Apan Desh | আপন দেশ

বয়স বাড়লে বন্ধু হারিয়ে যায় কেন?

আপন দেশ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:০২, ১ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ০১:০৭, ১ জুলাই ২০২৬

বয়স বাড়লে বন্ধু হারিয়ে যায় কেন?

ছবি: সংগৃহীত

‘কেন বাড়লে বয়স ছোট্টবেলার বন্ধু হারিয়ে যায়।’ কণ্ঠশিল্পী শায়ানের জনপ্রিয় একটি গানের লাইন। যে লাইনটা প্রায় মানুষেরই জীবনের গল্প। একসময় যাদের ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করা যেত না, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেকেই দূরে সরে যায়। কিন্তু কেন এমন হয়?

শৈশব বা কৈশোরের বন্ধুত্ব হয় খুবই সহজ। প্রতিদিন দেখা হয়। একসঙ্গে পড়াশোনা, খেলাধুলা, গল্প আর ঘোরাঘুরি। তখন বন্ধুত্ব ধরে রাখার জন্য আলাদা কোনো চেষ্টা করতে হয় না। কারণ সবাই একই পরিবেশে থাকে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে জীবন বদলে যায়। কর্মজীবনের ব্যস্ততা বাড়ে। নতুন পরিবার গড়ে ওঠে। অনেকেই অন্য শহর বা দেশে চলে যান। ফলে একসময় যে বন্ধুর সঙ্গে প্রতিদিন কথা হতো, তার সঙ্গে হয়তো বছরে একবারও কথা হয় না।

এ পরিবর্তন অনেকের কাছেই কষ্টের। তবে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সের সঙ্গে বন্ধুত্বের পরিবর্তন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সব দূরত্বই ঝগড়া বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে তৈরি হয় না। জীবনের নতুন বাস্তবতা, দায়িত্ব এবং অগ্রাধিকারও বন্ধুত্বের ধরন বদলে দেয়।

কেন বয়সের সঙ্গে বন্ধুত্ব বদলে যায়?

মার্কিন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লরেন গ্রাওয়ার্ট বলেন, জীবনের প্রথম বিশ বছরে বেশিরভাগ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে একই জায়গায় থাকা, একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা কিংবা কর্মজীবনের শুরুতে একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে। কাছাকাছি থাকার কারণে নিয়মিত যোগাযোগও সহজ হয়।

তবে তিরিশের পর জীবন অনেক বেশি জটিল হয়ে ওঠে। কর্মক্ষেত্রের চাপ বাড়ে। সংসার শুরু হয়। সন্তান কিংবা পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনার দায়িত্ব আসে। ফলে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের থেরাপিস্ট মাতকো মোসুনিয়াক বলেন, বিশ থেকে তিরিশের মধ্যবর্তী সময় মানুষের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ এবং জীবনের লক্ষ্য সবচেয়ে বেশি পরিবর্তিত হয়।

কেউ কর্মজীবনকে বেশি গুরুত্ব দেন। কেউ পরিবারকে প্রাধান্য দেন। আবার কেউ নতুন কোনো আগ্রহ বা জীবনধারা বেছে নেন। ফলে যাদের সঙ্গে একসময় অনেক মিল ছিল, সময়ের সঙ্গে তাদের চিন্তা ও জীবনযাত্রায় পার্থক্য তৈরি হয়।

এর প্রভাব পড়ে বন্ধুত্বেও। কোনো বড় দ্বন্দ্ব ছাড়াই অনেক সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়।

অনেকেই মনে করেন, বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো তিক্ত ঘটনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নতুন দায়িত্ব, কর্মব্যস্ততা, ভিন্ন শহরে বসবাস, পারিবারিক প্রয়োজন কিংবা স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণেও মানুষ ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের এ পরিবর্তনকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। এটি জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তনেরই একটি অংশ।

অনেকেই অবাক হন, একটি বন্ধুত্ব হারিয়ে কেন এত কষ্ট লাগে।

লরেন গ্রাওয়ার্ট বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক সামাজিক সম্পর্ক হারানোর অনুভূতিকেও শোকের মতোই গ্রহণ করে। তাই কোনো বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে গেলে শূন্যতা, একাকিত্ব কিংবা বিষণ্নতা অনুভব করা স্বাভাবিক।

কারণ বন্ধুত্ব শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যায় জীবনের একটি সময়, অসংখ্য স্মৃতি এবং একসঙ্গে দেখা ভবিষ্যতের অনেক স্বপ্নও।

অনেকেই নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, যেহেতু কোনো ঝগড়া হয়নি, তাই কষ্ট পাওয়ারও কিছু নেই। কিন্তু লরেন গ্রাওয়ার্ট মনে করেন, এ ধারণা ঠিক নয়।

তার মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুত্বের সমাপ্তিকে মেনে নেয়া এবং নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করা মানসিক সুস্থতার জন্য জরুরি। কষ্টকে অস্বীকার না করে গ্রহণ করতে পারলেই ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়।

বন্ধুত্ব শেষ হওয়ার পর অনেকেই ভাবেন, কার ভুল ছিল বা কী করলে সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখা যেত।

মাতকো মোসুনিয়াক বলেন, এমন নেতিবাচক চিন্তা মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তার মতে, প্রতিটি সম্পর্কই চিরস্থায়ী হয় না। কিছু সম্পর্ক জীবনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকে। এরপর স্বাভাবিকভাবেই তার রূপ বদলে যায়।

বন্ধুত্ব শেষ হয়ে গেলেই তার সব স্মৃতি মুছে ফেলতে হবে, এমন নয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, সম্পর্কটি থেকে কী শেখা গেল এবং কত সুন্দর মুহূর্ত পাওয়া গেল, সেগুলো মনে রাখাই ভালো। অতীতকে অতিরিক্ত রোমান্টিক না করেও ভালো স্মৃতিগুলোকে মূল্য দেয়া সম্ভব। এতে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার মানসিক শক্তিও তৈরি হয়।

আরও পড়ুন <<>> কিভাবে বুঝবেন বিপরীত মানুষটি আপনার প্রেমে পড়েছে

প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে নতুন বন্ধু তৈরি করা সহজ নয়। ব্যস্ততা থাকে। দায়িত্ব থাকে। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ও কাজ করে।

মাতকো মোসুনিয়াকের পরামর্শ, হঠাৎ খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা না করে এমন পরিবেশে নিয়মিত যাওয়া উচিত, যেখানে একই মানুষদের সঙ্গে বারবার দেখা হয়। এতে ধীরে ধীরে নতুন সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়ে।

অনেক সময় নতুন বন্ধুত্ব তৈরির চেয়ে পুরোনো সম্পর্ক আবার ফিরিয়ে আনা সহজ হতে পারে। বহুদিন কথা হয়নি, এমন কোনো বন্ধুকে একটি সাধারণ বার্তা পাঠিয়েও যোগাযোগ শুরু করা যায়।

তবে প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত হওয়া উচিত। আগে যেমন ছিল, সম্পর্ক হয়তো আর ঠিক তেমন হবে না। কিন্তু নতুন বাস্তবতায় সে বন্ধুত্ব নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে।

নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বর্তমান বন্ধুদেরও সময় দেয়া জরুরি। একসঙ্গে চা খাওয়া, নিয়মিত খোঁজ নেয়া কিংবা ছোট কোনো আড্ডার আয়োজন—এসব ছোট উদ্যোগই সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধুত্ব টিকে থাকে নিয়মিত যোগাযোগ, আন্তরিকতা এবং পারস্পরিক সম্মানের ওপর।

আপন দেশ/এসএস

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়