তারেক রহমান। ছবি: আপন দেশ
অতীতের রাজনীতিতে জাতির ইতিহাস বিভ্রান্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ, আর অতীত ভুলে গেলে দুই চোখ অন্ধ। গত ১৭ বছরে অতীত নিয়ে এত নড়াচড়া হয়েছে যে এতে দেশের মূল ইতিহাস ঢাকা পড়ে গেছে।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) বিকেলে রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহান স্বাধীনতা দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন।
তারেক রহমান বলেন, আমার দলের সহকর্মীদেরসহ প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক মানুষের কাছে আমি একটি কথা তুলে ধরতে চাই আজকে আমাদের এ মহান স্বাধীনতা দিবসে…আমাদের আকাঙ্ক্ষা সীমাহীন হলেও সম্পদের সীমাবদ্ধতা আমাদের রয়েছে। আমাদের স্বাদ এবং সাধ্যের মধ্যে ফারাক থাকলেও আমি এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাই, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে সকলে একসাথে দেশের জন্য কাজ করি তাহলে অবশ্যই আমরা আমাদের কাঙ্খিত স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো।
তিনি বলেন, আসুন এবারের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার হোক… সমাজের একটি অংশ নয় বরং আমরা সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে নিয়ে এ দেশে আমরা ভালো থাকবো। আসুন আমরা প্রত্যেকে একসাথে সহ-অবস্থানের মাধ্যমে খারাপকে দূরে ঠেলে দিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করব… এ হোক আমাদের আজকের স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার প্রত্যাশা, প্রতিজ্ঞা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার আপনাদেরই সরকার, বর্তমানের গণতান্ত্রিক সরকার এদেশের মানুষের নির্বাচিত সরকার, বর্তমানের গণতান্ত্রিক সরকার এদেশের মানুষের প্রতিষ্ঠিত সরকার।
তিনি বলেন, সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে লক্ষ্য করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষ রোপণ,কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। জনগণের জীবনমান উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করছি। প্রতিনিয়ত তার জন্য আপনাদের এ সরকার অক্লান্ত পরিশ্রম করছে, চেষ্টা করে যাচ্ছে।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে বিএনপির উদ্যোগে এ আলোচনা সভা হয়। আলোচনা সভার শুরুতে দলের প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ স্বাধীনতা যুদ্ধে বীর শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সম্মানিত মহাসচিব তার বক্তব্যে বলে গেছেন, শেষ পর্যন্ত তৎকালীন বিশ্বে অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল তাদের বিরুদ্ধে আমরা বিজয় আমাদের বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলাম এ বাংলাদেশের মানুষ। সুতরাং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের যে গৌরব গাঁধা তা নিয়ে আলোচনা হবে, গবেষণা চলবে এবং এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার।
তিনি আবার বলেন, তবে আলোচনা-সমালোচনা কিংবা গবেষণার নামে এমন কিছু করা বা বলা অবশ্যই আমাদের জন্য ঠিক হবে না। যেটি আমাদের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের যে গৌরব ইতিহাস তাকে কোনভাবে খাট করতে পারে।
তিনি বলেন, যে কথাটি আমি আপনাদের সামনে বলেছিলাম সেটি হলো অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ। আর অতীতকে যদি আমরা ভুলে যাই তাহলে আমাদের দুচোখ অন্ধ। সুতরাং আমরা যেমন অতীতকে একদম ভুলে যাবো না, ভুলে যাওয়া চলবে না। ঠিক একইভাবে অতীতেও আমরা দেখেছি। খুব বেশিদিন না, নিকট অতীতেও আমরা দেখেছি যে অতীত নিয়ে এত বেশি চর্চা হয়েছে যেটা আমাদের সামনে যে সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ আছে সে ভবিষ্যৎকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং এর প্রেক্ষাপট নিয়ে আপনাদের বক্তব্যে অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে যা এ মঞ্চেসহ অথবা সামনে যারা বসে আছেন বাইরেও বহু মানুষ আজকের এ আলোচনা শুনছেন অনেকেরই হয়তো অনেক কিছু জানা ছিল না। কিন্তু আলোচকবৃন্দের বক্তব্যে আজকে এইরকম অনেকগুলো বিষয় উঠে এসেছে। আজকে বাইরে এখানে আসার সময় আমি দেখেছি তরুণ প্রজন্মের অনেক সদস্য ভেতরে আসতে পারেনি জায়গা সংকুলানে কারণে তারা ভিড় করেছেন…. সে তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করে খুব সংক্ষেপে আমি বলতে চাই… বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অনিবার্য চরিত্র শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
তারেক রহমান বলেন, আমরা দেখেছি অতীতে যেভাবে শহীদ জিয়াউর রহমানকে তার অবদানকে তার কাজকে খাট করার চেষ্টা করা হয়েছে এর থেকেই প্রমাণিত হয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অবশ্যই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন অনিবার্য চরিত্র। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হঠাৎ করেই কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণাটি দেননি।
তিনি বলেন, শহীদ জিয়া প্রথম জীবনে অবশ্যই একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। তিনি একজন সামরিক সৈনিক ছিলেন। তবে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে স্বপ্ন সেটি যে তার মনের মধ্যে সে বোধ শক্তির পথ থেকে লালন করতেন এটি কিন্তু তার একটি লেখায় ফুটে উঠেছে। স্বাধীনতার চিন্তা চেতনা যে তিনি ধারণ করতেন, একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য যে তার একটা দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতি ছিল সেটি আমরা তার একটি লেখা থেকেই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি।
তিনি আবার বলেন, কথাগুলো আমার নয়, কথাগুলো কারো মনগাড়াও নয়। এ কথাগুলো আমরা তার নিজের লেখনী থেকে আমরা জানতে পারছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শহীদ জিয়ার নিজের লেখা একটি প্রবন্ধ আছে যার শিরোনাম ‘একটি জাতির জন্ম’। প্রবন্ধটি যথেষ্ট বড়। আমি খুব সংক্ষেপে সে প্রবন্ধের দুই একটি লাইন আপনাদের সামনে বলব। যেখান থেকে পরিষ্কার হয়ে যাবে পুরো বিষয়টি। এ প্রবন্ধের মাধ্যমেই আমরা জানতে পারি যে স্বাধীন বাংলাদেশ, সার্বভৌম একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন। বহু দিন যাবত শহীদ জিয়ার মনে শহীদ জিয়া লালন করছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধটি দৈনিক বাংলা পত্রিকার প্রথম ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রকাশিত হয়েছিল। এ প্রবন্ধটি বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসের প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে ছাপা হয়েছিল।
আরও পড়ুন <<>> মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য ঘটনার তুলনা চলে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী আবার বলেন, এ প্রবন্ধটি বা নিবন্ধটির শেষ প্যারায় শহীদ জিয়াউর রহমান লিখেছিলেন, তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট, ২৬ মার্চ ১৯৭১ সাল। রক্তের আখরে বাঙালির হৃদয়ের লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে, এ দিনটিকে ভালোবাসবে। এ দিনটি তারা কোনদিন ভুলবে না, কোন দিন না… এভাবেই তিনি লিখেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিটে কি হয়েছিল আমি মনে করি স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেন এ তথ্যটি অবশ্যই তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে।
তিনি বলেন, শহীদ জিয়ার লেখা এ প্রবন্ধটি যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তখন কিন্তু মাত্র মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে। যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন তারা কিন্তু প্রত্যেকেই তখন বেঁচে ছিলেন। এ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পরে কারো পক্ষ থেকেই আমরা কোনরকম এমন কিছু আপত্তি বা এমন কিছু কথা পাইনি যা এই প্রবন্ধ বা লেখাটিকে কন্ট্রাডিক্ট করে। শহীদ জিয়ার এ প্রবন্ধটি যে শুধু ৭২ সালে ২৬ মার্চই প্রকাশিত ছিল তাও নয়। আবারও প্রকাশিত হয়েছিলো সেটি আমি বলছি এবং সে সময়টি বলার মাধ্যমে… এখানে আলোচকবৃন্দ কিছু কিছু বিষয় বলেছিলেন সে সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বা বিতর্ক। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি, শহীদ জিয়াকে খাটো করার জন্য বহু অপচেষ্টা হয়েছে। এখন আপনাদেরকে যে তথ্যটি আমি দিব … তার মাধ্যমে একদম সঠিক যুক্তি তর্কের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, শহীদ জিয়াকে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আগেই আমি বলেছি যা সত্য তা সত্যই। শহীদ জিয়া যে মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্য বৌদ্ধ চরিত্র এটিকে লুকানোর কোনই উপায় নেই।
তারেক রহমান বলেন, শহীদ জিয়ার নিবন্ধনটি ১৯৭৪ সালে আবারো প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রা। তার লেখাটি একটি জাতির প্রবন্ধ লেখাটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি অনন্য দলিল। ৭৪ সালেও আবার যখন প্রকাশিত হয়েছিল কারোরই কোন আপত্তি ছিল না এবং শহীদ জিয়া তার লেখায় যা যা বলেছিলেন অবিকল ছিল। সে সময় সরকারে কারা ছিল রাজনৈতিকভাবে কারা কোথায় অবস্থান করছিল আমাদের কমবেশি প্রত্যেকেরই ধারণা আছে। কিন্তু সে সময় তৎকালীন সরকার অথবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কেউ শহীদ জিয়ার কোন লেখার প্রবন্ধটির কোন বক্তব্যকে কেউ কোনভাবেই খন্ডন করার করেননি, চেষ্টাও তারা করেননি। কারণ সে সময় যারা ছিলেন তারা জানতেন শহীদ জিয়ার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ প্রবন্ধে উল্লেখিত সত্য সেগুলো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ ধরেও বিশ্বের যেখানে যারা স্বাধীনতার লড়াই করেছেন সংগ্রাম করেছেন একমাত্র তাদের পক্ষেই উপলব্ধি করা সম্ভব স্বাধীনতার মূল্য কতখানি। আমরা যদি একটু পাশে তাকাই তাহলেই দেখতে পারবো স্বাধীনতার গুরুত্ব এবং তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারছে স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনের মানুষ। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি, হাজারো প্রাণের বিনিময়ে আমরা ২০২৪ সালে দেশ এবং স্বাধীনতা রক্ষা করেছি। ২০২৪ সালের যারা বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির ভিতরে থেকেও, বিভিন্ন অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেও আপনারা কিভাবে প্রতিরোধ গড়েছিলেন কিভাবে আপনারা স্বৈরাচারকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। আমরা আমাদের বহু সহকর্মীকে সেদিন হারিয়েছি। প্রতিটি প্রাণের স্বপ্ন আছে আকাঙ্ক্ষা আছে… স্বপ্ন ছিল আকাঙ্ক্ষাও ছিল। সে আকাঙ্ক্ষা পূরণেই তারা সাহসের সঙ্গে সেদিন লড়াই করেছিল ৭১, ৯০, ২৪ এ। ১৯৭১ থেকে আজ পর্যন্ত সকল প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের সকল শহীদদের আকাঙ্ক্ষা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ভিত্তিক তাবেদার মুক্ত একটি স্বাধীন সার্বভৌম নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ বক্তব্য রাখেন।
আলোচনা সভায় আরও অংশ নেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ওয়াকিল আহমেদ, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মন্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































