ভিডিও থেকে নেয়া ছবি
বাংলাদেশে ফেরার আশায় ভারতীয় সীমান্তে দিনের পর দিন অপেক্ষা- চিত্রটা যেন বদলানোর নয়। বৃষ্টি, অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক নিয়ে সীমান্তের ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন শত শত মানুষ। কারও কোলে শিশু, কারও পাশে বৃদ্ধ বাবা-মা। কেউ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন, কেউ আবার ভিজে কাপড়ে দাঁড়িয়ে আছেন শুধু একটি আশায়- ‘নিজের দেশে ফিরতে চাই।’
শুক্রবার (২৯ মে) উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট মহকুমার সীমান্ত দিয়ে ১০০ জনকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কাছে হস্তান্তর করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই শেষে বিজিবি-বিএসএফের সমঝোতার মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়। তবে এখনও সীমান্ত এলাকায় ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ঘোষিত হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে অপেক্ষমাণ রয়েছেন আরও প্রায় ৫০০ মানুষ, যারা নিজেদের বাংলাদেশি বলে দাবি করছেন।
গত এক সপ্তাহ ধরে স্বরূপনগর থানার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের হাকিমপুর চেকপোস্ট যেন এক মানবিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সকাল হতেই সেখানে ভিড় করছেন দেশে ফেরার আশায় থাকা নারী-পুরুষেরা। শুক্রবার (২৯ মে) বিকেল তিনটা (ভারতীয় সময়) পর্যন্ত নতুন করে আরও ১১৬ জন নিজেদের বাংলাদেশি পরিচয় দিয়ে বিএসএফের খাতায় নাম লিখিয়েছেন।
আরও পড়ুন<<>> রাতভর কান্না, সকালে লোকসানের ঈদ
বৃষ্টিভেজা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন শিশু, বৃদ্ধ, গৃহবধূ ও শ্রমজীবী মানুষ। সীমান্তে পৌঁছানোর পর বাস, প্রাইভেটকার কিংবা স্থানীয় পরিবহন থেকে নামিয়ে তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করছে বিএসএফ। নেয়া হচ্ছে বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট। কারও কাছে বাংলাদেশি পরিচয়ের কোনো নথি থাকলে সেটিও জমা নেয়া হচ্ছে। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে সে তথ্য পাঠানো হচ্ছে বিজিবির কাছে।
ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার (২৮ মে) পর্যন্ত হাকিমপুর, স্বরূপনগর বাজার ও তেতুলিয়া সীমান্ত এলাকার চারটি হোল্ডিং সেন্টারে অন্তত সাড়ে ৩৫০ জনকে রাখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১০০ জনকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। তবে বাকিদের অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
সীমান্তে অপেক্ষারত অনেকেই জানিয়েছেন, বছরের পর বছর আগে দালালদের মাধ্যমে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন তারা। কেউ গৃহকর্মী, কেউ দিনমজুর, কেউ নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। দীর্ঘদিন ভারতের মাটিতে বসবাস করতে করতে অনেকে সেখানকার সামাজিক সুরক্ষা সুবিধাও পেয়েছেন। কেউ কেউ জোগাড় করেছিলেন ভারতের জাতীয় পরিচয়পত্রও।
কিন্তু সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর অবস্থান এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে তাদের মধ্যে। এরপরই শুরু হয় নিজের দেশে ফেরার মরিয়া চেষ্টা। অভিযোগ উঠেছে, যথাযথ মানবিক প্রক্রিয়া ও মর্যাদা নিশ্চিত না করেই সীমান্তে এনে জড়ো করা হচ্ছে এসব মানুষকে।
একজন মধ্যবয়সী নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,‘ভুল করেছি। কিন্তু শেষ বয়সে নিজের মাটিতেই মরতে চাই।’
সীমান্তের কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এসব মানুষের গল্প শুধু অবৈধ অনুপ্রবেশের নয়; এটি বেঁচে থাকার সংগ্রাম, দারিদ্র্য, পরিচয় সংকট এবং রাষ্ট্রীয় কঠোরতার মাঝখানে আটকে পড়া মানুষের অসহায়তার গল্প।
বর্তমানে বাংলাদেশের হাকিমপুর সীমান্তেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে বিজিবি ও বিএসএফ। তবে সীমান্তে অপেক্ষমাণ মানুষগুলোর চোখে এখনও একটাই প্রশ্ন- ‘শেষ পর্যন্ত কি ফিরতে পারবো নিজের দেশে?’
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































