ছবি: আপন দেশ
১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই শুরু হয়েছিল প্রতিবেশী ভারত ঘেঁষা কূটনৈতিক সম্পর্ক। বছর কয়েক পর মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসারির অন্যতম নায়ক জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হয়ে সরাসরি বৈরিতা বা একপক্ষীয় তোষণনীতি পরিহার করে পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা সুরক্ষায় ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় জোর দেন। কূটনীতিতে এমন সম্পর্ককে প্রাচীন রোমান সভ্যতায় ‘ডিউ অ্যাট ডেস’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত হতো।
তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে অন্যতম দর্শন হিসেবে যোগ হয়েছিল মুসলিম বিশ্বসহ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পকের উন্নতি। ২০২৬ সালে এসে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি ক্ষমতায় এসে তাঁর উত্তরসুরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ডিউ অ্যাট ডেস’ তত্ত্বে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট বা সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনভিত্তিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পূণ:প্রতিষ্ঠায় জোর দিয়েছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে অন্যতম ছিল অর্থনীতির স্বার্থে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর মধ্য জুলাইয়ে এসে কূটনৈতিক সম্পর্কে অর্জন বা অগ্রগতি দেশবাসীর কাছে একটি বড় আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কূটনীতি বিশ্লেষকরা গত ৬ (ছয়) মাসে সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে নেয়া পদক্ষেপসমূহকে মিশ্র দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছেন। কেউ বলেছেন ‘ইতিবাচক এবং সঠিক পথেই এগোচ্ছে’; আবার কেউ বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া পররাষ্ট্রনীতিই বহাল আছে।
স্বাধীনতার পর পেরিয়ে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় জাতি বহু চড়াই-উৎরাই দেখেছে। এর মধ্যে বিএনপিও এর আগে দুই মেয়াদে (১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬) রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। তবে, ২০০৯ সাল থেকে টানা ক্ষমতায় থেকে আওয়ামীলীগ সরকার স্বৈরাচারী হয়ে উঠলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে ভারত আশ্রয় নেন। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন একটি অন্তর্বর্তী সরকার। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসনিার বিরুদ্ধে ভারততোষণ কূটনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ উঠে। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক তেতো হয়। এর জের ধরে ভারতে দেশটির সরকার কর্তৃক বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধসহ জ্বালানি আমদানি, উন্নয়ন প্রকল্পের ঋণ বাতিল এবং ব্যবসা-বাণিজ্য একরকম বন্ধ হয়ে যায়।
আরও পড়ুন< ড. মাহবুব হাসানের লেখা > শহীদ জিয়া: গণতন্ত্রের প্রথম মুক্তিদাতা
এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠন করে প্রথম বিদেশ সফরে বেছে নেন মালয়েশিয়া ও চীন। জুন মাসের ওই সফরে সংশ্লিষ্ট সরকার প্রধানদের সঙ্গে আলোচনায় আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয় বন্ধ থাকা জনশক্তি রফতানি পুনরায় চালু করা, আমদানি-রফতানি ও বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ এক কর্মকর্তাকে বাংলাদেশ সফরে পাঠিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে গত জুনে ঢাকায় ভারত সরকারের নবনিযুক্ত হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের সম্পর্ক জোরদার করতে তার দেশের প্রধানমন্তীর বার্তা পৌছে দেন। দেশে ফিরে গিয়ে হাই কমিশনার দীনেশ সরকারপ্রধান নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গেও দেখা করে ঢাকার বার্তা পৌছে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তীতে শেখ হাসিনাকে আশ্রয়দান কেন্দ্র করে সৃষ্ট দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন। এরই মধ্যে দীনেশ ত্রিবেদী’র এ সফর ঘিরে একটি আশাব্যাঞ্জক উন্নতির ইঙ্গিত রয়েছে বলে পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন।
সাবেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মুন্সি ফয়েজ আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেন, দৃশ্যমান কূটনৈতিক পদক্ষেপসমূহ ঠিক পথেই আছে। তবে, পথ যেনো না হারায়। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পূণরুদ্ধারে দুই দেশের প্রচেষ্টাই সম্প্রতি ফুটে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তো চুক্তিই হয়েছে। এটাকে দেশের স্বার্থে কি করে ম্যাটারিয়ালাইজ করা যায় তাই বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে এমন সকল এক্সারসাইজ প্রাধান্য দিতে হবে।
তিনি বলেন, পররাষ্ট্র সম্পর্ক সময় ও ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। বন্ধুদের (বন্ধু রাষ্ট্রদের) বুঝিয়ে দিতে হবে যে আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে আমাদের সম্মান, মর্যাদা ও স্বার্থ সুরক্ষায় আপনাকে সংবেদনশীল ও যত্নবান হতে হবে।
ছয় মাসে বিএনপি সরকার কূটনীতিতে নিজেদের দর্শন কতটুকু অর্জন করতে পেরেছে? এ প্রশ্নের জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত, প্রখ্যাত কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির বলেন, আমি তো মনে করি অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতিই বহাল রয়েছে। এখন পররাষ্ট্র সম্পর্ক অনেক কঠিন; অনেক চ্যালেঞ্জিং। বাইরের পৃথিবীতে পররাষ্ট্রনীতি বদলে যাচ্ছে। সকল রাষ্ট্রের সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ তত্ত্বের পররাষ্ট্রনীতি শ্লোগান হিসেবে ভালো। কিন্তু এর যথাযথ প্রয়োগে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, সহমত ও সক্ষমতা উচ্চ পর্যায়ের হতে হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দুই দেশই কূটনীতিতে সর্বোচ্চ মানের। তাদের সঙ্গে কূটনীতিতে স্বার্থরক্ষার দরকষাকষি অনেক চ্যালেঞ্জিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের কূটনীতি প্রায়োগিক ক্ষেত্রে দেশ ও জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় সেরকম উচ্চতর মানের দক্ষতা ও সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
গত ১১ আগস্ট সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সরকার এখন সামনের দিকে তাকাতে চায়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ভারতের দিক থেকে এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কারণ, অতীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও একটি নির্দিষ্ট সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন ও সন্দেহ রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম দেশ। এ দেশের সঙ্গে আগামীতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে উপর্যুক্ত মর্যাদাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসতে হবে। আমরা মনে করি, বন্ধু পরিবর্তন করা যায় কিন্ত প্রতিবেশি পরিবর্তন করা যায় না। পারস্পরিক উদ্যোগেই সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সরকারের সঙ্গে নয়, বরং বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে হওয়া উচিত। ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে বিন্যাস বা ‘রিঅ্যালাইনমেন্ট’-এর প্রয়োজন রয়েছে। যোগ করেন উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
[email protected]
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































