ছবি : সংগৃহীত
প্রায় ২১ ঘণ্টা সারাবিশ্বের নজর ছিল ইসলামাবাদের ওপর। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ম্যারাথন আলোচনা চলছিলো। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরানের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছাড়াই ভেস্তে গেছে। প্রায় একদিনব্যাপী ম্যারাথন বৈঠকের পরও দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি। এটি ছিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, এ ব্যর্থতা হঠাৎ করে নয় বরং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, কৌশলগত দ্বন্দ্ব এবং জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।
দীর্ঘ এ বৈঠকে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের পক্ষে ছিলেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
তবে রোববার সকালে আলোচনা শেষে কোনো সমঝোতা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেন ভ্যান্স। তিনি বলেন, আলোচনা অচল হয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য বেশি খারাপ খবর। তিনি বলেন, আমরা একটি খুবই সরল প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছি—এটাই আমাদের চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব। এখন দেখা যাক, ইরান তা গ্রহণ করে কি না।
আরও পড়ুন<<>>হরমুজ দিয়ে চললে অবশ্যই টোল দিতে হবে: ইরান
তিনি জানান, ২০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা আলোচনার পুরো সময়জুড়ে তাদের প্রতিনিধিদল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগে ছিল।
এর আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি হোক বা না হোক, এতে তার কিছু যায় আসে না। তিনি তখন মায়ামিতে একটি আল্টিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ ইভেন্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। খবর অনুযায়ী, ভ্যান্স যখন ইসলামাবাদে বক্তব্য দিচ্ছিলেন ট্রাম্প তখন সে ইভেন্টে ফাইটিং দেখছিলেন।
আলোচনায় মূল মতপার্থক্য ছিল হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দাবি এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগে অস্বীকৃতি নিয়ে। এ দুই বিষয়ই চুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান স্পষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দিক যে, তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বা দ্রুত তা তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করবে না, এটাই আলোচনার প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি যতটুকুই থাকুক আগের সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, ইরান দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে সত্যিকারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে কি না। আমরা এখনো তা দেখিনি, তবে আশা করছি দেখব।
অন্যদিকে ইরান মনে করছে এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার পালা যুক্তরাষ্ট্রের। বার্তা সংস্থা তাসনিম এক সূত্রের বরাতে জানায়, তেহরান আলোচনায় যৌক্তিক প্রস্তাব দিয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যৌক্তিক চুক্তিতে সম্মত না হলে হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্য এক্সে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফ বলেন, আমাদের সদিচ্ছা ও ইচ্ছা রয়েছে, কিন্তু পূর্বের দুই যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিপক্ষের ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই।
তিনি আরও বলেন, এ দফা আলোচনায় প্রতিপক্ষ শেষ পর্যন্ত ইরানি প্রতিনিধিদলের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই বলেন, মাত্র এক দফা আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার আশা করা অবাস্তব ছিল। দীর্ঘ সংঘাত ও গভীর অবিশ্বাসের মধ্যেই এ আলোচনা হয়েছে। কিছু বিষয়ে সমঝোতা হলেও দুই-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
বাগাই আরও বলেন, অগ্রগতি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছা এবং ইরানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ওপর। কূটনীতি কখনো শেষ হয় না এবং পাকিস্তানসহ বন্ধু ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান। এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে দুই পক্ষের কাজ করা জরুরি। পাকিস্তান সংলাপ সহজ করতে ভূমিকা চালিয়ে যাবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং দুই পক্ষকে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা ও আলোচনায় ফেরার আহবান জানিয়েছেন।
ব্রিটেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, এখনো কোনো অগ্রগতি বা টেকসই সমাধান না আসাটা অবশ্যই হতাশাজনক। কূটনীতিতে এমনই, সফল না হওয়া পর্যন্ত আপনি ব্যর্থ হচ্ছেন। তাই এ আলোচনা সফল না হলেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব কমে না।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































