ছবি: আপন দেশ/এআই
এই মন্ত্রণালয়টিকে কেন বার বার বিতর্কিত করা হচ্ছে? দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ, দেশের সূর্য সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করা এই মন্ত্রণালয় ফ্যাসিস্ট আমলে বিতর্কিত ও সমালোচনা মুখোমুখি করা হয়েছিল সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ইচ্ছায়। বিদেশি যুদ্ধ বন্ধুদের পদকের স্বর্ণ- রূপা চুরির অভিযোগ উঠেছিল এই মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে।
সত্যতা পেলেও কোন বিচার হয়নি অভিযুক্তদের। ভূয়া মুক্তিযুদ্ধাদের তালিকা করে দীর্ঘ দেড় দশক সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল এই মন্ত্রণালয়টি। সকলের হয়তো মনে আছে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার এই মন্ত্রণালয়টি গঠন করেছিলেন। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো এই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশেও কেন এই মন্ত্রণালয়টি বিতর্কিত করা হলো? কারা এই ষড়যন্ত্রের পেছনে কলকাঠি নেড়েছে? কি ফায়দা হাসিলের জন্য এই অপচেষ্টা করা হলো? এমন হাজারো প্রশ্ন মানুষের মনে।
বলছিলাম মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কথা। রক্তস্নাত জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করার দায়িত্ব পেয়েছে এই মন্ত্রণালয়। গণঅভ্যুত্থান নিয়ে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে কি কাজ হচ্ছে বা করা হয় তা জাতির সামনে আসে কম। তবে যে কাজটি দৃশ্যমান হলে তাতে আবারো প্রশ্ন উঠেছে মন্ত্রণালয়টি ঘিরে।
প্রথম কাজেই চরমভাবে হতাশ করেছে পুরো জাতিকে। প্রশ্ন উঠেছে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও কর্ম পদ্ধতি নিয়ে। তাদের এই অপকর্মের দায় নিতে হয়েছে খোদ সরকারকে। বিতর্কিত হয়েছে সরকারের সদিচ্ছা। মাথা হেট হয়েছে বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে ৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে বুধবার। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ- চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ শিরোনামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।
অনুষ্ঠানে প্রচারিত একটি তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারিতে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সঠিকভাবে তুলে না ধরার অভিযোগ তোলেন এনসিপি'র নেতারা।
তথ্যচিত্র নিয়ে আপত্তি, বিতর্ক, বাগ্বিতণ্ডা হয় এবং এনসিপি নেতারা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। হট্টগোলের এক পর্যায়ে কূটনীতিকরাও বেরিয়ে গেছেন। অনুষ্ঠানে হট্টগোলের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তথ্যচিত্রে ১ দফা ঘোষণা, ৯ দফা-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের কেউ কেউ, বিশেষ করে এনসিপি নেতারা প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার অনুষ্ঠানে ছিলেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন,...... তথ্যচিত্রে যে নাহিদ ইসলাম নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে ১ দফার ঘোষণা দিলেন, তিনি বিএনপির ইতিহাসে নেই। যে আসিফ মাহমুদ মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ ঘোষণা করলেন, তিনি ইতিহাসে নেই।
হট্টগেলের এ পর্যায়ে অনুষ্ঠানের মঞ্চে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি সবাইকে শান্ত হওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে তথ্যচিত্রে কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধনের কথাও বলেন তিনি। অবশ্য তখনো দর্শকসারি থেকে ‘আমাদের নিয়ে টালবাহানা করা চলবে না’সহ নানা স্লোগান দেওয়া হয়। মন্ত্রীকেও দেখা যায় বারবার অনুরোধ করতে।
এরপরও অনুষ্ঠানে শৃঙ্খলা না আসায় মাইকের সামনে আসেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তিনি অনেকটা ধমকের সুরে বলেন, ‘আপনারা কি নিজেদের জাহির করার জন্য আসছেন?’ যাঁরা স্লোগান দিচ্ছিলেন, তাঁদের উদ্দেশে ইশরাক আরও বলেন, ‘কী করছেন আপনারা? আপনারা শহীদ পরিবারদের জন্য কী করেছেন? কিছুই করেন নাই আপনারা।’ প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণ ও শারীরিক ভাষা উপস্থিত অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।
আরও পড়ুন<> ড. মাহবুব হাসানের লেখা<>শহীদ জিয়া: গণতন্ত্রের প্রথম মুক্তিদাতা
এরপর আহমেদ আযম খান ইশরাক হোসেনকে শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং একই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মাইকের সামনে আসেন। তিনি কথা বলার মাঝে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে কয়েক বার ডাকেন। কিছুক্ষণ পর মঞ্চে এসে আখতার বলেন, আমি জুলাই যোদ্ধাদের একজন হয়ে এবং আমার দলের একজন প্রতিনিধি হিসেবে এই প্রোগ্রামের সফলতা কামনা করি, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পক্ষে এবং আমার যে সহযোদ্ধারা আছেন, তাঁদের জন্য একটি সুন্দরের আকাঙ্ক্ষায় আমার পক্ষে এই প্রোগ্রামে অবস্থান করা সম্ভবপর নয়। আখতার আরও বলেন, আমি আজকের এই অনুষ্ঠানের মাননীয় রাষ্ট্রপতি, তাঁকে আমি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। তিনি বাংলাদেশের পক্ষে যেভাবে অবস্থান নিয়েছেন, সেটাকে আমরা ধারণ করি। তিনি একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা, একই সঙ্গে জুলাই যোদ্ধা, তাঁর প্রতি সম্মান ব্যক্ত করছি। সেই সম্মান রেখে আমি নীরবে এখান থেকে প্রস্থান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম।
মঞ্চ ছাড়ার আগে এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, রাষ্ট্রীয় একটা প্রোগ্রামেও ইতিহাসের সবকিছুকে আমরা ধারণ করতে ব্যর্থ হলাম। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যেমন একপেশেভাবে আওয়ামী লীগ দখল করেছিল, ঠিক একই ধরনের একটা পরিস্থিতি এখানে তৈরি হয়েছে।
আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যচিত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ৯ দফার কথা উল্লেখ করা হয়নি। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে যে এক দফার ঘোষণা দেওয়া হলো, সে বিষয়টাও নেই।
অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ভুলত্রুটি মানুষের হতেই পারে। সবাই মিলে সেসব ভুল সংশোধন করতে হবে। তবে জাতীয় অনুষ্ঠানে বিদেশিদের সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, এইভাবে যে বিদেশের সামনে, বিদেশি অতিথিদের সামনে যে নাস্তানাবুদ হলাম, এটি আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে। এবং এই ঘটনায় সবচেয়ে খুশি হবে যিনি পাশের দেশে বসে আছেন, তাঁর জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন।
আরও পড়ুন<> শায়রুল কবির খানের লেখা<> জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী দর্শন
অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে ভুলের সমালোচনা করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, সেখানে শহীদ আবু সাঈদের ছবি ছিল না। অথচ আবু সাঈদ জুলাই বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি ও প্রতীক। তাঁর ছবি ছাড়া ওই আন্দোলনের কোনো তথ্যচিত্র পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছবিও তথ্যচিত্রে ছিল না বলে উল্লেখ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। এভাবেই একটি অচলাবস্থার মাঝেই অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।
এরকম একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে তা-ও আবার ৫ আগস্টের দিন তা কখনো কাম্য হতে পারে না। জুলাই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের আইকনিক ছবি বলতে রংপুরের আবু সাঈদের দু'হাত প্রসারিত ছবিকেই বোঝায়। অথচ এ ছবি বাদ দিয়ে দেয়া হলো সরকারের সর্বোচ্চ অনুষ্ঠানে। এটাকে ভুল বললে সত্যিকার ভুল কোনটা তা নিয়ে সন্দিহান প্রকাশ করতে হবে।
খুব দ্রুত এই কাঁদা ছুড়াছুড়ি বন্ধ করতে হবে। তা নাহলে জুলাই - আগস্টের ফসল নষ্ট হবে। ইতিহাসের পাতায় বিতর্কিত হয়ে পড়বে জুলাই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান। বৃথা হয়ে যাবে ১৪ শ' ছাত্র- জনতার আত্মবলিদান। ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে আজকের প্রজন্মকে। জীবদ্দশায় বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির সমাবেশে ভার্চুয়ালী যুক্ত হয়ে কয়েকবার ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ছাত্র ও তরুণদের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৫ আগস্ট সকালেও জুলাই স্মৃতি যাদুঘর উদ্বোধনকালে বলেছেন, ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক দেশের আপামর জনগণ। তিনি ঐক্যের কথা বলেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথেও তো মিল নেই মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের কর্মকান্ডের। তারা জুলাই আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে মনগড়া ইতিহাস রচনা করছে। এই ঘটনার পিছনে নিশ্চয়ই কোন না কোন ষড়যন্ত্র আছে। না হয় কোন অপরিপক্ক অথবা ইঁচড়েপাকাদের হাতে এমন অপকর্ম হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কে বা কারা এই সব অপকর্মের হোতা? তা দ্রুত বের করতে হবে। সরকারের ভিতরে থাকা অদৃশ্য এই অতি দানবীয় শক্তিকে রুখে দিতে এখন, এই মুহূর্তে।
লেখক: মাহমুদ হাসান, সিনিয়র সাংবাদিক ও হেড অব নিউজ, গ্রীণ টিভি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































