Apan Desh | আপন দেশ

ভ্রমণে নতুন চমক বিশ্বের ৫ শহর

প্রকাশিত: ১০:২৫, ২২ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১০:২৬, ২২ অক্টোবর ২০২৬

ভ্রমণে নতুন চমক বিশ্বের ৫ শহর

ছবি : সংগৃহীত

প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে বিশ্বের নানা শহরের রূপ। কোথাও গড়ে উঠছে আধুনিক স্থাপনা, কোথাও বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা। আবার কোথাও ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন আকর্ষণ। 

পর্যটকদের জন্যও নতুন অভিজ্ঞতার দুয়ার খুলছে এসব পরিবর্তন। 

চলুন, জেনে নেওয়া যাক বিশ্বের দ্রুত বদলে যাওয়া পাঁচ শহরের কথা এবং কেন ঘুরে আসবেন এসব শহর থেকে।

নিউইয়র্ক, লন্ডন ও প্যারিসের বাইরে ভ্রমণে নতুন আকর্ষণ হতে পারে তুলুজ, হো চি মিন সিটি, ওয়ারশ, মেডেলিন ও আবুধাবি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, খাবার ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে শহরগুলো টানছে পর্যটকদের।

বিশ্বের জনপ্রিয় পর্যটন শহরগুলোর বাইরে নতুন গন্তব্য খুঁজছেন ভ্রমণপিপাসুরা। তাদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে ফ্রান্সের তুলুজ, ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটি, পোল্যান্ডের ওয়ারশ, কলম্বিয়ার মেডেলিন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আধুনিক অবকাঠামো, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও খাবারের বৈচিত্র্যে বদলে যাচ্ছে শহরগুলোর পরিচিতি।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের ২০২৬ সালের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে বিশ্বের পরিচিত শহরগুলোর পাশাপাশি নজর দেয়ার মতো ২৮টি শহর চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখান থেকে পাঁচটি শহর বেছে নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভ্রমণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে শহরগুলোর পরিবর্তন ও পর্যটন আকর্ষণ।

তুলুজ, ফ্রান্স : ফ্রান্সের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোর একটি তুলুজ। আগামী চার বছরে শহরটির জনসংখ্যা ৫৭ হাজার বাড়তে পারে। স্বস্তিদায়ক আবহাওয়া, তুলনামূলক কম জীবনযাত্রার ব্যয় ও উন্নত জীবনমানের কারণে তরুণ এবং দক্ষ পেশাজীবীদের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে শহরটি।

লন্ডনে ১০ বছর থাকার পর তুলুজে ফেরা এলোদি পারামেলের মতে, বড় শহরের প্রাণচাঞ্চল্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি এখানে শান্ত জীবন উপভোগের সুযোগ রয়েছে। ক্যাফে, ককটেল বার ও ভালো খাবারের জায়গার সংখ্যাও বাড়ছে।

প্যারিসে সাত বছর কাটিয়ে তুলুজে ফেরা মেলোদি টাইলার বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহরটি অনেক বদলেছে। হাঁটা ও সাইকেল চালানোর পরিবেশ আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। ঐতিহাসিক কেন্দ্রের বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় উৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজন হচ্ছে।

মহাকাশ ও উড়োজাহাজশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত তুলুজ। এয়ারবাসের বৈশ্বিক সদর দফতরসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে এখানে। মহাকাশ সম্পর্কে জানতে পর্যটকেরা ঘুরে দেখতে পারেন সিতে দ্য লেসপাস মহাকাশ জাদুঘর। আর উড়োজাহাজের ইতিহাস জানতে যেতে পারেন অ্যারোস্কোপিয়া জাদুঘরে।

আরও পড়ুন <> জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস : স্বপ্নের নিরাপদ সড়ক বাস্তব হবে কবে?

হো চি মিন সিটি, ভিয়েতনাম : ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় শহর হো চি মিন সিটি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে শহরটি বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল ৫০টি শহরের মধ্যে জায়গা করে নিতে পারে। ২০৫০ সালের মধ্যে এর অর্থনীতি জার্মানির বার্লিনের সমপর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

শহরটির পরিবর্তনের অন্যতম নিদর্শন প্রথম মেট্রোরেল। ২০২৪ সালের শেষ দিকে চালু হওয়া প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ শহরের কেন্দ্রের বেন থান বাজার থেকে সুয়ি তিয়েন থিম পার্ক পর্যন্ত বিস্তৃত।

আধুনিক অবকাঠামোর পাশাপাশি ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপনা ও স্থানীয় সংস্কৃতিও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। ঘুরে দেখা যায় সেন্ট্রাল পোস্ট অফিস, অপেরা হাউস ও ওয়ার রেমন্টস জাদুঘর।

খাবারের বৈচিত্র্য উপভোগ করাও ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। পর্যটকেরা চোখে দেখতে পারেন ভিয়েতনামি ব্যাগেট স্যান্ডউইচ বান মি, ভাঙা চাল দিয়ে তৈরি কোম তাম ও মুচমুচে প্যানকেক বান সেও।

কেন্দ্রীয় জেলা-১-এর বাইরেও রয়েছে ঘোরার মতো জায়গা। ঐতিহাসিক চায়নাটাউন চো লোনের বাজার, মন্দির ও ওষুধের দোকান যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি থাও দিয়েন এলাকায় রয়েছে বুটিক, গ্যালারি ও স্থানীয় ব্র্যান্ডের দোকান।

ওয়ারশ, পোল্যান্ড : পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জীবনমানের উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে শহরটি ১০০টির বেশি ধাপ এগিয়ে ৬১তম অবস্থানে উঠেছে। জীবনমানের সূচকে লন্ডন, নিউইয়র্ক ও টোকিওর চেয়েও এগিয়ে রয়েছে শহরটি।

পোলিশ-অস্ট্রেলীয় কনরাড ওয়ারজেচার মতে, গত দুই দশকে ওয়ারশর পরিবর্তন অসাধারণ। নতুন রাস্তা, মহাসড়ক ও আকাশচুম্বী ভবন শহরের চেহারা বদলে দিয়েছে। একই সঙ্গে রাস্তাঘাটের পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তারও উন্নতি হয়েছে।

প্রথমবার ওয়ারশ গেলে প্যালেস অব কালচার অ্যান্ড সায়েন্স থেকে ঘোরাঘুরি শুরু করা যেতে পারে। সেখান থেকে নোভি শভিয়ান্ত সড়ক ধরে পৌঁছানো যায় ঐতিহাসিক পুরোনো শহরে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল।

শহর ঘুরতে ঘুরতে খেয়ে দেখতে পারেন পোলিশ ডোনাট পঁচকি। স্থানীয় বার মিলেচনি বা সাধারণ খাবারের দোকানেও মিলবে ঘরোয়া স্বাদের খাবার। পানীয়সহ তিন পদের খাবারের জন্য খরচ হতে পারে প্রায় ১৩ পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দুই হাজার ১০০ টাকা।

মেডেলিন, কলম্বিয়া : একসময় বিপজ্জনক শহর হিসেবে পরিচিত মেডেলিন এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও ব্যবসাকেন্দ্র হয়ে উঠছে। গত ২০ বছরে শহরটির ব্যবসা ও আর্থিক সেবাখাতে কর্মসংস্থান দ্বিগুণের বেশি হয়েছে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০-এর দশকে মেডেলিনের গড় আয় বুয়েনস এইরেস ও সাও পাওলোর চেয়ে বেশি হতে পারে।

গত ১০ বছর ধরে শহরটিতে বসবাস করা প্যাট্রিক কুইন বলেন, একসময় মূলত দুঃসাহসী পর্যটকেরা মেডেলিনে আসতেন। এখন শহরটি পর্যটকদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াতের জন্য রয়েছে মেট্রোকেবল। খাবার, শিল্প ও নকশার জগতেও বাড়ছে শহরটির পরিচিতি।

শহরের স্থানীয় সংস্কৃতি জানতে পর্যটকেরা যেতে পারেন পেরপেতুও সোকোরো এলাকায়। সেখানে রয়েছে নকশার দোকান, গ্যালারি ও কফির দোকান।

একসময় বিপজ্জনক এলাকা হিসেবে পরিচিত কোমুনা ১৩ এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। স্থানীয় গাইডের সঙ্গে এলাকাটি ঘুরে দেখলে দেয়ালচিত্র, চলন্ত সিঁড়ি ও সংগীতের পেছনের ইতিহাস জানা যায়। 

এ ছাড়া পবলাদো ও লরেলেস এলাকাও ঘুরে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

আবুধাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত : একসময় তেলনির্ভর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আবুধাবি এখন প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আবাসন ও আর্থিক খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের সূচকে কর্মীদের দক্ষতা ও শিক্ষার দিক থেকে শহরটির অবস্থান ষষ্ঠ। তেলবহির্ভূত অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও শহরটি আরও এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আবুধাবি ও শারজায় বসবাস করা মার্কিন নাগরিক মুনা আবু-হিজলেহের মতে, দুবাই বা শারজার তুলনায় আবুধাবি বেশি শান্ত ও খোলামেলা। এখান থেকে সহজেই সমুদ্রসৈকত, ম্যানগ্রোভ বন ও নিরিবিলি আবাসিক এলাকায় যাওয়া যায়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা জেরেমি সাভরির মতে, দুবাইয়ের জাঁকজমকের পাশাপাশি আবুধাবি তুলনামূলক স্থিতিশীল জীবনযাপনের বিকল্প। শহরটিতে সাংস্কৃতিক আয়োজনও বাড়ছে।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবুধাবির সাদিয়াত দ্বীপে ২০২৫ সালে চালু হয়েছে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আবুধাবি ও জায়েদ ন্যাশনাল মিউজিয়াম। স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক গেরির নকশায় নির্মিত গুগেনহাইম আবুধাবি ২০২৬ সালের ১১ ডিসেম্বর উদ্বোধনের কথা রয়েছে।

শহরটিকে বুঝতে পর্যটকদের অন্তত এক দিন ধীরেসুস্থে কাটানোর পরামর্শ দিয়েছেন আবু-হিজলেহ। স্থানীয় ক্যাফেতে নাশতা করা কিংবা শপিং মলে ঘোরার মধ্য দিয়েও এখানকার জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়া সম্ভব।

বাইরে থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে অত্যাধুনিক মনে হলেও আকাশচুম্বী ভবন ও বিলাসবহুল হোটেলের আড়ালে মানুষের দৈনন্দিন জীবন অনেকটাই সাধারণ আবুধাবির এই বৈচিত্র্যও পর্যটকদের জন্য আলাদা অভিজ্ঞতা হতে পারে।

নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে : আধুনিক অবকাঠামো, ঐতিহাসিক স্থাপনা, স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য সব মিলিয়ে এই পাঁচ শহর ভ্রমণপিপাসুদের সামনে খুলে দিচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। 

পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে গিয়ে স্থানীয় জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখতে চাইলে শহরগুলো হতে পারে ভ্রমণের তালিকায় রাখার মতো গন্তব্য।
 

 

আপন দেশ/এমটিআই

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়