ফাইল ছবি
পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত কোনো সম্পত্তির মালিকানা দাবি নিয়ে করা মামলা গ্রহণের এখতিয়ার দেওয়ানি আদালতের নেই। পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ডের মাধ্যমে রেজিস্টার্ড কবলা দলিলে হস্তান্তরের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেও দেওয়ানি আদালতে মামলা করা যাবে না। এমন রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত বলেছেন, এ ধরনের সম্পত্তির মালিকানা বা স্বত্বসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইন অনুযায়ী নির্ধারিত বিশেষ আদালত তথা ‘কোর্ট অব সেটেলমেন্টে’ যেতে হবে।
‘সমীরেন্দ্র গুহ রায় বনাম শাবানা খাতুন ও অন্যান্য’ মামলার রায়ে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পরিত্যক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত একটি সম্পত্তির মালিকানা দাবি ও দখল পুনরুদ্ধারসংক্রান্ত মামলায় করা ফাস্ট আপিল মঞ্জুর করে অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল করেছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২৩ আগস্ট এ রায় দেন। ১০ পৃষ্ঠার রায়টির পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত ২৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
আদালতে আপিলকারীর পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. সুমন আলী। বিবাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ ইউনুস। মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান।
যেভাবে বিরোধের সূত্রপাত
রাজবাড়ী সদর উপজেলার এসএ খতিয়ান নম্বর ১৬৪-তে অন্তর্ভুক্ত আবদুল জব্বারের মালিকানাধীন একটি বসতভিটা ও জমি নিয়ে এ বিরোধের সূত্রপাত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অবাঙালি আবদুল জব্বার ও তার স্ত্রী নিহত হন। সে সময় তাদের এক বছর বয়সী শিশু সন্তান শাবানা খাতুন বেঁচে যান। পরে ফরিদপুরের শেখ বশির মিয়ার পরিবার তাকে লালন-পালন করে এবং বিয়ে দেয়।
এদিকে, ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির ১৬ নম্বর আদেশের আওতায় ওই সম্পত্তিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করে সরকার। পরবর্তী সময়ে সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১৯৯৪ সালের ৯ এপ্রিল রেজিস্টার্ড কবলা দলিলে সম্পত্তিটি সমীরেন্দ্র গুহ রায়ের কাছে বিক্রি করা হয়। এরপর থেকে তিনি পরিবারসহ ওই সম্পত্তিতে বসবাস শুরু করেন।
তবে ওই জমির উত্তরাধিকারী দাবি করে ১৯৯৮ সালের ৩ জুন রাজবাড়ীর ১ নম্বর সহকারী জজ আদালতে সমীরেন্দ্র গুহ রায়সহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে স্বত্ব ঘোষণার মামলা (টাইটেল স্যুট) করেন শাবানা খাতুন।
মামলার আরজিতে শাবানা নিজেকে আবদুল জব্বারের একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী দাবি করেন। তিনি সমীরেন্দ্র গুহ রায়ের নামে সম্পাদিত কবলা দলিল অবৈধ ঘোষণার পাশাপাশি ৯ দশমিক ১৮ শতক জমির স্বত্ব ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের আবেদন জানান।
শাবানার দাবি ছিল, এসএ খতিয়ান নম্বর ১৬৪-তে আবদুল জব্বারের নামে জমির রেকর্ড ছিল। সেখানে তাদের বসতবাড়ি ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাবা-মা নিহত হওয়ার পর তিনি এক বছর বয়সী শিশু হিসেবে বেঁচে যান। নিঃসন্তান শেখ বশির মিয়া তাকে ফরিদপুরে নিজের বাড়িতে নিয়ে লালন-পালন করেন। পরবর্তী সময়ে বিয়ে দেন।
আরও পড়ুন <<>> বিকাশ-নগদ-রকেটের চার্জ নিয়ে হাইকোর্টে শুনানি মঙ্গলবার
তবে তার বিয়ের কাবিননামায় নাম ফাতেমা খাতুন এবং পিতার নাম বশির মিয়া উল্লেখ রয়েছে। শাবানার আরও দাবি ছিল, রাষ্ট্রপতির ১৬ নম্বর আদেশ অনুযায়ী সম্পত্তিটি পরিত্যক্ত ঘোষণার যোগ্য ছিল না। ১৯৯৭ সালে সমীরেন্দ্র গুহ রায় জোরপূর্বক ওই জমিতে প্রবেশ করেন।
অন্যদিকে, অধস্তন আদালতে পৃথক লিখিত জবাব দিয়ে বিবাদীরা দাবি করেন, রাষ্ট্রপতির ১৬ নম্বর আদেশ অনুযায়ী সম্পত্তিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় সমীরেন্দ্র গুহ রায়ের নিজের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায় এবং তার বড় ভাই নিহত হন। এরপর তিনি পরিত্যক্ত ওই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। সরকার প্রথমে তাকে বাড়িটি বরাদ্দ দেয় এবং পরবর্তী সময়ে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়ে গেজেট প্রকাশ করে। কোনো দাবি না আসায় সরকার তার অনুকূলে রেজিস্টার্ড সাফ কবলা দলিল সম্পাদন করে।
অধস্তন আদালতের রায় ও হাইকোর্টে আপিল
মামলার আরজি, বিবাদীদের লিখিত জবাব, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে ২০০০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর শাবানা খাতুনের পক্ষে রায় ও ডিক্রি দেন রাজবাড়ীর যুগ্ম জেলা জজ আদালত।
ওই রায় ও ডিক্রিতে সংক্ষুব্ধ হয়ে একই বছর হাইকোর্টে ফাস্ট আপিল করেন সমীরেন্দ্র গুহ রায়। আপিলের শুনানিতে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শোনেন। মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, অধস্তন আদালতের বাদী শাবানা খাতুন নিজেকে আবদুল জব্বারের মেয়ে ও বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
এছাড়া আদালত বলেন, কোনো সম্পত্তিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা। পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ড কর্তৃক রেজিস্টার্ড কবলা দলিলের মাধ্যমে ওই সম্পত্তি হস্তান্তরের বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে কোনো মামলা হলে তা গ্রহণের এখতিয়ার দেওয়ানি আদালতের নেই। এ ধরনের সম্পত্তির মালিক বা তাদের উত্তরাধিকারীদের দাবি ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সরকার বিশেষ আদালত তথা ‘কোর্ট অব সেটেলমেন্ট’ গঠন করেছে।
আদালত আরও বলেন, আবদুল জব্বারের কোনো প্রকৃত উত্তরাধিকারী থাকলে এবং আইনের অন্য কোনো বিধানে তার দাবি বাধাগ্রস্ত না হলে, তিনি যথাযথ প্রতিকার চেয়ে উপযুক্ত আদালত তথা কোর্ট অব সেটেলমেন্টে যাওয়ার স্বাধীনতা রাখেন।
রায়ে আদালত বলেন, মামলার ঘটনা, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও নথিপত্রের উপাদান বিবেচনায় ফাস্ট আপিলের যথেষ্ট সারবত্তা রয়েছে। ফলে আপিলটি মঞ্জুর করা হলো।
একই সঙ্গে ২০০০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর যুগ্ম জেলা জজ আদালতের দেয়া রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন হাইকোর্ট। অবিলম্বে অধস্তন আদালতের নথি ফেরত পাঠানোর নির্দেশও দেয়া হয়েছে।
আপন দেশ/এসএস
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































