ফাইল ছবি, আপন দেশ
সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি গ্রহণে নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক।
সহযোগী অধ্যাপক হতে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি/ আপগ্রেডিংয়ের জন্য করা আবেদনে এ জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। আবেদনে বিভিন্ন অসামঞ্জস্যতা দেখা যাওয়ায় ফাইলটি ভাইস চ্যান্সেলর দফতর থেকে বিভাগে ফেরত পাঠিয়ে প্ল্যানিং কমিটির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছেন ইবি ভিসি।
অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম ড. মোঃ আসাদুজ্জামান, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির সভায় তার আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ফাইল প্রশাসনে পাঠানোর পর সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তিনি ফাইলে নতুন নথি যুক্ত করেছেন। পূর্বের বিভাগীয় সভাপতি স্বাক্ষরিত একটি নথি গায়েব করে দিয়েছেন। এছাড়া তার গবেষণা প্রবন্ধ ও রিভিউকৃত পুস্তক নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশন/ পদোন্নতির নীতিমালা/বিধি মোতাবেক ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান গত ২৮ এপ্রিল আবেদন করেন। তার মোট চাকরিকাল ১৬ বছর ৮ মাস ৬ দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা/বিধি মোতাবেক অধ্যাপক পদে পদোন্নতি/ আপগ্রেডিং জন্য পিএইচডি ডিগ্রিসহ মোট চাকুরিকাল ১২ বছর ও সহযোগী অধ্যাপক পদে ৫ বছর এবং এ পদে থাকাকালিন কমপক্ষে ৫টি প্রকাশনা/রিভিউকৃত পুস্তকসহ সর্বমোট ৯টি প্রকাশনা প্রয়োজন।
অভিযুক্ত শিক্ষক ড. আসাদুজ্জামানের আবেদনের তথ্য অনুযায়ী তার ১০ টি গবেষণা প্রবন্ধ ও একটি রিভিউ পুস্তক রয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী একটি রিভিউকৃত পুস্তক সমান তিনটি গবেষণা প্রবন্ধের সমান হওয়ায় তার সর্বমোট গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ১৩ টি। কিন্তু এসব গবেষণা প্রবন্ধ ও রিভিউ পুস্তকে কোন সাল ও তারিখ উল্লেখ নেই। তাই এটি কবে প্রকাশিত হয়েছে তা নিশ্চিত নয় প্ল্যানিং কমিটি।
এছাড়া ড. আসাদুজ্জামানের মোট চাকরির বয়স বিধি মোতাবেক হলেও সহযোগী অধ্যাপক হতে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী উক্ত পদে ৫ গবেষণা প্রবন্ধ প্রয়োজন হলেও তিনি সহযোগী অধ্যাপক পদে একটি রিভিউ পুস্তক জমা দিয়েছেন। যে পুস্তক তিনি জমা দিয়েছেন সেখানেও সাল ও তারিখ উল্লেখ নেই।
আরও পড়ুন<<>>গোবিপ্রবিতে নবীনদের আগমন-প্রত্যাশা
এছাড়া সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে প্ল্যানিং কমিটির অনুমোদনের পর ফাইল প্রশাসনে পাঠানোর পরে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একবার আবেদন দাখিলের পর সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে উক্ত শিক্ষক গবেষণা প্রবন্ধ ও রিভিউ পুস্তকের তালিকা পরিবর্তন করেছেন। গত ২৮ এপ্রিল দাখিলকৃত আবেদনপত্রের সঙ্গে তার স্বাক্ষরিত গবেষণা প্রবন্ধ ও রিভিউ পুস্তকের একটি তালিকা সংযুক্ত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে প্রশাসন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যখন ফাইল ফেরত পাঠানো হয় তখন সেখানে সে তালিকার পরিবর্তে একটি নতুন তালিকা পাওয়া যায়।
জানা যায়, দাখিলকৃত কাগজপত্র প্ল্যানিং কমিটি কর্তৃক যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে বিভাগীয় সভাপতির স্বাক্ষরিত একটি তালিকা প্রশাসনের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল। তবে গত ১২ জুলাই যখন প্রশাসন কর্তৃক ফাইলটি ফেরত পাঠানো হয়, তখন নথিতে উক্ত বিভাগীয় সভাপতির স্বাক্ষরিত তালিকাটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত শিক্ষক ফাইলের কাগজপত্র শক্ত করে বেঁধে দেয়ার নামে অ্যাকাডেমিক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ফাইলটি অবৈধভাবে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে গবেষণা প্রবন্ধ ও রিভিউ পুস্তকের তালিকাটি প্রশাসনের অজ্ঞাতে নতুন করে যুক্ত করে পরদিন আবার এসে ফাইল যথাস্থানে জমা দিয়েছেন। ফলে আবেদনপত্রের সঙ্গে দাখিলকৃত মূল তালিকা আর প্রশাসন কর্তৃক প্রেরিত ফাইলের সংযুক্ত তালিকার মধ্যে বিরাট পার্থক্য দেখা যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একবার প্ল্যানিং কমিটির অনুমোদনের পর দাখিলকৃত আবেদন এভাবে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কোন পরিবর্তন করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিতভাবে আবেদন দিয়ে প্রশাসনের অনুমতিপূর্বক কোনো নথিপত্র সংযোজন বা বিয়োজন করা যেতে পারে।
এদিকে অভিযুক্ত এ শিক্ষকের দাখিলকৃত গবেষণা প্রবন্ধ ও পুস্তক নিয়েও রয়েছে জালিয়াতির চেষ্টা। প্রশাসন কর্তৃক প্রেরিত নথিতে নতুনভাবে যে তিনটি গবেষণা প্রবন্ধের স্বীকৃতিপত্র সংযুক্ত করা হয়েছে, এ তিনটি গবেষণা প্রবন্ধ সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশন/পদোন্নতির জন্য দাখিলকৃত আবেদনপত্র ও গবেষণা প্রবন্ধের তালিকায় ইতোমধ্যে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে অভিযুক্ত শিক্ষক ড. আসাদুজ্জামান খুব সুকৌশলে একই গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হিসেবে আবেদনপত্রের সঙ্গে দাখিলকৃত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আবার অন্যদিকে একই প্রবন্ধগুলোর স্বীকৃতি পত্র নতুনভাবে নথিতে সংযুক্ত করেছেন।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শিক্ষক ড. আসাদুজ্জামান বলেন, আমি বিভাগে আবেদন জমা দিয়েছি। বিভাগ থেকে প্ল্যানিং করে প্রশাসনে পাঠিয়েছে। তারপরের বিষয়গুলো প্রশাসনের। এ বিষয়গুলোতে আমার কোনো হাত নেই। এখানে জালিয়াতির কোনো বিষয় নেই।
গোপনে ফাইল বাসায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা প্রশাসনের বিষয়। আবেদন জমা দেয়ার পর প্রশাসন যখন যেভাবে চাবে, সেভাবে কাজ করতে হবে। তবে প্রশাসন তার কাছে নতুন করে কোনো ডকুমেন্ট চেয়েছিল কি না প্রশ্ন করলে তিনি প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে অ্যাকাডেমিক শাখার উপ-রেজিস্ট্রার মীর সিরাজুল ইসলাম রিপু বলেন, আমার যোগসাজশে ফাইলকেও বাসায় নিয়ে গেছে এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার কাছে যখন ফাইল এসেছিল আমি ডকুমেন্টগুলো পেয়েছিলাম। কিন্তু প্ল্যানিং কমিটির সিদ্ধান্তের কপিতে সেগুলো পাইনি। দুই জায়গায় অমিল পাওয়ায় আমি বিভাগীয় সভাপতিকে বিষয়টা জানাই। তারপর আমি প্ল্যানিং কমিটি যা লিখেছে আর বাস্তবে ফাইলে যা যা পেয়েছি, দুটি তথ্যই তুলে ধরেছি। এরপরে ফাইলটি ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে নতুন ডকুমেন্টস কীভাবে ঢুকানো হয়েছে তা আমি বলতে পারবো না।
জানতে চাইলে প্ল্যানিং কমিটির সভাপতি ও বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. সঞ্জয় কুমার সরকার বলেন, তার আবেদনের প্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই করে প্ল্যানিং কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে তার পদোন্নতির সুপারিশ করে আবেদনপত্রটি রেজিস্ট্রার অফিসে প্রেরণ করা হয়। পরে প্রশাসন থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও মতামত চেয়ে ফাইল ফেরত আসে। প্ল্যানিং কমিটির সভায় বিষয়টি পর্যালোচনা করতে গেলে কিছু অসঙ্গতি পাওয়া যায়। এগুলো তুলে ধরেই আমরা প্রশাসনে ফাইলটি পাঠিয়েছি।
আগের ডকুমেন্টস উধাও করে নতুন ডকুমেন্টস সংযুক্ত কীভাবে হয়েছে - জানতে চাইলে তিনি বলেন, উনার আবেদনের সঙ্গে যে যে কাগজপত্রযুক্ত ছিল সেগুলোর ব্যাপারে আমরা উল্লেখ করেই দিয়েছিলাম। কোনো ডকুমেন্টস থাকার পরেও আমরা সেটা উল্লেখ করিনি - এমনটা হয়নি। এখন নতুন কোনো কাগজপত্র কীভাবে উনার ফাইলের সঙ্গে সংযোজন-বিয়োজন হলো সেটা প্ল্যানিং কমিটিরও প্রশ্ন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক বলেন, প্ল্যানিং কমিটির নথি প্রেরণের পর নতুন কোন ডকুমেন্টস সংযোজন বা বিয়োজন করার জন্য ওই শিক্ষকের কোন আবেদন আমি পাইনি। কোনো একটা কারণে তার প্রমোশনের ফাইলটি আবার ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়ের নির্দেশে নতুন করে মতামত চেয়ে প্ল্যানিং কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। সেটাও প্ল্যানিং থেকে এসেছে সম্ভবত। তবে ফাইলে নতুন কোন কাগজপত্র সংযুক্তির ব্যাপারে আমার জানা নেই।
আপন দেশ/এসআর
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































