ছবি: আপন দেশ
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ঋণের বোঝা, ছাড়িয়েছে ৩৬৫ লাখ কোটি ডলার। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বৈশ্বিক ঋণ বেড়েছে ১০ লাখ কোটি ডলার।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র, আর ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার ৪৯০ কোটি ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ঋণের এই বিশাল চাপ নতুন করে সামনে আনছে দেশগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক অর্থায়নবিষয়ক সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, সরকার, পরিবার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ মিলিয়ে বিশ্বে ঋণের পরিমাণ এখন ৩৬৫ লাখ কোটি ডলারের বেশি। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের হিসাবে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার।
ঋণে শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র : সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ঋণ ৪১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১২৭ শতাংশ।
তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের ঋণ ২২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১০৪ শতাংশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাপানের ঋণ ৮ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার। তবে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণের অনুপাত সবচেয়ে বেশি, দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১৯৯ শতাংশ।
চতুর্থ অবস্থানে যুক্তরাজ্যের ঋণ ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১০২ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা ফ্রান্সের ঋণ ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ।
ষষ্ঠ অবস্থানে ইতালির ঋণ ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে সপ্তম অবস্থানে জার্মানির ঋণ ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ৬৫ শতাংশ।
ঋণগ্রস্ত দেশ হিসেবে ভারতের অবস্থান ৮তম। ভারতের সরকারি ঋণ ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ৮৩ শতাংশ। নবম অবস্থানে কানাডার ঋণ ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি ডলার এবং দশতম অবস্থানে ব্রাজিলের ঋণ ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার।
আরও পড়ুন <> ঘূর্ণিঝড় চাম্পির দাপটে লণ্ডভণ্ড পূর্ব এশিয়া, বন্ধ শত শত ফ্লাইট
ঋণের তালিকায় ৪৫তম বাংলাদেশ : বিশ্বের সরকারি ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার ৪৯০ কোটি ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৪০ শতাংশ।
ঋণের পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলো। তবে ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির তুলনায় ঋণের অনুপাতও গুরুত্বপূর্ণ।
সুদের পেছনে ব্যয় ৩৩ লাখ কোটি ডলারের বেশি : বিশ্বে ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের ব্যয়ও বাড়ছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো গত এক বছরে সরকারি ঋণের সুদ বাবদ ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।
এই ব্যয় বিশ্বের সামরিক খাতে মোট ব্যয়ের চেয়েও বেশি। সামরিক খাতে বিশ্বে ব্যয় প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যয় ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ব্যয় ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের বেশি অর্থ ব্যয় হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবসরকালীন ভাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে যায়। সুদের অর্থ জোগাতে সরকারকে কর বাড়াতে কিংবা বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমাতে হতে পারে।
ইউরোপে বাড়ছে ঋণের চাপ : ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনসংকট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থের ঘাটতি নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। কিছু জায়গায় সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
ফ্রান্সে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত শনিবার দেশজুড়ে পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে।
বিক্ষোভের মধ্যেই দেশটির সরকারি ঋণ ও সুদের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ১০ বছর মেয়াদি ঋণের বিপরীতে ফ্রান্সকে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। ঋণের সুদের এই ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, ফ্রান্সকে ঋণ দিতে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি মুনাফা চাইছেন।
ইউরোপের ঋণসংকটের সময় ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশকে ঋণের জন্য উচ্চ সুদ দিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আর্থিক সহায়তা নিতে হয়েছিল। বর্তমানে ফ্রান্সের ঋণের সুদের হার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইউরোপে শুধু যুক্তরাজ্যের ঋণের সুদের হার ফ্রান্সের চেয়ে বেশি।
ভবিষ্যতে ফ্রান্সের ঋণ আরও বাড়ার আশঙ্কা : আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে দেশটির সরকারি আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হতে পারে।
সরকার সাধারণত অর্থ সংগ্রহের জন্য ঋণপত্র বিক্রি করে। বিনিয়োগকারীরা এসব ঋণপত্র কিনে সরকারকে অর্থ দেন এবং বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে সুদ পান। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সরকার মূল অর্থ ফেরত দেয়।
ঋণপত্রের দাম কমলে সাধারণত এর বিপরীতে সুদের হার বেড়ে যায়। ফলে নতুন করে ঋণ নিতে সরকারকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এতে শিক্ষা, হাসপাতাল ও সড়কের মতো জরুরি খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণের সুদের হার বাড়লে বাড়ি কেনার ঋণ, গাড়ির ঋণ ও ঋণপত্রভিত্তিক ব্যক্তিগত ধার নেওয়ার খরচও বাড়তে পারে।
বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সেবার জন্য পর্যাপ্ত অর্থের জোগান নিশ্চিত করা। সূত্র: আল জাজিরা
আপন দেশ/এমটিআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































