Apan Desh | আপন দেশ

আন্তর্জাতিক শিক্ষা সুরক্ষা দিবস

আপন দেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:১৪, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক শিক্ষা সুরক্ষা দিবস

ছবি: আপন দেশ

আজ ০৯ সেপ্টেম্বর (বুধবার) আন্তর্জাতিক শিক্ষা সুরক্ষা দিবস। শিক্ষার অধিকার রক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ রাখার বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রতি বছর এ দিনে  আক্রমণ থেকে শিক্ষা সুরক্ষার জন্য দিবসটি পালন করা হয়।

শিক্ষা একটি মৌলিক মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান উপাদান। কিন্তু বিশ্বের বহু অঞ্চলে যুদ্ধ, সশস্ত্র সংঘাত, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মানবিক সংকটের কারণে শিক্ষা আজও মারাত্মক হুমকির মুখে। বিদ্যালয় ধ্বংস হচ্ছে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা হামলার শিকার হচ্ছে, আর লাখ লাখ শিশু তাদের শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এ বাস্তবতায় শিক্ষার অধিকার রক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ রাখার জন্য এ দিবস পালন করা হয়।

২০২০ সালের ২৮ মে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাব ৭৪/২৭৫-এর মাধ্যমে এ দিবসটি ঘোষণা করে। কাতার রাষ্ট্র প্রস্তাবটি উত্থাপন করে এবং বিশ্বের ৬২টি দেশ এতে সহ-পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। ইউনেস্কো ও ইউনিসেফ যৌথভাবে দিবসটির আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কার্যক্রম সমন্বয় করে আসছে। এর মূল লক্ষ্য হলো সংঘাত ও সংকটের মধ্যেও শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে হামলা ও সামরিক ব্যবহার থেকে সুরক্ষিত রাখা এবং শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

২০২৬ সালের দিবসটির বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য হলো- ‘আক্রমণের মধ্যেও কি শিক্ষা টিকে থাকতে পারে? মানবসমাজের স্থিতিস্থাপকতা ও অদম্য সক্ষমতা।’

এ প্রতিপাদ্য যুদ্ধ, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও সংকটের মধ্যেও শিক্ষা চালিয়ে নেয়ার জন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিবার ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের অসাধারণ দৃঢ়তা এবং পুনরুদ্ধার ক্ষমতাকে তুলে ধরে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়; এটি আশা, নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল ভিত্তি।

দিবসটি ঘোষণার ছয় বছরেরও বেশি সময় পরও বৈশ্বিক পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের বিষয়। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী স্কুলের ওপর ১৬৮০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত-বিশেষ করে ফিলিস্তিন, ইউক্রেন, সুদান, মিয়ানমার, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এবং আফগানিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বহু বিদ্যালয় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, অসংখ্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষক প্রাণ হারিয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং লক্ষ লক্ষ শিশু দীর্ঘকাল ধরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রয়েছে।

শিক্ষার ওপর আক্রমণ বলতে কেবল বিদ্যালয়ে বোমা হামলা বা গোলাবর্ষণকেই বোঝায় না; এর পরিধি বিস্তৃত। যেমন-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস বা দখল করা; বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়কে সামরিক ঘাঁটি বা ব্যারাকে রূপান্তর করা; শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর হামলা, অপহরণ বা ভয়ভীতি প্রদর্শন; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালানো; সংঘাতের জেরে শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। এসব আক্রমণ শুধু শিক্ষার মৌলিক অধিকারই কেড়ে নেয় না, বরং শিশুদের মানসিক বিকাশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও বিপন্ন করে তোলে।

আরও পড়ুন<<>>আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আজ

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসামরিক অবকাঠামো হিসেবে স্বীকৃত। জেনেভা কনভেনশনের আলোকে সংঘাতের সময় এগুলোর ওপর হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেউশন ২৬০১/২০২১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শিক্ষার অধিকার রক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেয়। পাশাপাশি ২০১৫ সালে গৃহীত ‘সেফ স্কুলস ডিক্লারেশন’ যুদ্ধকালীন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সামরিক ব্যবহার থেকে মুক্ত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

২০২৬ সালে ইউনেস্কো একটি ‘প্রিভেনটেটিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন’ অনুমোদন করেছে, যার উদ্দেশ্য হলো সংকট শুরুর আগে, চলাকালীন এবং পরবর্তীতে শিক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখতে রাষ্ট্রগুলোকে কার্যকর কৌশলগত সহায়তা প্রদান করা। জাতিসংঘের মহাসচিবও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, শিক্ষা শান্তি, উন্নয়ন ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম; তাই শিক্ষাকে কখনোই যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হতে দেয়া যায় না।

বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ যুদ্ধাবস্থা না থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে সবার জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার সাংবিধানিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক ‘সেফ স্কুলস ডিক্লারেশন’-এর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরাপদ রাখার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিশ্বের কিছু দেশ শিক্ষা সুরক্ষার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জাপান, ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। অন্যদিকে ফিলিস্তিন, ইউক্রেন ও সুদান বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও সংঘাত এসব দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে চরম অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে। একইভাবে মিয়ানমার, আফগানিস্তান এবং গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রেও শিক্ষার নিরাপত্তা একটি বড় বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়।

শিক্ষার সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থার একক দায়িত্ব নয়; এটি সমগ্র মানবসমাজের যৌথ অঙ্গীকার। এর জন্য জরুরি-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সকল প্রকার সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংঘাতমুক্ত রাখা; বিদ্যালয়কে সামরিক বা যেকোনো অশিক্ষাগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার বন্ধ করা; শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা; আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও ‘সেফ স্কুলস ডিক্লারেশন’ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা; শিক্ষার ওপর যেকোনো আক্রমণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

২০২০ সাল থেকে শুরু হওয়া এ বৈশ্বিক আহবানের সপ্তম বর্ষে এসে ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য আমাদের সে বার্তাই দেয়-মানবসমাজের অদম্য স্থিতিস্থাপকতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যেকোনো প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তাই বিশ্বব্যাপী সকল পক্ষের মূল দায়িত্ব হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং এমন একটি পৃথিবী গড়ে তোলা, যেখানে শিক্ষা কখনোই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হবে না।।

আপন দেশ/জেডআই

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়