Apan Desh | আপন দেশ

জামায়াত–এস আলম ঘনিষ্ঠেই বিএনপির টিকিট!

বিশেষ প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ২২:৩৯, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫

আপডেট: ২৩:০৮, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫

জামায়াত–এস আলম ঘনিষ্ঠেই বিএনপির টিকিট!

মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম ও জালাল উদ্দিন

চব্বিশের অভ্যুত্থানে হত্যা মামলার আসামি এবং এস.আলমের ঘনিষ্টজন, জামায়াত নেতা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম হয়েছেন নোয়াখালি-৫ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। এ জামায়াত নেতা কেমন করে বিএনপি প্রার্থী হলেন-এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আল-জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।

শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) তিনি এক ফেসবুক পোস্টে মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম এবং চাঁদপুর-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী
জালাল উদ্দিনের তথ্যাদি প্রকাশ করেন সায়ের। সেখানে উল্লেখ করেন, চাঁদপুর-২ আসনে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য (এমপি) প্রার্থী জালাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এজন্য তার নিজের ও স্ত্রী শাহানাজ শারমিন, ছেলে সাইদ মোহাম্মদ রিজভী, সাইদ মোহাম্মদ আলভী, মেয়ে আয়েশা তাসমিয়া তানভীরের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত।

গত ২২ ডিসেম্বর দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের অবকাশকালীন বিচারক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন সোমবার এ আদেশ দেন। দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, জালাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূত অর্থ উপার্জন করার অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ তার নিজ ও স্বার্থসংশ্লিষ্টদের নামের ব্যাংক হিসাবে এনে বৈধতা প্রদানের চেষ্টা করছেন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং করেছেন। অভিযোগগুলো অনুসন্ধানাধীন। 

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, মো. জালাল উদ্দিন সপরিবার যেকোনো সময় দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে অবস্থান নেবেন। সে জন্য, অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের বিদেশ গমন রহিত করা একান্ত আবশ্যক। 

আরও পড়ুন<<>>ভোটের হাওয়ায় দ্রুত বদলাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ

ফেসবুক পোস্টে, কুখ্যাত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের মূল ব্যক্তি সাইফুল আলমের অতি ঘনিষ্ঠ, নোয়াখালী-৫ আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যা মামলা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আদালত সূত্র উল্লেখ করেছে, চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় মো. আলমগীর শেখ নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যায় মামলা (নং-৫৮(৯) দায়ের করা হয়েছে।

ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ফখরুল, ইবনে সিনা ক্লিনিকের রিসিপশনিস্ট হিসাবে কর্ম জীবন শুরু করেন। এক সময় তিনি জামায়াত ইসলামীর রোকনও ছিলেন বলে কথিত আছে। তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় একটি স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে। সে সময় তার নিয়মিত মধ‍্যপ্রাচ্যে যাতায়াত ছিলো। সমসাময়িক সময়ে ঢাকায় জমি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন  তিনি।

নব্বইয়ের দশকে ইবনে সিনা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মোকাদ্দেস আলী এবং মেডিনোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকের সঙ্গে ডেভলপার ব‍্যবসা শুরু করেন ফখরুল। ডা. মোকাদ্দেস একজন নিতান্তই ভদ্রলোক এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস‍্য ছিলেন। ডা. মোকাদ্দেসের পারিবারিক বেশ কিছু সম্পত্তি ছিলো ধানমন্ডি এলাকায়। সেখান থেকেই মূলত তাদের আবাসন ব্যবসা শুরু হয়। ডা. মোকাদ্দেস ফখরুল ইসলামের উপর ভরসা করেন এবং এ সুযোগে ফখরুল নানাবিধ অনিয়ম করে ব্যবসাকে ক্ষতির মুখে ফেলে গোপনে নিজের পকেট ভারী করেন। এক পর্যায়ে যৌথ ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে গেলে, ফখরুল মেট্রো হোমস নামে নিজের একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন। মূলত জামায়াত এবং শিবিরের পরিচিতি কাজে লাগিয়ে তাদের মাধ্যমেই ফ্ল্যাট কেনা-বেচা শুরু করেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, এ আবাসন ব্যবসায় অনেককেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন ফখরুল।

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রাহকদের কাছ থেকে ফ্ল্যাটের বুকিং অর্থ নিয়ে দীর্ঘদিন ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে হয়রানি করেছেন। তার ভুক্তভোগীদের মধ‍্যে অনেকেই ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী জামাতপন্থী প্রবাসীরা। নিজেকে জামায়াত ইসলামীর রোকন পরিচয় দিয়ে তাদের নিজ জালে ফেলতো ফখরুল।

২০০১ থেকে ২০০৬ বিএনপি এবং জামায়াতের জোট সরকারের সময় জামায়াত ঘরানার আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির একজন ফাউন্ডার ডাইরেক্টর এবং জামায়াতের এক শীর্ষ নেতার মাধ‍্যমে ফখরুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। সে সময় জামায়াত এবং শিবিরের পরিচিতি ব্যবহার করে ফারইস্ট খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ফারইস্টের চেয়ারম‍্যান থাকাকালীন সময় ব‍্যাপক দূর্নীতির মাধ্যমে এ ব্যক্তি লুটপাটের এক সাম্রাজ্য কায়েম করেন। নিজের অপকর্ম বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ পদে বসান নিজের ঘনিষ্ঠজনদের। ফারইস্টের মালিকপক্ষের কাছে বিষয়গুলো খোলাসা হয়ে গেলে বোর্ড অফ ডাইরেক্টরস তাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন।

ফখরুল ইসলাম ২০০৯ সালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী হিসাবে উপজেলা নির্বাচন করেন এবং পরাজিত
হন।

উল্লেখ, উপজেলা নির্বাচনের আগে তাকে বিএনপিতে যোগদানের জন্য আহবান করা হয় কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এক পর্যায়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ (মরহুম) এর সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়ান ফখরুল।

২০২২ সালে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দোসর ও দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ লুটেরা চট্টগ্রাম ভিত্তিক এস আলম গ্রুপের মালিক সাইফুল আলম মাসুদের (বর্তমানে পলাতক) সঙ্গে আঁতাত করে ফখরুল ইসলাম। সে সূত্রে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন পদ্মা লাইফ ইনসুরেন্সের চেয়ারম্যান পদে তাকে বসানো হয়। ফখরুল তার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাসুদের লুটের অবৈধ অর্থ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচারে সহযোগিতা করেন। ফখরুলের নিকটজনদের কাছ থেকে জানা যায়, আওয়ামী সরকার পতনের আগেই এস আলমের লোপাট করা অর্থের একটি বড় অংশ তুরস্কের আবাসন খাতে বিনিয়োগ করা হয়। ফখরুলকে ঐ আবাসন প্রকল্পের দায়িত্ব দেন সাইফুল ইসলাম মাসুদ।

২০২১ সালে ফখরুল প্রথম কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির মাধ্যমে দলটির রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশ করেন। বিতর্কিত এ দুই সংসদ প্রার্থীর বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল শেষ মুহূর্তে কি অবস্থান গ্রহণ করে সেটাই প্রশ্ন।

আপন দেশ/এসআর/এবি

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়