ফাইল ছবি, আপন দেশ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। ফলে অনেকেই এলপিজি সিলিন্ডার ও মাটির চুলা ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন। ঢাকার পূর্ব রামপুরার বাসিন্দা হাজেরা খাতুন জানান, অতীতেও গ্যাস সংকট দেখা দিতো তবে প্রতিবারের তুলনায় এবার একটু বেশি।
এ সংকট শুধু বাসাবাড়ি নয়, সংকট তৈরি হয়েছে গ্যাসনির্ভর প্রায় সব খাতেই। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়ে বেড়েছে লোডশেডিং, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, শিল্প কারখানায়ও উৎপাদনেও ব্যহত হচ্ছে।
গ্যাস সংকটি নিয়ে শিল্প মালিকরা জনান, গ্যাস সংকটের কারনে উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে। এছাড়া নতুন শিল্প কারখানায় গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) জ্বালানি বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান রাজীব হায়দার বলেন, বাংলাদেশে বিটিএমএর সদস্যভুক্ত শিল্পে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। রফতানিমুখী পোশাক কারখানার জন্য সুতা, কাপড় ও ডেনিম ফেব্রিক সরবরাহে এসব কারখানা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিগুলো ২৪ ঘণ্টা অপারেশনে থাকে। জ্বালানি যদি ঠিক না থাকে তাবে প্রোডাকশন হবে না। যদি প্রোডাকশন করতে না পারি তাবে ব্যাংকের দায়দেনা বা পণ্যের কাঁচামালের খরচ কীভাবে দেব? বর্তমানে এটা আমাদের মাথাব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ।
এত গ্যাস সংকট কেন
বাংলাদেশে গ্যাস সংকটের প্রধান কারণ দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানির সীমাবদ্ধতা। এর সঙ্গে চলমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনা।
পেট্রোবাংলার ১১ ও ১২ অগাস্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো মিলে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক এক হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি গ্যাস উৎপাদন করেছে। আমদানি হয়েছে ৪৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট। একটি এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ায় আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে দৈনিক প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিংও বেড়েছে। সম্প্রতি এক দিনে লোডশেডিং তিন হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।
দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। সাগরে বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপন করা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউর মাধ্যমে গ্যাস আমদানি করা হয়, যেগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা দৈনিক প্রায় এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে দুটি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করলেও দেশের চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না।
আরও পড়ুন<<>>নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তায় রাজধানী, সতর্ক সববাহিনী
এ বিষয়ে অধ্যাপক এম তামিম বলেন, দেশে গ্যাসের উৎপাদন প্রায় ১৫শ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে, যেটা ২০১৬-১৭ সালে ১৯শ মিলিয়নের মতো ছিল। এটা দিনে দিনে কমে আসছে। গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স গত ৫, ৭ বা ১০ বছরে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যতগুলো উদ্যোগ নিয়েছে তাতে উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে দেখা গেছে যে নীট উৎপাদন কমে যাচ্ছে। প্রতি বছর ১০০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
অতীতে জ্বালানি সংকটকে জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে দেখিয়ে বিশেষ বিধানের আওতায় আমদানিনির্ভর প্রকল্প হাতে নিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। সাগর ও স্থলভাগে ব্যাপক গ্যাস অনুসন্ধান হয়নি। ফলে আমদানিনির্ভরতা বেড়ে যায়।
নতুন সরকার সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহবান করেছে। তবে নতুন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে অনুসন্ধানের পর গ্যাস আবিষ্কার হলেও তা উৎপাদনে আসতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
একসময় বাংলাদেশ ‘গ্যাসের ওপর ভাসছে’ এমন কথাও প্রচলিত ছিল। গ্যাস রফতানি নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন ও মজুত কমতে থাকায় ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আকারে গ্যাস আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত গ্যাস সংকটের সমাধান হবে এমন সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।
এম তামিমের পরামর্শ, স্বল্প মেয়াদে গ্যাসক্ষেত্রের ওপরের স্তরে অনুসন্ধান করে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। ভোলার গ্যাস কীভাবে জাতীয় গ্রিডে আনা যায়, সেদিকেও নজর দেয়া দরকার। জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি উন্নত করতে প্রয়োজনে স্থলভাগেও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করে গ্যাস অনুসন্ধান করা যেতে পারে বলে মনে করেন এম তামিম। তার ভাষ্য, ১৯৯৭ সালের পর এ ধরনের উদ্যোগ আর নেয়া হয়নি।
সরকারের জ্বালানি বিভাগ বলছে, সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোসহ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বর্তমান সংকট সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহবান করা হয়েছে। নতুন করে ১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়ার কথাও জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি বলেছেন, চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের জন্য বর্তমান সরকারকে দায়ী করা যাবে না। আমাদের সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস এবং আমাদেরকে এসব জিনিস ইনহেরিট করতে হয়েছে। এখন যেটা আছে এটাও আমরা আশা করি সাকসেসফুলি ওভারকাম করতে পারব।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশীয় উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় গ্যাস আমদানি করতে হবে। আমদানি বাড়াতে স্থলভাগে ও সাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানি দুটি মিলেও গ্যাসের যে চাহিদা আছে, প্রায় ১২শ এমএমসিএফ পার ডে, আমাদের গ্যাপ রয়ে গেছে। যদি টাকাও থাকে, তাও রাতারাতি এলএনজি ইমপোর্ট বাড়ানো যাবে না। কারণ আমাদের সে অবকাঠামো নেই।
বাংলাদেশে স্থলভাগে কোনো এলএনজি টার্মিনাল নেই। সাগরে রয়েছে দুটি ভাসমান টার্মিনাল। সরকার এরই মধ্যে চীনের একটি কোম্পানিকে দিয়ে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সেটি বাস্তবায়নেও সময় লাগবে।
বাংলাদেশে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করেছিল বিগত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকার। এর জন্য সাগরে দুটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। এর একটি সামিটের, অন্যটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির। গ্যাস আমদানি বাড়াতে ২০২৪ সালে তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপনে সামিট গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। ২০২৭ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্যে করা ওই এফএসআরইউ স্থাপনের চুক্তি জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করে।
তৃতীয় এফএসআরইউ বাতিলের ফলে বাংলাদেশ অবকাঠামোগত প্রস্তুতির দিক থেকে দুই থেকে তিন বছর পিছিয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অধ্যাপক এম তামিম বলেন, আমি মনে করি ঢালাওভাবে বাতিল করা ঠিক হয়নি। স্পেশালি এফএসআরইউ। বাতিল করার আগে আমাকে চিন্তা করতে হবে যে বিকল্প ব্যবস্থা আমি কত দ্রুত আনতে পারব। এফএসআরইউ মার্কেট ভেরি টাইট মার্কেট।
চীনের সঙ্গে জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে দুই বছরের মধ্যে নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের কথা বলছে জ্বালানি বিভাগ। এ বিষয়ে এম তামিম বলেন, চীনের কোম্পানিগুলো এফএসআরইউ ব্যবসায় নতুন। যদি তাদের হাতে জাহাজ থেকে থাকে, কোনো ক্যারিয়ার থেকে থাকে যেটা কনভার্সন করবে। তাহলে হয়তো আঠারো মাসে তারা যেটা বলেছে দিতে পারবে।
মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে ল্যান্ডবেইজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজও শুরু করেছে জ্বালানি বিভাগ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটিও চালু হতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
অধ্যাপক তামিম বলেন, এ প্রকল্পের পরিকল্পনা অনেক আগে করা হয়েছিল। কাজগুলো আগে হাতে নেয়া হলে এতদিনে হয়তো তা বাস্তবায়িত হয়ে যেত। সব মিলিয়ে জ্বালানি বিভাগের পরিকল্পনা ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে স্পষ্ট, দুর্ঘটনাকবলিত এলএনজি টার্মিনালের মেরামত শেষ হলে চলমান তীব্র সংকট কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করছে সরকার। সরকারও বিভিন্ন সময়ে সে আশ্বাস দিয়ে আসছে।-বিবিসি
আপনদেশ/মিম/এসআর
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































