র বা কার্ড বা জেনারেল ওসমানি প্রদত্ত সার্টিফিকেট পেলেও, আওয়ামি ও ভারতীয় এজেন্ট লে.জে এরশাদ তা হাতিয়ে নিয়ে গেছে তার ক্ষমতার দাপটে। তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করতে চেয়েছিলেন, এ-কথা বলে তিনি সার্টিফিকেট নিলেন, কিন্তু তা আর ফেরৎ দিলেন না।
এই সব রাজনৈতিক চৌর্য়বৃত্তি আমাকে প্রতিনিয়তই আহত করে, আমাকে হিংস্র করে তোলে। কিন্তু যেহেতু আমি একজন সাধারণ প্রজ্ঞাবান মানুষ, তাই বিরোধ এড়াতেই পছন্দ করি। ভারত বিরোধী একটি ফেসবুক কন্টেন্ট দেবার অপরাধে বুয়েটের ছাত্র ফাহাদকে যে ভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, তা আমাকেও নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
১৯৭৫ সালের মাঝের মাস আগস্ট থেকে নভেম্বরে তিনটি ইতিহাস সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটেছে। ১৫ আগস্টে স্বপরিবারে শেখ মুজিবকে হত্যা, ৩ নভেম্বরে ব্রিগেয়িার খালেদ মোশাররফের পাল্টা ক্যু এবং সেনাপ্রধান মে. জে. জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে রাখা। আর সাত নভেম্বর সিপাহিরা প্রতিবিপ্লবীদের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে। মুক্ত করে জিয়াকে। পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নিয়ে তিনি চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সামরিক শাসনের নিগড় ছিঁড়ে ফেলেন নিজেই। এবং প্রথমবারের মতো দেশে একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন। প্রেসিডেনশিয়াল ফর্মের গণতান্ত্রিখ শাসনধারা কায়েম করেন। বহুদলীয় নির্বাচনী পথ ধরে দেশে কায়েম হয় গণতন্ত্র। অতীতে কোনো সামরিক শাসকের পক্ষে গণতন্ত্রে ফিরে আসা দুর্লভ। কিন্তু উল্টোচিত্র তো আমাদের স্বাধীনতার পরই ঘটেছে। গণতন্ত্রকে একদলীয় শাসন বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে স্বৈরাচার কায়েমের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদেরসেই নিগড়ে ফেলে। আর সেই বাকশালের নির্মম শাসন আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে সব সময়, সব বিষয়ে ব্যক্তির অধিকারই একটি জাতির আকাঙ্খা পূরণ নাও করতে পারে।
আরও পড়ুন<<>>ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা ফিরছে না...
শেখ মুজিব এ-দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্খার শিরটিকে ধরতে পারেননি। তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে সারাজীবন কাটিয়েছেন। সেই তিনি কিভাবে একদলীয় ও স্বৈরাচারি শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেন? তার মানে হচ্ছে তিনি গণতন্ত্রেই বিশ্বাস করেননি কোনোদিন। তিনি ভেতরে ভেতরে স্বৈরাচারই ছিলেন। এই চরিত্রের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাবো মুক্তিযুদ্ধের প্রাক-কালে তার চার পাশে জমে থাকা নেতাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা থেকেই। তিনি একগুয়েমি করেছেন। তার ডিসিশনই ফাইনাল। গণতন্ত্রে এটা অসহ্য। গণতন্ত্রে সামষ্টিক অভিমতই মেনে চলতে হয়। এক ব্যক্তিক চেতনাই মুজিবকে স্বৈশাসকে রুপান্তরিত করেছে। ব্যক্তিগত আধিপত্যের কারণেই আওয়ামি লীগ মুজিব আমলে এবং তার কন্যা হাসিনার আমলেও গণতন্ত্র-চ্যুত হয়েছে। বাকশালের মতোই হাসিনাও একগুয়েমি করে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠেছিলেন। মুজিব হত্যার ভেতর দিয়ে আর হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে বেঁচেছেন। একজন মরে বেঁচেছেন, অন্যজন পালিয়ে গিয়ে বেঁচেছেন। এই সব কুকীর্তির কারণে আমি আওয়ামি রাজনীতির কঠিন সমালোচক।
২.মনে রাখতে হবে সিপাহি-জনতার হাত ধরে জিয়া ক্ষমতায় এসেছিলেন। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। আর সেই সূচনা ছিলো গণতন্ত্রের ভিত রচনা। কিন্তু সেই ভিত শক্ত-পোক্ত করে তোলার জন্য যে সময় ও সুযোগ প্রয়োজন ছিলো, তা সম্প্রসারণবাদি অরাজনৈতিক শক্তি জিয়াকে হত্যা করে তার গতি থামিয়ে দেয়। আবারও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদি শক্তির উত্থান ঘটে এরশাদের ক্যু-এর মাধ্যমে। অরাজনৈতিক আধিপত্যবাদিদের ক্ষমতার শাসন আমরা গত ১৭/২০ বছর দেখে আসছি। বিএনপি টানা ১৭ বছর হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সেই ক্ষমতাকে নড়বড়ে খুটির অবস্থায় নিয়ে আসে। কিন্তু গুপ্ত সাম্রাজ্যবাদিদের সহযোগ থাকায় বিএনপি সাফল্যের চূড়ান্তে পৌছাতে পারেনি। বৈষম্য বিরোধী ছাত্রদের সহযোগ সৃষ্টি হওয়ায় স্বাধীন চেতনার জনতাও যোগ দেয় তাদের কোটা বিরোধী আন্দোলনে। এবং হাসিনার মতো হিংস্র ফ্যাসিস্টের উৎখাতে। বিজয় অর্জিত হয় গণমানুষের আকাঙ্খার লাল সূর্য উদয়ের মাধ্যমে। তৈরি হয় প্রকৃত গণমানুষের শাসনের পরিবেশ-প্রতিবেশ। মানুষ স্বস্তির শ্বাস নিতে পারে। কিন্তু তারপরও শাসন ব্যবস্থায় ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক স্ট্রাকচার বিদ্যমান থাকায় প্রকৃত গণতন্ত্রের শুভ সূচনা হতে পারে না। ২৪-এর ৫ আগস্ট যে চেতনার জন্ম হয়েছে গণমনের পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে, সংবিধান সংস্কারের পক্ষে অর্থাৎ জনগণের চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে, সেই পক্ষের বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্য়ন্ত সাত নভেম্বরের লক্ষ্য পূরণ হবে না।
৩.বিজয় অর্জিত হওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ইনট্রিম সরকার এবং একটি অনন্য সাধারণ নির্বাচনের ভেতর দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ক্ষমতায় আসে। শুরু হয় সেই রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কাজ। এবার সেই সব ভুল আর করার সুযোগ নেই বটে, কিন্তু তারা যদি ডিরেইল্ড হয়, ক্ষমতার দাপটে বা ভুল সিদ্ধান্তের জেরে, তাহলে আমরা আবারো অরাজনৈতিক শাসনের নিগড়েই গিয়ে পড়বো।
১৯৭৫ সালের তিনটি ক্যু ও পাল্টা ক্যু আমাদের শিখিয়েছে যে জনগণের জন্য কাজ করতে হবে। আমি দেখতে পাচ্ছি তারেক রহমানের সরকার সেই পথেই হাঁটছে।
সিপাহি-জনতার শিক্ষা হচ্ছে অতীতের চর্বনকে পিছে ফেলে দিয়ে সামনের দিকে তাকাতে হবে। তারেক রহমান এ- জন্য তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াকে সামনে আনেননি। তিনি তার রাজনৈতিক আদর্শের অর্থনৈতিক কর্মসূচিকে নিয়েছেন। আর তা হচ্ছে জনগণের নিত্যদিনের প্রয়োজনকে সামনে তুলে আনা। মানুষের কথা বলার অধিকার, মুক্ত সাংবাদিকতার পথ উন্মুক্ত করার মাধ্যমে ত্রুটি-বিচ্যুতি নিরীক্ষণ করা। কোথায় ভুল হচ্ছে, কোথায় কি ইনপুট দিতে হবে, তা সরবরাহ করছে মুক্ত সাংবাদিকতা। তবে, আমাদের দেশে হলুদ সাংবাদিকতার একটি প্রবণতা আছে। সেটা পরিহার করতে হবে। বিশেষ করে পরাজিত শক্তির লেজুড় সাংবাদিকতা সৎ ও নির্ভীক হতে পারে না। তারা সত্য আড়াল করে নির্মান করে সত্য-মিথ্যার মিথিক পারম্পর্য়, যা দেশের সাংবাদিকতর জন্য খারাপ নয়, উন্নয়ন ধারারও বিরোধী। আমরা প্রকৃত উন্নয়ন আর প্রকৃত সত্য দেখতে চাই। কোনো দলবাজি সাংবাদিকতা চাই না।
লেখক: ড. মাহবুব হাসান, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































