আমার বাবা। কবি আবিদ আজাদ। ডাকনাম ছিল রেণু। মা-বাবার দেয়া নাম হাবিবুর রহমান। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বাবার লেখালেখি শুরু। কিশোরগঞ্জের স্থানীয় বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় লেখা ছাপা হতো নিয়মিত। রেণু নামেই লিখতেন স্থানীয় পত্রপত্রিকায়। জাতীয় পত্রপত্রিকায় লিখতেন সুমন আল ইউসুফ নামে। পরে নাম পরিবর্তন করে হন আবিদ আজাদ। ১৯৭৬ সালে প্রকাশ পায় বাবার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঘাসের ঘটনা’।
আমার বাবার মুখে তার ছোটবেলার গল্প খুব একটা শুনিনি। যদিও তার আত্মজৈবনিক ‘কবিতার স্বপ্ন’ বইতে অনেকটাই কিশোরবেলার গল্পগুলো উঠে এসেছে। তবে আমার দাদি সব সময়ই তার এ বড় ছেলেকে নিয়ে খুব গল্প করতেন, গর্ব করতেন। আমার বাবারা ১১ ভাইবোন। তাদের মধ্যে বাবা দ্বিতীয়। তার বড় এক বোন। তাই দাদা-দাদি দুজনেরই খুব আদরের সন্তান ছিলেন আমার বাবা। দাদি তো সব সময় বলতেন, তার বড় ছেলের মাটির মতো মন। দাদি বলতেন, ছোটবেলায় তিনি যখন বাবাকে গোসল করিয়ে আনতেন, যতক্ষণ যেভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে বলতেন, ঠিক ততক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতেন। একেবারে মা-ভক্ত, মা-পাগল ছিলেন বাবা। দাদাকে তিনি খুব ভয় পেতেন। কিন্তু মায়ের প্রতি ছিলেন ভয়াবহ রকম দুর্বল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাবাকে দেখেছি মা-পাগল কাকে বলে। শেষ দুই-আড়াই বছর তো যখন বাবা খুব অসুস্থ, নিয়মিত হাসপাতালে যাওয়া-আসার মধ্যে থেকেছেন, তখন মায়ের সান্নিধ্য পেলেই দেখতাম, তিনি সবচেয়ে বেশি আরাম ও স্বস্তি বোধ করছেন। আমার দাদি মারা যান বাবা মারা যাওয়ার ১২ বছর পর। আমার বাবা মানে তার বড় ছেলের মারা যাওয়ার বেদনা দাদিকে ভয়াবহ রকম স্তব্ধ করে দিয়েছিল। বাবার নাম শুনলেই তিনি শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। শেষ দিন পর্যন্ত দাদিকে তার বড় ছেলের জন্য অদ্ভুত এক মায়া, অদ্ভুত এক শূন্যতা অনুভব করতে দেখেছি।
বাবার ছোটবেলার গল্প শুনেছি তার বাল্যবন্ধু আশুতোষ ভৌমিক কাকার কাছেও। আজিমউদ্দিন স্কুলে এক ক্লাসেই তারা পড়তেন। বাবার আত্মস্মৃতি ‘কবিতার স্বপ্ন’–এর শুরুটাই তার এ বন্ধুকে নিয়ে। বাবা সেই বইতে লিখেছেন, ‘লিখত আশু, আশুতোষ ভৌমিক, আমার বাল্যবন্ধু। আর আমি পড়েছিলাম স্বপ্নে, কবিতার লাল চুলের কাঁচা স্বপ্নে। লিখত আশু, পড়তাম আমি। আশু কবি, আমি পাঠক। দুহাতে কবিতা লিখে ক্লাশের খাতা ভরে ফেলত এক কিশোর আর সেই আবলতাবল কবিতার আগ্রহী পাঠক হয়ে আরও বেশি এলেবেলে ঘুরে বেড়াত সমবয়সী আরেক কিশোর। বলা চলে, প্রচণ্ড রহস্যকাতর অল্প বয়সের এক প্রচণ্ডতর কবিতাপ্রেম আরেক অল্পবয়স্ক কবিকে আমার প্রতি ভীষণ বন্ধুবৎসল করে তুলেছিল। অন্যভাবে বললে বলা যায়, কবিতা তার অসম্ভব সুন্দর ও চালাক আঙুলের ইশারায় একবয়সী অনেক বালকের মধ্য থেকে নিষ্ঠুর কায়দায় আলাদা পথে ডেকে নিয়ে যাচ্ছিল দুটি বালককে।’
আশু কাকার কাছে শুনেছি বাবার শৈশব-কৈশোরের সব পাগলামি, সব ছেলেমানুষির কথা। কিশোরগঞ্জের নিউটাউনে তাদের বেড়ে ওঠার গল্প। বাবার মৃত্যুর আগপর্যন্ত আশু কাকা বাবার সঙ্গে ঢাকায়ই ছিলেন। বাবা মারা যাওয়ার পর আশু কাকা কিশোরগঞ্জে চলে যান। আশু কাকা মারা যান ২০২১ সালে। বাবার মারা যাওয়ার ১৬ বছর পর। আশু কাকার চোখে-মুখে সব সময় তার এই বাল্যবন্ধুর জন্য প্রাণভরা আবেগ অনুভব করেছি।
দাদির মুখেই শুনেছি, বাবা ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতপ্রেমী ছিলেন। গাছপালা, সবুজ ধানখেত, নদী, বৃষ্টি—এসবই তার ভালো লাগার বিষয় ছিল। বাবা নাকি খুব সুন্দর বাঁশি বাজাতেন। দাদি বলতেন, রেণুর বাঁশির আওয়াজ শুনলে মনটাই ভরে যেত। আজিমউদ্দিন স্কুল ও গুরুদয়াল কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হন ৭০-৭১ সালে। সেই নাকি আমার দাদির রেণুকে ছাড়া থাকা শুরু। যদিও মাঝে মাঝেই একটি বিষয়ে খুব রাগ করতেন। দাদা-দাদি বাবাকে শহরে পাঠিয়েছিলেন ডাক্তার হতে, কিন্তু আমার বাবা এসে হলেন কবি। শুরু করলেন লেখালেখি। এ নিয়ে নাকি আমার দাদা বেজায় রেগে ছিলেন। দীর্ঘদিন কথাও বলেননি ছেলের সঙ্গে। তবে আমার দাদি সব সময় তার বড় ছেলেকে নিয়ে খুব গর্ব করতেন। দাদি প্রায়ই এই গল্পটা খুব গর্ব নিয়ে বলতেন। বাবা তখন আজিমউদ্দিন স্কুলে পড়েন। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে কোনো এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এলেন পল্লিকবি জসিমউদ্দীন। বাবা ছোটবেলা থেকেই পল্লিকবির প্রতি অনুরক্ত। কিশোরগঞ্জ থেকে লেখালেখির কারণে পল্লিকবির সঙ্গে চিঠি মারফত যোগাযোগও আছে। সেই সূত্রেই পল্লিকবি জসীমউদ্দীন বাবাকে চিনতেন। সেবার বাবার আমন্ত্রণে পল্লিকবি জসীমউদ্দীন কিশোরগঞ্জের নিউটাউনের বাড়িতে গিয়েছিলেন। দাদা খাসি জবাই করে সবাইকে আপ্যায়ন করেছিলেন। পল্লিকবি জসীমউদ্দীন নাকি বাড়িতে বাবার সংগ্রহে তার সব কটা বই দেখে খুবই আপ্লুত হয়েছিলেন। দাদাকে নাকি বলেছিলেন, ‘আপনার ছেলে বড় হয়ে অনেক বড় কবি হবে।’
আরও পড়ুন <> নোবেলজয়ী এলিস মুনরো মারা গেছেন
ততদিনে আমার বড় ফুফু বিয়ে করে চলে এসেছেন ঢাকায়, থাকেন কমলাপুরে। বড় ফুফুর মুখে শুনেছি, একবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন বাবা নাকি খুব অসুস্থ হয়ে গেলেন। সপ্তাহে অন্তত একবার বাবা নাকি ফুফুর সঙ্গে দেখা করতে কমলাপুরে যেতেন। কিন্তু সেবার অনেক দিন হয়ে গেল; বাবা ফুফুর কাছে যান না। ফুফু ফুফাকে পাঠালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। সেখানে গিয়ে ফুফা জানতে পারেন যে বাবা জন্ডিসে আক্রান্ত। বাবার অবস্থা দেখে ফুফা বাবাকে নিয়ে এলেন কমলাপুরের বাসায়। সেখানে দীর্ঘদিন সেবা-সুশ্রূষার পর বাবা সুস্থ হলেন। তবে বাবার অ্যাজমার সমস্যাটা কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকেই। দাদি বলতেন, ছোট থাকতেই বাবা নিয়মিত শ্বাসকষ্টে ভুগতেন। কবিরাজ, লতাপাতা কোনো কিছুর পরই পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। কোনো সমাধান মেলেনি। কবিরাজ নাকি বলেছিলেন, যত বয়স বাড়বে, সেই সঙ্গে তার অ্যাজমার কষ্টটাও বাড়বে। সে কথা ঠিক হয়েছিল, আমিও আমার বাবাকে দীর্ঘদিন অ্যাজমায় ভুগতে দেখেছি। সে যে কী কষ্ট! শেষমেশ বাবার মৃত্যুও হয় অ্যাজমাতেই। বাবা পান খাওয়ার অভ্যাসটা ধরেন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়। বাবা নাকি বলতেন, পান না খেলে লেখা আসে না। দাদি বলতেন, অনেক শাসন করেও নাকি তাকে এই অভ্যাস থেকে ফেরানো যায়নি। পরে তো শেষ সময় দেখেছি, আমার বাবা আর আমার দাদি দুজন একসঙ্গেই পান খেতেন। দুজনেরই খুব পছন্দের বিষয় ছিল এটা। দাদির কাছে মা-বাবার বিয়ের গল্পও শুনেছি। খুব এক মজার গল্প। বাবা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করেছেন মাত্র। খুব উড়নচণ্ডী জীবনযাপন করছেন। দাদা তো খুব হতাশ, সেই সঙ্গে খুব রেগে আছেন। ছেলেকে কীভাবে ঘরবন্দী করা যায়, এ নিয়ে তার বিস্তর ভাবনা। ভাবলেন, বিয়ে করলে নাকি লাইনে আসবেন বাবা। তাই বিয়ে ঠিক করে বাবাকে খবর দিলেন যেন বাড়িতে আসেন অর্থাৎ নিউটাউনে যান। বাবা যথারীতি খবর পেয়ে বাড়িতে গিয়ে হাজির। তো বাবাকে দেখে আমার দাদা নাকি দাদিকে বলেছিলেন, ‘তোমার ছেলেকে বলো, কথার যেন হেরফের না হয়।’ দাদার হুমকিতে কাজ হলো। বাবা সোজা গিয়ে বসলেন বিয়ের পিঁড়িতে। আমার মাকে বিয়ে করে নিয়ে এলেন ঢাকায়। বাবা তখন থাকেন ঢাকার আজিমপুরে। সঙ্গে থাকেন আমার এক ফুফু। ফুফুর কাছে শুনেছি, বিয়ের পর নাকি বাবার খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। ওই লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ততা। তখন ছাপাখানার ব্যবসাটা দাঁড় করাতে বাবা দিনরাত শ্রম দিচ্ছেন। এসবের ভেতর মাকে নাকি খুব একটা সময় দিতেন না। মায়েরও নাকি এ নিয়ে এমন কোনো রাগ ছিল না। তিনিও বুঝে গিয়েছিলেন বাবাকে। তবে আমার এই বাবাই নাকি সম্পূর্ণ বদলে যান আমার জন্মের পর। আমার দাদি আর ফুফুদের কাছে শুনেছি, ১৯৮২ সালে যখন আমার জন্ম হলো, এরপর নাকি বাবা পুরোপুরি বদলে গেলেন। মনোযোগী হলেন সংসারে। আমার প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে হলেন পুরোদস্তুর সংসারী। তারপর একে একে যা যা করা দরকার, সবই করেছেন আমার জন্য। আমার দাদি বলতেন, আমি হয়েছি বলেই নাকি বাবার এতটা পরিবর্তন হয়েছিল।
মা-বাবাকে একসঙ্গে নিয়ে তেমন কোনো স্মৃতি আমার নেই। কারণ, আমার মা মারা যান, আমার যখন সাড়ে চার বছর বয়স, তখন। আমার মা যখন ময়মনসিংহ মেডিক্যালে মৃত্যুশয্যায়, তখন তাকে নিয়ে বাবার লেখা কবিতাগুলো পড়ে বুঝি আসলে দুজনের অনুভূতি, ভালোবাসা-ভালো লাগা কতটা গাঢ় ছিল।
ওই যে বলছিলাম, আমার জন্য বাবার পরিবর্তন হওয়া। এই আমার জন্য বাবার ভাবনাটাও কিন্তু আসলে অনেক গভীর ছিল। ৮৭ সালের অক্টোবরে মা মারা যাওয়ার পর আমি যত বড় হয়েছি, তত উপলব্ধি করেছি, আমার বাবার বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়স্থলটুকু শুধু আমি। কবিতার জগৎটার বাইরে শুধু আমাকে আঁকড়ে ধরেই তিনি বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। আমার জন্য তার ত্যাগেরও কোনো সীমা–পরিসীমা নেই। আমার মা মারা যাওয়ার খুব অল্প দিনের মধ্যেই তার বিয়ে করা উচিত ছিল। কিন্তু শুধু আমার কথা ভেবে, আমার চিন্তা করেই তিনি দীর্ঘদিন একা থেকেছেন। আমি বলব, জীবনে একটা কঠিন সময় তিনি একা পার করেছেন, শুধু আমার জন্য, আমার ভালোর জন্য, আমার সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য।
বাবা বেঁচে থাকলে এখন বয়স হতো ৭২ বছর। মাঝেমধ্যে ভাবার চেষ্টা করি, বাবা বেঁচে থাকলে কেমন হতো? কেমন করে কথা বলতেন? আমার বৃদ্ধ বাবাকে দেখতে কেমন লাগত? তার কি চলাফেরা করতে লাঠি লাগত? চশমার পাওয়ারটা কি আরও বাড়ত? পান খাওয়া কি ছাড়তে পারতেন? বাবাকে নিয়ে কেন জানি বেশিক্ষণ ভাবতে পারি না। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। আচ্ছা, বাবাদের কি মৃত্যু হয়? বাবারা কি কখনো দূরে চলে যান? বাবারা তো সব সময় ছায়া হয়েই থেকে যান। ভালো থাকো বাবা, আমার বাবা।
আপন দেশ/এমআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































