ছবি: সংগৃহীত
হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করতে চীনের সহায়তা চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাণিজ্যবিরোধ মেটাতে চীনে তার পরিকল্পিত সফরের আগে এ দাবি তুলেছেন তিনি। এমনকি চীন সহযোগিতা না করলে সফর স্থগিত করার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। বেইজিং সফরের দুই সপ্তাহ আগে আলোচনায় নতুন এ শর্ত জুড়ে দেন ট্রাম্প। যদিও সফরের মূল উদ্দেশ্য চীন–মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ বিরোধগুলো মীমাংসা করা। তবে বর্তমানে হরমুজ প্রণালির বিষয়টি অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের পক্ষে ট্রাম্পের এ দাবিতে নতি স্বীকারের সম্ভাবনা খুবই কম।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ায় বিশ্বে তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এতে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে এবং বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা বিশ্ব অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশকে একযোগে কাজ করার আহবান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে চীনের ওপরও বাড়তি চাপ প্রয়োগ করছেন তিনি।
রোববার (১৫ মার্চ) ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, চলতি মাসের শেষে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পরিকল্পিত শীর্ষ বৈঠকের আগেই তিনি জানতে চান চীন এ বিষয়ে সহায়তা করবে কি না। কোনো উত্তর না পেলে সফর স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যারা এ প্রণালির সুবিধাভোগী, তাদেরই নিশ্চিত করা উচিত যেন সেখানে কোনো খারাপ ঘটনা না ঘটে। আমার মনে হয় চীনেরও সাহায্য করা উচিত।
তবে অনেকের মতে, এ অনুরোধটি নজিরবিহীন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বেইজিং-ঘনিষ্ঠ একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে, অথচ সে সংঘাতে সামরিক ঝুঁকি নিতে এখন চীনের সহযোগিতা চাইছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় চীন তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। গত কয়েক বছরে বেইজিং বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলের মজুদ গড়ে তুলেছে। পাশাপাশি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করেছে এবং বায়ু, সৌর ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের মতো পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
আরও পড়ুন <<>> যুদ্ধের ময়দানে ট্রাম্পকে একা ফেলে চলে গেল ন্যাটো
খবরে বলা হয়েছে, তেল যদি চীনা ইউয়ানে লেনদেন করা হয়, তবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইস্ট এশিয়ান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বার্ট হফম্যান বলেন, কৌশলগতভাবে নিরাপদ অবস্থানে থাকায় চীন চাইলে সময় নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের মতে, চলমান যুদ্ধ আরও কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দামও বাড়ছে, যার ফলে দেশে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প।
চীনের অভ্যন্তরে এ সংঘাতের খবর অনেকেই ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। বেইজিংভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর চীনা অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশন’-এর প্রেসিডেন্ট হেনরি হুইয়াও ওয়াং বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেকটা একঘরে হয়ে পড়েছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছে। রোববার প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে জাতীয়তাবাদী ট্যাবলয়েড ‘গ্লোবাল টাইমস’ হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ধারণার সমালোচনা করে। সেখানে প্রশ্ন তোলা হয়—এটি কি সত্যিই দায়িত্ব ভাগ করে নেয়ার আহবান, নাকি এমন একটি যুদ্ধের ঝুঁকি ভাগ করার চেষ্টা, যা ওয়াশিংটন শুরু করেছে কিন্তু শেষ করতে পারছে না।
সোমবার (১৬ মার্চ) চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান ট্রাম্পের আহবানে সরাসরি কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। তবে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের কূটনীতি চীন–মার্কিন সম্পর্কের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ট্রাম্পের সম্ভাব্য সফর নিয়ে দুই দেশ যোগাযোগ রাখছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এ সফর স্থগিতের ইঙ্গিত এমন সময়ে এসেছে যখন প্যারিসে মার্কিন ও চীনা অর্থনৈতিক কর্মকর্তারা কৃষিপণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ নিয়ে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
এদিকে চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের ওপর বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। আদালত রায় দেয়, তিনি একতরফাভাবে সব বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর শুল্ক আরোপ করে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এখন তার প্রশাসন একই ধরনের শুল্ক আরোপের নতুন পথ খুঁজছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের দরকষাকষির ক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে। হেনরি হুইয়াও ওয়াং বলেন, বাস্তবে চীনের যতটা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন, তার চেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রেরই চীনকে প্রয়োজন।
এদিকে ট্রাম্প ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, তারা যদি হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বানে সাড়া না দেয়, তবে তাদের ভবিষ্যৎ ভালো হবে না। তবে জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা এখন পর্যন্ত এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
অন্যদিকে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার ও তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হওয়ায় চীনের ট্রাম্পের পক্ষে অবস্থান নেয়ার সম্ভাবনা কম। চীন ইতোমধ্যে ইরানের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহবান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলারও সমালোচনা করেছে বেইজিং।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে সরাসরি পদক্ষেপ নেয়ার সম্ভাবনা কম হলেও মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চীনের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। তেল সংকট থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকলেও জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয় দেশটি।
সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক জা ইয়ান চং বলেন, চীন চায় তাদের অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে চলুক। তাই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক প্রভাব বাড়াতে গত কয়েক বছরে বেইজিং ব্যাপক রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৩ সালে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতাও করেছিল চীন। তবে বর্তমান সংঘাত সেই প্রচেষ্টার ওপর নতুন অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলছে।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































