ছবি: আপন দেশ
একটি সবুজ, নিরাপদ, টেকসই এবং ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যৎ গড়তে জলবায়ু কার্যক্রমকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যয় নয়, বরং সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা আর যৌথ ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে চীনের তালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ুর নেতৃত্ব’ অধিবেশন প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যয় নয়। আমরা এটিকে সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং একটি যৌথ ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আজকে অনেকেই বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির প্রশংসা করেছেন।
তিনি বলেন, জলবায়ু কার্যক্রমকে একটি বিনিয়োগ হিসেবে দেখি। আমরা এখানে উপস্থিত সকলে মিলে একটি সবুজতর, নিরাপদতর, টেকসই এবং আরও ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যৎ গড়তে পারি।
জলবায়ু সহনশীলতা রাখতে প্রধানমন্ত্রী তিনটি অগ্রাধিকার অধিবেশনে উপস্থাপন করে বলেন, জলবায়ু সহনশীলতা কোনো দেশ একা গড়ে তুলতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন অংশীদারিত্ব, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং যৌথ অঙ্গীকার। কেপ-৩১ ও কেপ-৩২ এর দিকে তাকিয়ে আমরা তিনটি অগ্রাধিকারের ওপর জোর দিতে চাই।
তিনি বলেন, প্রথমত, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য ও অনুমানযোগ্য সহায়তাসহ ‘ক্ষয়ক্ষতি তহবিল’ কে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু অর্থায়নকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আরও সহজলভ্য, সহজসাধ্য এবং চাহিদা-সাপেক্ষ হতে হবে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও ত্বরান্বিত হওয়া উচিত। এ লক্ষ্যে, আমাদের ‘সবুজ জলবায়ু তহবিল (জিসিএফ) এর বৃহত্তর সংহতকরণ এবং কার্যকরীকরণ প্রয়োজন।
তৃতীয় অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রশমনের পাশাপাশি অভিযোজনও অপরিহার্য। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজন কোনো নীতিগত বিকল্প নয়, এটি একটি অপরিহার্য বিষয়। ইউএনসিটিএডি-এর মতে, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন সম্মিলিত পরিমাণগত লক্ষ্যমাত্রা (এনসিকিউজি) উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রশমন ও অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তা পূরণে অপর্যাপ্ত।
চীনের দালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ক্লাইমেট লিডারশীপ ইন এ শিফটিং গ্লোভাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক এ অধিবেশন হয়। এতে ৯০টি বেশি দেশের প্রায় এক হাজার ৭০০ প্রতিনিধিন অংশ নেন।
এবারের সম্মেলনে বৈশ্বিক অর্থনীতি, শিল্পকাঠামোর পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও উদীয়মান প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ, চীনের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, তারুণদের কর্মসংস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনায় উঠে আসছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আজ এখানে শুধু জলবায়ু সংকটে একটি সম্মুখ সারির রাষ্ট্র হিসেবেই নয় বরং বৈশ্বিক সমাধান প্রদানে আগ্রহী একটি জাতি হিসেবেও সমবেত হয়েছি। আমরা আমাদের সংগ্রামের দ্বারা সংজ্ঞায়িত হতে অস্বীকার করি, বরং আমরা আমাদের সহনশীলতার দ্বারা সংজ্ঞায়িত হতে চাই।
আরও পড়ুন <<>> চীনে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার একটি অগ্রণী জলবায়ু-সহনশীল জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরিবেশ সুরক্ষা, টেকসই উন্নয়ন এবং সবুজ প্রবৃদ্ধি এখন আমাদের জাতি গঠন কৌশলের কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে, এটি এমন একটি বিষয় যা নিয়ে আমি গভীরভাবে ভাবি এবং যার জন্য আমি সচেষ্ট থাকি। এটি জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার বিষয়।
তিনি আরও বলেন, পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস এবং জলাভূমি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে আমরা আগামী ৫ বছরে প্রায় ২০,০০০ কিলোমিটার নদী ও খাল খনন করার পরিকল্পনা করেছি। আমরা পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, কৃষিকে সহায়তা করতে এবং জলবায়ুগত অভিঘাত মোকাবেলার লক্ষ্যে আমাদের প্রধান নদীর উপর পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আমরা একটি ব্যাপক মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা ব্যারেজকেও আধুনিকীকরণ করছি। আমরা আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো ও রক্ষণাবেক্ষণের অঙ্গীকার করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু তাই নয়, স্কুল, সম্প্রদায় এবং তরুণদের সম্পৃক্ত করে দেশব্যাপী একটি আন্দোলনের মাধ্যমে, যেমন ‘এক শিক্ষার্থী, এক গাছ কর্মসূচি’ এর মাধ্যমে আমরা বনাঞ্চল সম্প্রসারণ করব, জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার করব, সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করব এবং তাপমাত্রা হ্রাস করব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকার বন, জলাভূমি, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করছে। আমরা গ্রামীণ এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য বিনিয়োগ করছি এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ মান চালু করছি।
তিনি আবারও বলেন, আমাদের সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সৌর, বায়ু, বর্জ্য থেকে শক্তি এবং অন্যান্য সমাধানের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বাংলাদেশের অন্তত ২০% বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আমরা পাটজাত পণ্য এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনসহ পরিবেশবান্ধব পরিবহনের মতো সবুজ শিল্পকেও উৎসাহিত করি। সবুজ বিনিয়োগ এবং কার্বন-ক্রেডিটের সুযোগ উন্মোচনের জন্য একটি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলা হবে। বাংলাদেশ সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার, জৈব সার উৎপাদন এবং চক্রাকার অর্থনীতি উদ্যোগের মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনাও করছে। আমরা সবুজ উৎপাদন নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছি। এখন আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি যে, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি এলইইডি প্রত্যয়িত কারখানার মধ্যে ৬৯ টিই বাংলাদেশের।
বিশ্ব নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বজুড়ে নেতৃবৃন্দকে অবশ্যই তাদের মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে রেখে সে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে, যাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কেপ-৩১ এর উচিত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত কাঠামো কনভেনশন (ইউনিসেফ) এবং প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য ও চেতনাকে পুনঃনিশ্চিত করা।
এ প্রসঙ্গে, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপকে উৎসাহিত করতে, ঐকমত্য গড়ে তুলতে এবং সম্মিলিত পদক্ষেপকে অনুপ্রাণিত করার জন্য একটি মূল্যবান মঞ্চ প্রদান করে। এখন সময় এসেছে জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিকে কাজে এবং অঙ্গীকারকে ফলাফলে পরিণত করার, যাতে বিশ্ব আত্মবিশ্বাসের সাথে ভবিষ্যৎকে আলিঙ্গন করতে পারে। আমরা আশা করি কেপ-৩১ এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে এবং বাংলাদেশ তার ভূমিকা পালনে প্রস্তুত।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।




































