Apan Desh | আপন দেশ

তোতলামি নয় বাধা, সচেতনতায় বাড়ুক আত্মবিশ্বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১১:১৮, ২২ অক্টোবর ২০২৬

তোতলামি নয় বাধা, সচেতনতায় বাড়ুক আত্মবিশ্বাস

ছবি : সংগৃহীত

তোতলামি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবস। 

কথা বলার সময় শব্দ বা শব্দাংশ বারবার উচ্চারণ করা, কোনো শব্দ টেনে বলা কিংবা কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ আটকে যাওয়াকে তোতলামি বলা হয়। 

এটি একটি যোগাযোগজনিত সমস্যা, যা বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় একজনের রয়েছে।

১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে মাইকেল সুগারম্যানের উদ্যোগে দিবসটি পালনের সূচনা হয়। 

তোতলামি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো, এ বিষয়ে গবেষণায় উৎসাহ দেয়া এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তা নিশ্চিত করাই দিবসটির অন্যতম লক্ষ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তোতলামির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বংশগত বৈশিষ্ট্য, শিশুর বিকাশের ধরন এবং মস্তিষ্কে কথা ও ভাষা প্রক্রিয়াকরণের পার্থক্য। 

তোতলামির সমস্যায় আক্রান্ত প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের পরিবারের অন্য সদস্যেরও একই সমস্যা রয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তোতলামি ফাউন্ডেশন।

বিশ্বে ৮ কোটিরও বেশি মানুষ তোতলামির সমস্যায় ভুগছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রেই এ সংখ্যা ৩০ লাখের বেশি। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে তোতলামির প্রবণতা প্রায় চার গুণ বেশি।

শিশুদের ক্ষেত্রেও এ সমস্যা দেখা যায়। প্রায় ৫ শতাংশ শিশু জীবনের কোনো এক পর্যায়ে অন্তত ছয় মাস তোতলামির সমস্যায় ভোগে। তাদের মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পরবর্তী শৈশবে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে শুরু করে। তবে প্রায় এক শতাংশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

তোতলামি মানেই মানসিক বা আবেগজনিত সমস্যা নয়। শিশু কিংবা প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এ সমস্যার সঙ্গে মানসিক জটিলতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, এমন প্রমাণ নেই। একইভাবে মানসিক আঘাতকে তোতলামির কারণ বলেও মনে করা হয় না।

শিশুর কথা বলার সময় তোতলামি দেখা দিলে শুরু থেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সমস্যা তিন থেকে ছয় মাসের বেশি স্থায়ী হলে কিংবা শুরু থেকেই বেশি মাত্রায় দেখা দিলে বাক্‌ ও ভাষা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত। উপযুক্ত বাক্‌চিকিৎসার মাধ্যমে শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্করাও কথা বলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করতে পারেন।

তোতলামি নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো, আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করা, শিশুদের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা এবং এ বিষয়ে গবেষণা এগিয়ে নেয়াই আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবসের মূল উদ্দেশ্য। 

যেসব কারণে তোতলামি হয় : তোতলামি হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে বিভিন্ন কারণেই এটি হতে পারে। 

তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণ-

১. ছোটবেলা থেকে খুব বেশি আতঙ্কিত বা উদ্বিগ্ন থাকতে হলে।

২. শৈশবে কঠোর শাসনের ফলে।

৩. আচমকা শারীরীক বা মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে।

৪. অতি দ্রুত কথা বলার অভ্যাসের ফলে।

৫. ভাবনা আর কথা বলা দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য না হলে।

৬. শৈশবে কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে ভয় পেলে এবং বারবার ওই ব্যক্তির সম্মুখীন হলে।

৭. শৈশবে কোনো অভ্যাস জোরপূর্বক বদল করলে।

৮. শৈশবে বাবা মা বা আপনজন ছাড়া একা কাটানোর জন্যও হতে পারে।

৯. ভয়ঙ্কর কোনো দুর্ঘটনার সম্মুখীন হলে।

১০. প্রথম প্রথম স্কুলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নেতিবাচক না হলে।

১১. কোনো রোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়। যেমন দীর্ঘকালীন জ্বর।

১২. মস্তিষ্কে আঘাত পেলেও হতে পারে।

কারও কারও বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সমস্যা বেড়ে যায়, যেমন-

>> নতুন পরিবেশ।

>> অপরিচিত মানুষের মুখোমুখি হওয়া।

>> নিজের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বর বলার সময়।

>> ক্লাসে শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে।

>> মৌখিক পরীক্ষায়।

>> পরীক্ষার সময়।

>> শারীরিক দুর্বলতায় বা বেশি ক্ষুধার সময়।

>> হঠাৎ করে কোনো বিপদে পড়লে।

>> চাকরির ইন্টারভিউয়ের সময়।

>> রেগে গেলে বা ঝগড়া করার সময়।

>> মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে ও প্রচণ্ড ভয় পেলে।

তবে নিজের কমফোর্ট জোনের মধ্যে কথা বললে, মেজাজ ভঅলো থাকলে ও লোকে কী ভাববে এটা ভুলে কথা বলতে পারলে তোতলামি কমে যায়।

আরও পড়ুন <> জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস : স্বপ্নের নিরাপদ সড়ক বাস্তব হবে কবে?

এ সমস্যার সমাধান কী : তোতলামি দূর করা আসলেই কঠিন নয়। তবে সারানোর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত যে কোনো মূল্যে এই সমস্যা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে। এবং একজন অভিজ্ঞ মেন্টরের তত্ত্বাবধানে সঠিক নিয়মে প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী প্রাকটিসগুলো করলে সহজেই তোতলামি দূর হয়।

প্রথম ২/৩ দিন যথাযথভাবে প্রাকটিস করলে আত্মবিশ্বাস অনেকটাই ফিরে আসে। এভাবে ২০/২৫ দিন নিয়মিত প্রাকটিস করলে কথা বলাও বেশ সাবলীল হওয়া শুরু হয়। এসময় ধৈর্য সহকারে নিয়মিত প্রাকটিস করতে হবে।

তবে তোতলামি দূর করার এই প্রক্রিয়া যত কম বয়সে করা যায় ততই ভালো। যদিও যে কোনো বয়সেই শুরু করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা যতদিন বহন করে ততদিন মানসিক যন্ত্রণা পোহাতে হয়, লজ্জিত হতে হয়, অপমান অপদস্থ হতে হয়। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি সমস্যার সমাধান করা যায় ততই মঙ্গল।

সকল অভিভাবককে বলব, আপনার বাচ্চার যদি এরকম সমস্যা দেখা যায় তাহলে তাকে বকাবকি করবেন না। কোনো টোটকার আশ্রয় নেবেন না, অবৈজ্ঞানিক কোনো কিছুতে ভরসা করবেন না। যেখানে গেলে সত্যিকার অর্থে তোতলামি ভালো হয় খোঁজ নিয়ে তাদের পরামর্শমতো ব্যবস্থা নেবেন। এতে পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডল তাদের জন্য সুখকর হবে। যোগ্যতার জয় হবে। সূত্র: আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবস, স্টাটারিং হেল্প অর্গানাইজেশন

 

আপন দেশ/এমটিআই

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়