ছবি: আপন দেশ
অনলাইন বেটিং ও জুয়া পরিচালনাকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
এসময় তাদের কাছ থেকে অপরাধকর্মে ব্যবহৃত নয়টি মোবাইল ফোন, ২০টি সিম কার্ড এবং বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবইসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করা হয়েছে।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস ইউনিটের একটি বিশেষ দল গত ১১ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন—রায়পুরা পৌরসভার শ্রীরামপুর এলাকার রফিকুল ইসলাম (৪৬), মনোহরদীর নোয়াদীয়া গ্রামের মো. সোহেল (৩৭), একই উপজেলার হাতিরদীয়া এলাকার মো. শফিকুল ইসলাম (২৭), উত্তর নোয়াদীয়া এলাকার মো. রুবেল মোল্ল্যা (৩৩) এবং নরসিংদী সদরের নয়াদরাকান্দিয়া এলাকার আইয়ুব হোসেন রিপন (৪৮)।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় সিআইডি সাংবাদিকদের জানিয়েছে, রায়পুরা থানার রেলগেট কলেজ মার্কেট এলাকা থেকে রফিকুল ইসলামকে, মনোহরদী থানার নোয়াদীয়া গ্রামের মৌলভী বাড়ি এলাকা থেকে সোহেলকে, মনোহরদী থানার সামনে রাজু টাওয়ার এলাকা থেকে শফিকুল ইসলাম ও রুবেল মোল্ল্যাকে এবং নয়াদরাকান্দিয়া এলাকা থেকে আইয়ুব হোসেন রিপনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দেশ-বিদেশে বসে বেটিং সাইট পরিচালনা
সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধান ও সাইবার মনিটরিংয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভেতরে ও দেশের বাইরে অবস্থানকারী সদস্যদের মাধ্যমে বিভিন্ন নামে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনা করে আসছিল বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এসব ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার আয়োজন করা হতো। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব জুয়ার প্রচারণা ও বিজ্ঞাপন চালানো হতো।
সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, বেটিং সাইটগুলোতে অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে ‘টপ-আপ’ বা ‘ডিপোজিট’ করতে হয়। এ জন্য বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়সহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ব্যাংক হিসাব এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়।
টাকা জমা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেটিং অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ ই-মানি বা ‘বট মানি’ যোগ করা হয়। পরে সে অর্থ অনলাইন বেটিং বা জুয়ায় ব্যবহার করা হয়।
এজেন্টের মাধ্যমে সংগ্রহ হিসাব-নম্বর
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, অনলাইন জুয়ার অর্থ জমা ও উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন এমএফএস এজেন্ট নম্বর এবং ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হয়। সময়ের সঙ্গে এসব নম্বর ও হিসাব পরিবর্তন করে চক্রটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়ানোর চেষ্টা করে।
সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করে এমএফএস নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করত। পরে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এসব নম্বর ও হিসাবের তথ্য বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে পাঠানো হতো। এসব হিসাব ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জুয়ার অর্থ লেনদেন করা হতো।
আরও পড়ুন <<>> উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণে নাজমুলের পাশে প্রধানমন্ত্রী
সিআইডির দাবি, বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ এজেন্টরা একত্রিত করে কমিশন রেখে অবশিষ্ট অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর করত। পরে অর্থের একটি অংশ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে দেশের বাইরে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে বলেও প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা:
এ ঘটনায় সিআইডি বাদী হয়ে পল্টন মডেল থানায় মামলা করেছে। মামলাটি ১৯ মে ২০২৬ তারিখে মামলা নম্বর ২৪ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। এতে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
সিআইডি জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে অনলাইন বেটিং চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট এবং এমএফএস ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও চক্রটির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।
খোঁজ চলছে দেশি-বিদেশি সহযোগীদের
গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইল ফোন, সিম কার্ড, ব্যাংক হিসাব ও চেকবইসহ অন্যান্য আলামত ফরেনসিক ও কারিগরি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এসব বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনলাইন বেটিং কার্যক্রমে তাদের ভূমিকা, আর্থিক লেনদেনের ধরন, চক্রের অন্য সদস্য এবং অর্থের সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডির সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস ইউনিট। চক্রটির সঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং অবৈধভাবে লেনদেন করা অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া অনলাইন বেটিং সাইটের পরিচালনাকারী, স্থানীয় এজেন্ট, অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত এমএফএস ও ব্যাংক হিসাবের মালিক এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
নিষেধাজ্ঞার পরও কৌশলে চলছে জুয়া
সিআইডির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের PSD Circular No-07, ২৮ মে ২০২৫ অনুযায়ী অনলাইন জুয়া কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। এরপরও সংশ্লিষ্ট চক্র বিভিন্ন কৌশলে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।
সিআইডি জনগণকে অনলাইন জুয়া ও বেটিং থেকে বিরত থাকার আহবান জানিয়েছে। একই সঙ্গে অনলাইন বেটিং বা জুয়ার নামে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের কাছে অর্থ লেনদেন না করার এবং এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করেছে।
আপনদেশ/মিম/এসএস
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































