Apan Desh | আপন দেশ

হেলাল হাফিজ: প্রেম-দ্রোহের কবি জন্মদিন আজ

শরিফুল সোহান

প্রকাশিত: ১৮:৩৩, ৭ অক্টোবর ২০২৬

হেলাল হাফিজ: প্রেম-দ্রোহের কবি জন্মদিন আজ

ফাইল ছবি

কবি হেলাল হাফিজ। যিনি কবিতার মধ্য দিয়ে প্রেম ও দ্রোহকে প্রকাশ করতেন। যার কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একপাশে মিছিলের উত্তাল রাজপথ। আর অন্য পাশে গভীর প্রেমের আখ্যান।

তার কবিতায় যেমন আছে তারুণ্যের দুর্বার আহবান, তেমনি আছে না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। আছে স্বাধীনতার স্বপ্ন, মানুষের কষ্ট, শিকড়ের টান, আবার আছে একান্ত ব্যক্তিগত অভিমান ও ভালোবাসার আকুতি।

বুধবার (০৭ অক্টোবর) এ প্রেম ও দ্রোহের কবির জন্মদিন।

১৯৪৮ সালের এদিনে নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বড়তলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হেলাল হাফিজ। তার পিতা খোরশেদ আলী তালুকদার এবং মাতা কোকিলা বেগম। কবির বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখন তার মা মারা যান। শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে নেত্রকোনায়। সে শহর পরবর্তী সময়ে তার কবিতারও এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।

১৯৬৫ সালে এসএসসি এবং ১৯৬৭ সালে এইচসি পাস করেন হেলাল হাফিজ। ১৯৬৭ সালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন তিনি।

ষাটের দশকের উত্তাল সময়েই তার লেখালেখির সূচনা। সে সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানুষের অধিকারবোধ এবং তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষা তার কবিতায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় লেখা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। কবিতার দুটি পঙ্ক্তি-

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’

এ পঙ্ক্তি শুধু কবিতার পঙ্‌ক্তি হয়ে থাকেনি, একসময় তা পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক স্লোগানে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে যায় এ দু’লাইন।

কবিতাটি প্রকাশের ক্ষেত্রেও ছিল ভিন্ন এক ইতিহাস। হেলাল হাফিজ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কোনো পত্রিকা কবিতাটি প্রকাশ করার সাহস পায়নি। অথচ প্রকাশিত না হয়েও ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ তখন ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

কারও কাছে মিছিল সংসারের দাবি, কারও কাছে দ্রোহের পথ, আবার কারও কাছে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। প্রেমও তার কবিতায় নিছক কোমল অনুভূতি নয়; কখনো কখনো প্রেম সেখানে মানুষকে বিদ্রোহী করে তোলে।

‘কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনী হতে হয়।
যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান
তাই হয়ে যান
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।’

হেলাল হাফিজের কবিতার এ দ্রোহ একসময় গিয়ে মিশেছে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায়। ‘একটি পতাকা পেলে’ কবিতায় একটি পতাকার স্বপ্ন কেবল রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠেনি, বরং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের অবসানের প্রত্যাশার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। তিনি লিখেছেন-

‘কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে
আমি আর লিখবো না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা।’

এ ‘পতাকা’র স্বপ্নে আছে শীতের সকালে পাতা কুড়ানো মেয়ের উষ্ণতা, ভূমিহীন মানুষের তৃপ্তি, যুদ্ধের শিশুর নিরাপদ জীবন। আছে এমন একটি সমাজের প্রত্যাশা, যেখানে মানুষের দুঃখেরও ভাগ থাকবে সবার মধ্যে।

হেলাল হাফিজের কবিতায় তাই রাজনীতি ও মানুষ আলাদা হয়ে থাকে না। মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা যেমন তার কবিতায় জায়গা পেয়েছে, তেমনি বৃহত্তর সমাজের ক্ষতও হয়েছে তার কবিতার বিষয়। ‘ফেরীঅলা’ কবিতায় তিনি যেন মানুষের অসংখ্য অদৃশ্য কষ্টকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন-

‘কষ্ট নেবে কষ্ট
হরেক রকম কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট!’

প্রেমের কষ্ট, ঘৃণার কষ্ট, অনাদর-অবহেলার কষ্ট, একটি মানুষের নীরবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কষ্ট- সবকিছুকেই তিনি কবিতার উপাদান করেছেন। তার কবিতায় কষ্ট যেন কোনো বিমূর্ত অনুভূতি নয়, বরং মানুষের জীবন থেকে উঠে আসা স্পর্শযোগ্য বাস্তবতা।

আর সে কষ্টের পাশাপাশি ছিল গভীর প্রেম। হেলাল হাফিজের প্রেমের কবিতা কখনো আকাঙ্ক্ষায় উজ্জ্বল, কখনো বিচ্ছেদে বিষণ্ন। ‘ইচ্ছে ছিলো’ কবিতায় প্রেমিকের স্বপ্ন একসময় এসে দাঁড়ায় নির্মম বাস্তবতার সামনে-

‘ইচ্ছে ছিল রাজা হবো
তোমাকে সাম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো,
আজ দেখি রাজ্য আছে
রাজা আছে
ইচ্ছে আছে,
শুধু তুমি অন্য ঘরে।’

এ কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতেই যেন প্রেমের অপূর্ণতার এক দীর্ঘ ইতিহাস ধরা পড়ে। ভালোবাসার মানুষটি নেই, অথচ ইচ্ছেটি রয়ে গেছে। আছে রাজা, আছে রাজ্য, আছে স্বপ্ন- শুধু নেই সে কাঙ্ক্ষিত মানুষটি।

নিজের শহর নেত্রকোনার প্রতিও হেলাল হাফিজের ছিল গভীর টান। ‘নেত্রকোনা’ কবিতায় শহরটি তার কাছে শুধু জন্মস্থান নয়, এক প্রিয় মানুষের মতো। তিনি লিখেছেন-

‘কতো দিন তোমাকে দেখি না
তুমি ভালো আছো? সুখে আছো? বোন নেত্রকোনা।’

শহর থেকে দূরে থেকেও নেত্রকোনা তার স্মৃতি ও অস্তিত্বের অংশ হয়ে ছিল। তাই কবিতার শেষে এসে তিনি বলেন-

‘তুমি আছো আমার মজ্জায় আর মগজের কোষে অনুক্ষণ।’

হেলাল হাফিজের কবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, ব্যক্তিগত অনুভূতিকে তিনি এমনভাবে প্রকাশ করেছেন, যা পাঠকের নিজস্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে যায়। ‘পরানের পাখি’ কবিতায় আকাঙ্ক্ষা, ক্ষয়, বিষাদ ও আশার এক অদ্ভুত মিশেল দেখা যায়। কবির আহবান-

‘পরানের পাখি তুমি একবার সেই কথা কও,
আমার সূর্যের কথা, কাঙ্খিত দিনের কথা,
সুশোভন স্বপ্নের কথাটা বলো,–শুনুক মানুষ।’

এ যেন শুধু একজনের কাছে আরেকজনের কথা শোনার আকুতি নয়; বরং অন্ধকারের মধ্যে আলো ও স্বপ্নের সন্ধান।

‘তুমি ডাক দিলে’ কবিতায় আবার প্রেম হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। একটি ডাকের অপেক্ষায় থাকা প্রেমিকের কণ্ঠে শোনা যায়-

‘একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতোটা কাঙাল,
কতো হুলুস্থূল অনটন আজম্ন ভেতরে আমার।’

প্রেমের কাছে তার এ আকুলতা শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে যায় নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দিকে। আর ‘প্রস্থান’ কবিতায় সে প্রেমই পরিণত হয় স্মৃতি, অপেক্ষা ও বিদায়ের বেদনায়। কবি লিখেছেন-

‘এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিয়ো।’

শেষ পর্যন্ত অবশ্য অপেক্ষারও একটি সীমা আছে-

‘আর না হলে যত্ন করে ভুলেই যেয়ো, আপত্তি নেই।’

এই দ্বৈততাই হেলাল হাফিজকে আলাদা করে চেনায়। তিনি একই সঙ্গে মিছিলের কবি, যুদ্ধের কবি, পতাকার কবি এবং প্রেম-বিরহের কবি। তার কবিতায় যে তরুণ মিছিলের দিকে এগিয়ে যায়, সে তরুণই আবার কোনো এক নির্জন রাতে প্রিয় মানুষের কাছে একটি চিঠির অপেক্ষায় থাকে।

কবিতার পাশাপাশি সাংবাদিকতাও ছিল তার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৭২ সালে তিনি দৈনিক পূর্বদেশে যোগ দেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি পত্রিকাটির সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। পূর্বদেশ বন্ধ হয়ে গেলে ১৯৭৬ সালের শেষদিকে দৈনিক দেশ পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি দীর্ঘদিন দৈনিক যুগান্তরে কর্মরত ছিলেন। সেখানে ফিচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় হেলাল হাফিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। বইটি প্রকাশের পর ব্যাপক আলোচিত হয়। এর ৩৩টিরও বেশি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা একাত্তর’।

২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় তার তৃতীয় ও সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’।

কবিতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে তিনি বাংলা অ্যাকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি যশোর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, আবুল মনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার এবং নেত্রকোনা সাহিত্য পরিষদের কবি খালেকদাদ চৌধুরী পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। ২০২৫ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

হেলাল হাফিজ ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন।

আপন দেশ/এসএস

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়