Apan Desh | আপন দেশ

সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের নানা উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৭:২৯, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৭:৪৩, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের নানা উদ্যোগ

ফাইল ছবি

সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব স্থাপন, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন।

পাশাপাশি, সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।

সাইবার অপরাধের কারণে বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি, পারিবারিক কলহ, মানসিক বিপর্যয় ও সামাজিক মর্যাদাহানি। অনলাইনে হয়রানি, হুমকি ও প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকে মানসিক চাপ, ভয় ও হতাশায় ভুগছেন। ভুয়া আইডি খুলে মিথ্যা তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে প্রতারণার কাজে ব্যবহার করছে অপরাধীরা। 

অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিং এবং ভুয়া লিংকের মাধ্যমে প্রতারকেরা মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, পাসওয়ার্ড ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরির ঘটনাও ঘটছে। 

এ প্রসঙ্গে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সাইবার জালিয়াতি, হ্যাকিং ও অনলাইন হয়রানি-সংক্রান্ত যেসব মামলা সিআইডিতে আসে, সেগুলো পেশাদারত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সাইবার অপরাধ দমনে নিয়মিত নজরদারি ও টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। 

তিনি বলেন, সাইবার অপরাধ তদন্তে কর্মরত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য সাইবার ট্রেনিং সেন্টার, ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এফটিআই) ও ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে (ডিটিএস) চলমান প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে নতুন নতুন মডিউল যুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া পুলিশ সদরদফতরের উদ্যোগে সম্প্রতি দেশব্যাপী ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স চালু করা হয়েছে। এতে সিআইডির কর্মকর্তারাও অংশ নিচ্ছেন।

সিআইডির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) ৩২টি ও সিআর (ক্রিমিনাল রেজিস্টার) ১৫৯টিসহ মোট ১৯১টি মামলা হয়েছে। এছাড়া সাইবার অপরাধের অভিযোগে এক বছরে ১০১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত রাজধানীর আটটি বিভাগে সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত মামলায় বিভিন্ন সংখ্যক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে রমনা বিভাগে ৮৮টি মামলায় ১৬৩ জন, লালবাগে ২২টি মামলায় ২৩ জন, ওয়ারীতে ১২টি মামলায় ২৪ জন, মতিঝিলে ৩৩টি মামলায় ৪৯ জন, তেজগাঁওয়ে ৫৩টি মামলায় ৪৯ জন, মিরপুরে ৩৩টি মামলায় ২৭ জন, গুলশানে ৩৮টি মামলায় ৩৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৬টি মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন <<>> ইউরোপ থেকে ফেরত এলো ৩৫ বাংলাদেশি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে সাইবার অপরাধ দিন দিন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। অনলাইনে প্রতারণার ফাঁদ হিসেবে ঘরে বসে খণ্ডকালীন কাজ করে আয় কিংবা ইউটিউবের ভিডিওতে ‘লাইক’ দিয়ে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে সাধারণ গৃহিণী, শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

প্রথমে এক হাজার বা দুই হাজার টাকা বোনাস দিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করা হয়। পরে বিভিন্ন ‘টাস্ক’ পূরণের নামে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করিয়ে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু গত এক বছরেই এ ধরনের আর্থিক প্রতারণায় সাধারণ গ্রাহকেরা শত শত কোটি টাকা হারিয়েছেন।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পুলিশ যেকোনো অপরাধ দমনে তৎপর রয়েছে। সমাজ থেকে অপরাধ দমন ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাইবার বুলিং ও অনলাইন প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। মিথ্যা সংবাদ ও ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে সমাজে আতঙ্ক, বিভ্রান্তি ও বিরোধ সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতার অভাব, দুর্বল পাসওয়ার্ড, অপরিচিত লিংক ও ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ এবং সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব এ ধরনের অপরাধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, প্রযুক্তির জয়যাত্রার সমান্তরালে দেশজুড়ে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। এ অপরাধের জালে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে পড়ছেন সমাজের সাধারণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ। ওটিপি শেয়ারিং, ভুয়া ফোনকল, ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে প্রতারণা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় হারাচ্ছেন। অনেকে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, আবার কেউ কেউ মৃত্যুর দিকেও ধাবিত হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা, অচেনা কাউকে পিন বা ওটিপি না দেয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন বলেন, সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশ দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে। সাইবার অপরাধ দমনে সক্ষমতা বাড়াতে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) একটি সাইবার ল্যাব রয়েছে।

তিনি বলেন, এছাড়া কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমে (সিটিটিসি) একটি ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ডিজিটাল অপরাধের মামলা তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগও নেয়া হবে।

পুলিশ সদরদফতর জানিয়েছে, সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে চলতি মাসে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব উদ্বোধন করা হয়েছে।

এছাড়া ১ অক্টোবর ঢাকায় স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠন করা হয়েছে। ইউনিটটিতে ৪ হাজার ৫৯২ জন পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মী রয়েছেন। একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে ইউনিটটি পরিচালিত হচ্ছে। বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়েও সাইবার অপরাধ তদন্তের জন্য পৃথক কার্যক্রম বা ডেস্ক রয়েছে।

সম্প্রতি মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজে সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তের ওপর ১০ দিনব্যাপী বিশেষ ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স পরিচালনা করা হয়। এর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তারা পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন।

আপন দেশ/কেএম/এসএস

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়