Apan Desh | আপন দেশ

দুবলার চরে শুঁটকি উৎসব

আল আমিন খান, বাগেরহাট প্রতিনিধি, আপন দেশ

প্রকাশিত: ২০:৫৯, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

দুবলার চরে শুঁটকি উৎসব

ছবি: আপন দেশ

সুন্দরবনের দুবলার চরে ৩০ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে পাঁচ মাসব্যাপী শুঁটকি মৌসুম। এ মৌসুমকে ঘিরে জীবিকার সন্ধানে মোংলার উপকূলীয় এলাকায় জড়ো হয়েছেন হাজারো জেলে ও ট্রলার।

বন বিভাগের পাস পারমিট নিয়ে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে সাগরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করবেন জেলেরা। কেউ কেউ রওনা হবেন শুক্রবার ভোরে। গত দুই তিন দিন ধরে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা জেলেরা মোংলায় অবস্থান করছেন। ট্রলারে তোলা হচ্ছে মাছ ধরার জাল, বাঁশ, বেড়া চাটকি, ঘর ও চাতাল নির্মাণের সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় মালামাল।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ৩০ অক্টোবর শুরু হয়ে আগামী বছরের মার্চের শেষ পর্যন্ত চলবে শুঁটকি মৌসুম। এ সময় জেলেরা সুন্দরবনের দুবলার চরের আলোরকোল, অফিসকেল্লা, নারকেলবাড়িয়া ও শেলার চরে অবস্থান করবেন। এসব চরে জেলেদের থাকার জন্য ৯০০টি ঘর, মাছ বেচাকেনার জন্য ১০০টি ডিপো এবং মুদি, তেল, ওষুধ, সেলুন ও হোটেলসহ বিভিন্ন ধরনের ১০০টি দোকান স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। মৌসুমজুড়ে এসব চরে প্রায় ১০ হাজার জেলে ও মহাজনের সমাগম ঘটবে বলে আশা করছে বন বিভাগ।

মৌসুমকে কেন্দ্র করে জেলেরা চরে অস্থায়ী ঘর, মাছ শুকানোর চাতাল, মাছ ওঠানো নামানোর জেটি ও ঘাট নির্মাণ করবেন। তবে এসব স্থাপনা নির্মাণে সুন্দরবনের কোনো প্রজাতির গাছপালা কাটা বা ব্যবহার করা যাবে না। বন বিভাগের এ নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কেউ বনের ক্ষতিসাধন করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ কারণে প্রয়োজনীয় বাঁশ, কাঠ ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী সঙ্গে নিয়েই দুবলার চরে যাচ্ছেন জেলেরা।

শুঁটকি মৌসুমে জীবিকার সন্ধানে সাগরে পাড়ি জমালেও ঝড় জলোচ্ছ্বাস ও দস্যুদের আতঙ্ক তাড়া করে বেড়ায় জেলেদের। দুবলার চরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়া কয়েকজন জেলে বলেন, পাঁচ মাসের এ মৌসুমে ঝড় জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থাকে সবচেয়ে বেশি। বৈরী আবহাওয়ায় মাছ ধরা ও শুকানোর কাজে ব্যাঘাত ঘটে। কখনো ঝড়ে ট্রলার ডুবে যায়, আবার বৃষ্টিতে শুকানোর জন্য রাখা মাছ পচে নষ্ট হয়। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় তাদের। 

আরও পড়ুন<<>>রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন শুরুর অনুমোদন

জেলেরা আরও বলেন, সুন্দরবনের গাছপালা কাটা ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। তাই জাল ধরার কাজে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ঘর ও মাছ শুকানোর চাতাল নির্মাণের বাঁশ, বেড়া চাটকিসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন তারা। বনের কোনো ক্ষতি না করেই মৌসুমের কাজ শেষ করতে চান।
তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি তাদের বড় দুশ্চিন্তা দস্যুদের উৎপাত।

জেলেদের ভাষ্য, গত শুঁটকি মৌসুমে সাগর ও চরে দস্যুদের তৎপরতা ছিল। অনেক জেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা হয়েছে। এবারও দস্যুদের নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই সাগরে যেতে হচ্ছে তাদের। এ অবস্থায় নিরাপদে মাছ ধরা ও চরে অবস্থানের জন্য প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা জোরদার এবং দস্যুদের নির্মূলের দাবি জানিয়েছেন জেলেরা। এবার শুঁটকি মৌসুমে দুবলার চরের জেলেদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো যুক্ত হচ্ছে বেসরকারি সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের ভাসমান হাসপাতাল। পাশাপাশি অসুস্থ রোগীদের আনা নেয়ার জন্য থাকবে একটি স্পিডবোট। ফলে দুর্গম চরে অবস্থানরত জেলেরা জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, জেলেদের চিকিৎসাসেবার কথা চিন্তা করেই এবার প্রথমবারের মতো ফ্রেন্ডশিপের ভাসমান হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাঁচ মাস ধরে সেখানে চিকিৎসাসেবা দেয়া হবে। 

দস্যুতা দমনের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে সুন্দরবনজুড়ে পৃথক দুটি অভিযান চলছে। এতে দস্যুতা আগের তুলনায় অনেকাংশে কমে এসেছে। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করে জেলেদের নির্বিঘ্নে চলাচল ও মাছ ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, গত শুঁটকি মৌসুমে বন বিভাগের প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। তবে দস্যুদের তৎপরতার কারণে রাজস্ব আদায় তুলনামূলক কম হয়েছে। এবারও একই ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। তারপরও চলতি মৌসুমে আট কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, দস্যুরা জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করায় জেলে ও মহাজনেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। একই সঙ্গে জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে। এ কারণে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডকে রাতের বেলায়ও টহল জোরদারের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ঝড় জলোচ্ছ্বাস, দস্যু আতঙ্ক ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পাঁচ মাসের শুঁটকি মৌসুম ঘিরে নতুন আশায় বুক বাঁধছেন উপকূলের হাজারো জেলে। তাদের প্রত্যাশা, নিরাপদ পরিবেশে মাছ আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করে পরিবার পরিজনের জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।

আপন দেশ/এসআর

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়