ছবি: এআই জেনারেট
ঈদের দিন দুপুর গড়িয়ে প্রায় একটা। ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় তখন কোরবানি শেষ। কোথাও চলছে মাংস ভাগাভাগি, কোথাও রান্নার প্রস্তুতি। কিন্তু কচুক্ষেত পশুর হাটে তখনও বসে ছিলেন হাবিবুর রহমান। পাশে বাঁধা দুটি অবিক্রীত গরু। চোখেমুখে ক্লান্তি, কণ্ঠে হতাশা। লক্ষ্য একটাই-যেভাবেই হোক লোকসান কিছুটা কমানো।
দেড়টার দিকে একটি গরু অবশেষে বিক্রি হয় ৮০ হাজার টাকায়। অথচ মাত্র একদিন আগেও সেই গরুর দাম চাওয়া হয়েছিল এক লাখ টাকা। ক্রেতা মজিদুল ইসলাম আগের রাতে দরদাম করেও গরু কিনতে পারেননি। পরে পরিস্থিতি বদলে যায়। ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত কোনো ক্রেতা না পেয়ে উল্টো বিক্রেতাই ফোন করে অনুরোধ করেন গরুটি নিয়ে যেতে।
আব্দুর রহমান পেশায় ভাসমান ফল বিক্রেতা। কিশোরগঞ্জ থেকে ধারদেনা করে নয়টি গরু এনেছিলেন রাজধানীর হাটে। কিন্তু এবারের ঈদ তার জন্য আনন্দ নয়, হয়ে উঠেছে ঋণ আর লোকসানের হিসাব। যে গরুটি ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটির কেনা দামই ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা। পরিবহন, খাবার, শ্রমিক—সব মিলিয়ে আরও প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ। অর্থাৎ একটি গরুতেই তার ক্ষতি অর্ধলাখ টাকার বেশি।
শুধু আব্দুর রহমানই নন, একই গল্প ছিল রাজধানীর প্রায় সব পশুর হাটে। গাবতলী থেকে কচুক্ষেত- সব জায়গায় গরুর অতিরিক্ত সরবরাহে দাম ধসে পড়ে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে দর। যে গরুর দাম সন্ধ্যায় ৮০ হাজার বলা হয়েছে, গভীর রাতে সেটিই বিক্রি হয়েছে ৪০ বা ৫০ হাজার টাকায়।
আরও পড়ুন<<>> শেখ রেহানার আফজাল এখন শেখ রবির রেলের ডিজি
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য বলছে, দেশে এবার কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল প্রায় ১ কোটি ১ লাখ। কিন্তু প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখের বেশি পশু। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় বাজারে ছিল বিপুল অতিরিক্ত সরবরাহ। আর সেই চাপ গিয়ে পড়ে ছোট ও মাঝারি খামারি এবং মৌসুমি ব্যাপারীদের ওপর।
অনেক ব্যাপারী শেষ পর্যন্ত অবিক্রীত গরু ট্রাকে তুলে বাড়ি ফিরিয়েছেন। কেউ কেউ ভাড়ার টাকাও জোগাড় করতে পারেননি। হাটজুড়ে ছিল হতাশা আর কান্নার দৃশ্য। এক ব্যাপারীর ভাষায়, ‘সারা রাত মানুষ কেঁদেছে।’
এ ধসের বাজারে সুযোগ নিয়েছেন কসাই ও ছোট ব্যবসায়ীরা। কম দামে গরু কিনে তাৎক্ষণিক জবাই করে মাংস বিক্রি করেছেন তারা। কচুক্ষেত হাটের আশপাশেই ঈদের দিন প্রায় ৫০টি গরু এভাবে জবাই হয়েছে।
আনিসুল হক নামের এক ব্যবসায়ী নিজেও গরু বিক্রিতে বড় লোকসান গুনেছেন। পরে ভোরে আরও পাঁচটি বড় গরু কম দামে কিনে দুপুরের মধ্যে জবাই করে মাংস বিক্রি করেন। হিসাব কষে দেখেছেন, কেজিতে ১০০ টাকা লাভ করতে পারলেই আগের ক্ষতির কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।
আরও পড়ুন<<>> কমার্স ব্যাংকের ছায়া এমডি পুত্রবধূ, চেয়ারম্যান শ্বশুর
তবে এ ধসের বাজারে স্বস্তির মুখও দেখেছেন অনেকে। নিম্ন আয়ের বহু মানুষ এবার প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছেন কোরবানিতে। কচুক্ষেতে ৪৩ জন পিকআপচালক ও সহকারী মিলে দুটি গরু কিনেছেন। কসাই না পেয়ে নিজেরাই জবাই করে মাংস ভাগ করে নিয়েছেন।
তাদের একজন ইউসুফ আলী বলছিলেন, আমাদের একা কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য নেই। এবার গরুর দাম কমে যাওয়ায় সবাই মিলে অন্তত মাংস খেতে পেরেছি।
একদিকে খামারিদের কান্না, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের স্বস্তি- এবারের কোরবানির পশুর বাজার যেন একই সঙ্গে লোকসান ও প্রাপ্তির এক অদ্ভুত বাস্তবতার গল্প হয়ে রইল।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































