ছবি: আপন দেশ
বহুদিন পর বাগেরহাট পৌরসভার সড়ক উন্নয়নে কোটি কোটি টাকার কাজ শুরু হলেও নির্মাণকাজের মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।
কোথাও কার্পেটিং উঠে গর্ত তৈরি হয়েছে, কোথাও জমছে বৃষ্টির পানি। আবার কোথাও পুরোনো সড়কের ওপর পর্যাপ্ত বালু-খোয়া না দিয়েই কার্পেটিং করা হয়েছে। সড়কের কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু এবং দুই পাশে প্রয়োজনীয় মাটি ও কার্পেটিং না দেয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের নকশা ও নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না। নিম্নমানের ইট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের পাশাপাশি কাজের প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত মান যাচাই-বাছাই যথাযথভাবে করা হচ্ছে না। ফলে কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন স্থানীয়ভাবে খোকন নামে পরিচিত এক ঠিকাদার।
স্থানীয়দের দাবি, আগের সরকারের সময়ে বিভিন্ন সরকারি উন্নয়নকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা এ ব্যক্তি সরকার পরিবর্তনের পরও বাগেরহাট পৌরসভার একাধিক প্রকল্পের কাজ পরিচালনা করছেন। তাদের প্রশ্ন-৫ আগস্টের পরও কি আগের ঠিকাদারি ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
পৌরসভার সংশ্লিষ্ট নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, CTCRP প্রকল্পের আওতায় বাগেরহাট পৌরসভার ১০টি সড়কের উন্নয়নকাজের টেন্ডার মেসার্স জহিরুল হক দুলাল ও কুড়িগ্রামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে হলেও স্থানীয়ভাবে এসব কাজ পরিচালনা করছেন খোকন।
পৌরসভার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদে ১০টি সড়ক উন্নয়নকাজের প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। পরে রিভাইজ করে বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয় ৯ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ১০টি কাজের মধ্যে চারটি প্রায় সম্পন্ন, দুটি শেষ পর্যায়ে, কয়েকটি চলমান এবং চারটি এখনো শুরু হয়নি বলে জানা গেছে।
এর মধ্যে মিঠাপুকুর পার মসজিদ থেকে নূর মসজিদ মোড় হয়ে এলজিইডি অফিস পর্যন্ত ১ দশমিক ৪৪০ কিলোমিটার সড়কের কাজ প্রায় ৯৯ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। বাসাভাটি আমতলা স্কুল থেকে টোল অফিস হয়ে পুটিমারি ব্রিজ পর্যন্ত ৩৪৩ মিটার সড়কের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ।
আরও পড়ুন<<>>সৎ মাকে গমর পানিতে ঝলসে দিলো সন্তানরা
শেষ অংশের কোথাও কোথাও খোয়া উঠে যাচ্ছে। এছাড়াও বৃষ্টির পানি জমে থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে রাহাতের মোড় থেকে পুরাতন বাজার হয়ে চানমারি ব্রিজ পর্যন্ত ১ দশমিক ৬৯৩ কিলোমিটার সড়কের কাজ হয়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। এ কাজের টেন্ডার মূল্য ৩ কোটি ৩৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু সড়কে পুরোনো রাস্তা প্রয়োজনীয় গভীরতা পর্যন্ত খুঁড়ে বেড প্রস্তুত করার পরিবর্তে সামান্য খোয়া ফেলে রোলার চালিয়ে সমান করা হয়েছে। পরে তার ওপর কার্পেটিং করা হয়েছে। এতে সড়কের প্রয়োজনীয় উচ্চতা ও শক্ত ভিত্তি তৈরি হচ্ছে না বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
তাদের আরও অভিযোগ, রাস্তার নিচু অংশে পানি নিষ্কাশনের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির সময় পানি জমছে। কোথাও আবার রাস্তার দুই পাশে প্রয়োজনীয় মাটি না দেয়ায় সড়কের প্রান্ত দুর্বল হয়ে পড়ছে।
আসাদ নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, কাজের সিডিউল দেখতে চাইলেও তাকে তা দেখানো হয়নি। তার অভিযোগ, নিম্নমানের ইট ব্যবহারের পাশাপাশি রাস্তার পাশে প্রয়োজনীয় মাটি দেয়া হয়নি। আরেক বাসিন্দা শাহিনের অভিযোগ, পুরোনো রাস্তার ওপর সামান্য খোয়া দিয়ে রোলার চালিয়ে সমান করার পর কার্পেটিং করা হয়েছে। এতে সড়কটি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
জনি নামে এক বাসিন্দা বলেন, সড়কের নিচু অংশে বৃষ্টির পানি জমে থাকে। এলাকাবাসী রাস্তা কিছুটা উঁচু করার অনুরোধ করলেও তারা শোনেননি। বাজেট অনুযায়ী এখন এভাবেই কাজ হবে বলে জানিয়ে ঠিকাদার জানান, পরে ভেঙে গেলে আবার করা হবে।
সাবু নামে আরেক বাসিন্দার দাবি, নিম্নমানের ইট ব্যবহারের বিষয়ে এলাকাবাসী আপত্তি জানিয়ে একপর্যায়ে কাজ বন্ধও করে দিয়েছিল। পরে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় আবার কাজ শুরু করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণকাজে অনিয়মের বিষয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও তা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কোথাও সড়ক উঁচু-নিচু, কোথাও রাস্তার পাশে প্রয়োজনীয় কার্পেটিং না থাকা এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের বিষয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে বলে জানান তারা। কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে ঠিকাদারের দুর্ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি এক বৃদ্ধা নির্মাণকাজের বিষয়ে কৈফিয়ত জানতে চাইলে তাকে গালিগালাজ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ওই ঠিকাদারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পৌরসভার বিভিন্ন স্টাফ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও ঠিকাদারের খারাপ ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন। তাদের দাবি, সরকারি উন্নয়নকাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।
স্থানীয়দের দাবি, COVID-19 প্রকল্পের আওতায় মোল্লাবাড়ির সামনে থেকে রাস্তা, ফরিদা মসজিদ সড়ক, ভিআইপি রোড ও পিটিআই স্কুল রোডসহ রাস্তা, ড্রেন, স্ল্যাব ও ফুটপাত নির্মাণের কাজেও একই ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন। সে সময় তিনি সোহেল কনস্ট্রাকশনের হয়ে এসব কাজ করেছিলেন বলে দাবি করেন তারা। তাদের প্রশ্ন, আগের প্রকল্পে কাজ করা একই ব্যক্তির প্রভাব যদি বর্তমান প্রকল্পেও থাকে, তাহলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে টেন্ডার হলেও বাস্তবে কাজটি কে করছেন-এ বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আরও যাচাই করা প্রয়োজন।

নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, কাজের সিডিউল, নকশা, নির্মাণসামগ্রীর মান, কাজের পরিমাপ ও প্রতিটি ধাপের মান নিয়ন্ত্রণ যথাযথভাবে করা হলে এত অভিযোগ কেন উঠছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিটি কাজের মান যাচাইয়ের নির্ধারিত ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ ও যাচাই-বাছাই না করেই তড়িঘড়ি করে কাজ বুঝে নেয়ার প্রবণতা রয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রকল্পের সিডিউল, স্পেসিফিকেশন, ওয়ার্ক অর্ডার, পরিমাপ বই (এমবি), বিল-ভাউচার এবং প্রকৌশলীদের তদারকি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করলেই হবে না। নির্মাণকাজ তদারকিতে কোনো কর্মকর্তা বা প্রকৌশলীর গাফিলতি থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
ঠিকাদারের সম্পদ নিয়েও স্থানীয়দের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, একসময় ফুটপাতে তেল বিক্রি করতেন বলে এলাকায় পরিচিত এ ব্যক্তি বর্তমানে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক এবং দামি গাড়িতে চলাফেরা করেন। তার সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এ ছাড়া বাগেরহাট পৌরসভাসহ অন্যান্য সরকারি দফতরের বিভিন্ন রাস্তা ও সেতুর কাজেও তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তবে সম্পদের বিষয়ে ওঠা এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। ফলে সম্পদের উৎস নিয়ে ওঠা অভিযোগ যাচাই ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলার সুযোগ নেই।
স্থানীয়দের দাবি, তার সম্পদের উৎস এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে সম্পৃক্ততা ও অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক।
বাগেরহাট পৌর প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন,সড়ক উন্নয়নকাজগুলো তদারকি করা হচ্ছে। কোথাও রাস্তা ভেঙে গেলে ঠিকাদারের মাধ্যমে তা সংস্কারের ব্যবস্থা করা হবে। কোনো কাজে অনিয়ম পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, ১০টি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের সিডিউল, নকশা, নির্মাণসামগ্রীর মান, কাজের পরিমাপ, ঠিকাদার নির্বাচন, বাস্তবে কাজ পরিচালনাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং এ পর্যন্ত উত্তোলন করা অর্থ-সবকিছু নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। তাদের ভাষায়, এসব সড়ক ছিল বাগেরহাট পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত উন্নয়নকাজ। বহুদিন পর পৌরসভার সড়ক সংস্কারে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ এলেও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুরো প্রকল্পই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সড়ক নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই কোনো সড়ক নষ্ট হয়ে গেলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হবে, অন্যদিকে আবারও সংস্কারের খরচের বোঝা পড়বে জনগণের ওপর। তাই কাজ শেষ হওয়ার আগেই অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন -৫ আগস্টের পরও যদি আগের ঠিকাদাররাই একইভাবে সরকারি কাজ পরিচালনা করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাহলে কি আবারও অনিয়মের কারণে থমকে যাবে বাগেরহাট পৌরসভার উন্নয়নের চাকা। জনগণের সুবিধার জন্য নেয়া প্রকল্প শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা মহলের লাভের মাধ্যম হয়ে উঠলে এর দায় নেবে কে-এ প্রশ্নের উত্তরও চান তারা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে খোকন নামে পরিচিত ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সামনাসামনি বসে একসঙ্গে কথা বলতে চান বলে জানান। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনা করে কাজের বিষয়টি সমাধান করতে চান বলেও জানান তিনি। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের চা খাওয়ার দাওয়াত দেন। পরবর্তীতে প্রকল্পের তথ্য ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে আবার ফোন করা হলে তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































