ছবি: বাবুল তালুকদার
চীনের প্রাচীন ইতিহাস, রাজদরবারের জৌলুশ, কিংবদন্তির প্রেম আর ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন। মঞ্চজুড়ে কখনো রাজকীয় শোভাযাত্রা, কখনো নৃত্যের ছন্দে জীবন্ত হয়ে ওঠে হাজার বছরের পুরোনো কোনো আখ্যান। আলো-আঁধারির খেলা, পানির ওপর আলোর প্রতিফলন, বিশাল মঞ্চসজ্জা আর শিল্পীদের নিখুঁত পরিবেশনা দর্শককে নিয়ে যায় ইতিহাসের অন্য এক সময়ে।
চীনের এমনই দুটি আকর্ষণীয় মঞ্চ পরিবেশনা হলো ‘ছাং হেন গে’ এবং ‘মিলেনিয়াম জিউছেং প্যালেস’।
প্রথমটি তাং রাজবংশের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর ট্র্যাজিক প্রেমের গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত, অন্যটি প্রাচীন চীনের রাজকীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সিল্ক রোডের আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে তুলে ধরে। ইতিহাসকে নিছক বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলাই এই দুই পরিবেশনার বিশেষত্ব। নৃত্য, সংগীত, অভিনয়, আলোকসজ্জা ও আধুনিক মঞ্চপ্রযুক্তির সম্মিলনে এগুলো হয়ে উঠেছে চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উপভোগের অনন্য অভিজ্ঞতা।
১. ছাং হেন গে: প্রেমের আখ্যান যখন জীবন্ত ইতিহাস
চীনের শাআনশি প্রদেশের ঐতিহাসিক শহর সি’আন। এখানকার হুয়াছিং প্রাসাদের মনোরম পরিবেশে মঞ্চস্থ হয় বৃহৎ পরিসরের বহিরাঙ্গন নৃত্যনাট্য ‘ছাং হেন গে’। চীনের বিখ্যাত তাং রাজবংশের ইতিহাস, রাজকীয় জীবনযাপন এবং এক করুণ প্রেমের আখ্যানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই পরিবেশনা। এর মূল অনুপ্রেরণা তাং রাজবংশের কবি বাই জুয়ির বিখ্যাত মহাকাব্যিক কবিতা চিরন্তন অনুশোচনার গান।

নৃত্যনাট্যটির কেন্দ্রে রয়েছেন তাং সম্রাট সুয়ানজং এবং তাঁর প্রিয়তমা সম্রাজ্ঞী ইয়াং গুইফেই। তাঁদের প্রেম, রাজকীয় জীবনের আনন্দ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের বেদনা মঞ্চে ফুটে ওঠে ধারাবাহিক দৃশ্যের মধ্য দিয়ে। প্রেমের ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের জটিল সম্পর্ক এই পরিবেশনাকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। এখানে ইতিহাস কেবল অতীতের কোনো ঘটনা নয়, বরং মানুষের ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ও হারানোর বেদনার এক শিল্পিত প্রকাশ।

২০০৬ সালে যাত্রা শুরুর পর ‘ছাং হেন গে’ বিপুলসংখ্যক দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি ছয় হাজার পাঁচ শরও বেশি বার মঞ্চস্থ হয়েছে এবং দর্শকসংখ্যা ছাড়িয়েছে এক কোটি ২৯ লাখ। সি’আন ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকদের কাছে পরিবেশনাটি তাই বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত।

এই নৃত্যনাট্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর বিশাল মঞ্চপরিসর। হুয়াছিং প্রাসাদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে এক রাজকীয় আবহ। পাহাড়, জলরাশি ও ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গে মঞ্চের আলো মিলে দর্শকের সামনে উন্মোচিত হয় তাং রাজবংশের কল্পিত জগৎ। আধুনিক ত্রিমাত্রিক আলোকপ্রক্ষেপণ, বিশেষ আলোকপ্রভাব এবং পানির ওপর আলোর ব্যবহার দৃশ্যগুলোকে করে তোলে আরও আকর্ষণীয়। কোথাও আগুনের কৃত্রিম প্রভাব, কোথাও পানির ওপর নৃত্যশিল্পীদের প্রতিচ্ছবি, আবার কোথাও অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলে ওঠা আলো গল্পের আবেগকে গভীর করে তোলে।

শত শত পেশাদার নৃত্যশিল্পীর অংশগ্রহণে পরিবেশনাটিতে উঠে আসে তাং রাজবংশের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, রাজদরবারের আচার এবং ধ্রুপদি চীনা নৃত্যের সৌন্দর্য। শিল্পীদের পোশাকের রং, হাতের মুদ্রা, শরীরের ছন্দময় গতি ও দলগত বিন্যাসে ফুটে ওঠে সেই সময়ের নান্দনিকতা। কখনো রাজদরবারের উৎসবমুখর পরিবেশ, কখনো প্রেমিক-প্রেমিকার আবেগঘন মুহূর্ত, আবার কখনো বিচ্ছেদের বিষণ্নতা দর্শককে গল্পের ভেতরে টেনে নেয়।

‘ছাং হেন গে’র সার্থকতা শুধু চোখধাঁধানো আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কবিতার ভাষায় সংরক্ষিত একটি ঐতিহাসিক প্রেমের গল্পকে নৃত্য, সংগীত ও দৃশ্যশিল্পের মাধ্যমে নতুন করে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করে এই পরিবেশনা। ইতিহাসের সঙ্গে আবেগের এমন সংযোগই একে সাধারণ মঞ্চনাট্য থেকে আলাদা করেছে।
২. মিলেনিয়াম জিউছেং প্যালেস: রাজদরবারের জৌলুশে হাজার বছরের সভ্যতা
প্রাচীন চীনের ইতিহাসকে মঞ্চে জীবন্ত করে তোলার আরেকটি আকর্ষণীয় আয়োজন ‘মিলেনিয়াম জিউছেং প্যালেস’। লিনইউ অঞ্চলের এই লাইভ শোতে রাজকীয় সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক আখ্যান, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য এবং প্রাচীন চীনের সভ্যতার নানা অনুষঙ্গকে একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। এর মূল আকর্ষণ হলো ইতিহাসকে শুধু মঞ্চে উপস্থাপন নয়, বরং দর্শককে সেই সময়ের পরিবেশের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।

হান, সুই, তাং, সং ও মিং রাজবংশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এ ধরনের পরিবেশনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। রাজদরবারের আনুষ্ঠানিকতা, ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সংগীত, নৃত্য এবং প্রাচীন বাণিজ্যপথের সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক বিনিময় মঞ্চের বিভিন্ন দৃশ্যে উঠে আসে। বিশেষ করে তাং রাজবংশের স্বর্ণযুগের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এখানে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সেই সময় চীনের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সিল্ক রোড ধরে আসা দূত, বণিক ও প্রতিনিধিদের উপস্থিতি চীনা রাজদরবারকে করে তুলেছিল বহুজাতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
পরিবেশনাটিতে এই ঐতিহাসিক আবহ তুলে ধরতে ব্যবহৃত হয় দলগত কোরিওগ্রাফি, রাজকীয় শোভাযাত্রা এবং জমকালো মঞ্চসজ্জা। শিল্পীদের পোশাক ও চলনেও থাকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। এক দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দর্শক যেন ভ্রমণ করেন চীনের ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে।

শোটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ প্রাচীন চীনের ক্যালিগ্রাফি বা লিপিশিল্পের ঐতিহ্য। এর মূল আখ্যানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তাং রাজবংশের বিখ্যাত মন্ত্রী ওয়েই ঝেং এবং প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার ওউয়াং শুনের নাম।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, একটি প্রসিদ্ধ সুপেয় পানির ঝরনাকে কেন্দ্র করে ওয়েই ঝেংয়ের লেখা এবং ওউয়াং শুনের পাথরে খোদাই করা ক্যালিগ্রাফি চীনের শিল্প ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। শোটির মঞ্চায়নে এই ঐতিহ্যকে দৃশ্যমান করার মধ্য দিয়ে লিপিশিল্পের সৌন্দর্যকে বৃহত্তর দর্শকের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ‘মিলেনিয়াম জিউছেং প্যালেস’-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ত্রিমাত্রিক হলোগ্রাফিক প্রক্ষেপণ, চলমান এলইডি পর্দা এবং হাইড্রোলিক ব্যবস্থায় ওঠানামা করা মঞ্চের সাহায্যে দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায়। মুহূর্তের মধ্যে একটি সাধারণ মঞ্চ রূপ নেয় রাজপ্রাসাদের বিশাল দরবারে, আবার পরক্ষণেই সেখানে ফুটে ওঠে প্রাচীন নগর কিংবা সিল্ক রোডের ব্যস্ত পরিবেশ। আলো, শব্দ, সংগীত ও দৃশ্যের সমন্বয় দর্শককে দেয় নিমগ্ন অভিজ্ঞতা।
থিম ও আয়োজন অনুযায়ী এ ধরনের পরিবেশনা সাধারণত ৬০ থেকে ৯০ মিনিট স্থায়ী হয়। এই সময়ের মধ্যে ইতিহাসের নানা অধ্যায়কে সংক্ষিপ্ত অথচ দৃষ্টিনন্দনভাবে উপস্থাপন করা হয়। এখানে ব্যক্তিগত প্রেমের গল্পের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সভ্যতার বিকাশ, রাজকীয় সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ইতিহাস।

‘মিলেনিয়াম জিউছেং প্যালেস’-এর আকর্ষণ তাই কেবল রাজদরবারের জৌলুশে নয়, বরং অতীতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আধুনিক মঞ্চভাষায় প্রকাশ করার প্রচেষ্টায়। ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার সঙ্গে প্রযুক্তির এই সংযোগ ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি চীনের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সম্পর্কেও ধারণা দেয়।
ইতিহাস যখন দর্শনীয় অভিজ্ঞতা
‘ছাং হেন গে’ ও ‘মিলেনিয়াম জিউছেং প্যালেস’ দুটি পরিবেশনার বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনায় পার্থক্য থাকলেও তাদের মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে। দুটিই ইতিহাসকে বইয়ের পাতা থেকে তুলে এনে দর্শকের চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে। প্রথমটি প্রেম, বিরহ ও নিয়তির করুণ আখ্যানকে কেন্দ্র করে আবেগের জগৎ নির্মাণ করে। অন্যটি রাজকীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে তুলে ধরে একটি সভ্যতার বহুমাত্রিক পরিচয়।

দুটি আয়োজনই দেখায়, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে শুধু পুরোনো স্থাপনা কিংবা নিদর্শন রক্ষা করা নয়। নৃত্য, সংগীত, অভিনয় ও প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই ইতিহাসকে মানুষের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দর্শক যখন মঞ্চে কোনো প্রাচীন রাজদরবারের দৃশ্য দেখেন কিংবা কয়েক শতাব্দী আগের কোনো প্রেমের বেদনা অনুভব করেন, তখন ইতিহাস তাঁর কাছে নিছক তথ্য হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে জীবন্ত অভিজ্ঞতা।
চীনের এই দুই পরিবেশনা তাই বিনোদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বিশেষ সুযোগ তৈরি করে। এখানে অতীতের স্মৃতি আর বর্তমানের প্রযুক্তি মিলেমিশে তৈরি করে এমন এক নান্দনিক জগৎ, যেখানে আলো, সংগীত ও নৃত্যের ভাষায় কথা বলে হাজার বছরের সভ্যতা।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































