খলিলুর রহমান ভুঞা। ছবি : আপন দেশ
ডাক বিভাগের ঢাকা দক্ষিণ মেট্রো সার্কেলে ২০০৪ সালে যোগদান করেছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা খলিলুর রহমান ভুঞা। পদ ছিল পোস্টাল অপারেটর। রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট ডাকঘরে কর্মরত এ ধূর্ত কর্মচারির একক আধিপত্যে ডাক বিভাগে গড়ে উঠেছে এক অঘোষিত, ভয়াল ও আতঙ্কের রাজত্ব।
সাবেক ও পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ও নিপীড়নমূলক শাসনামলে ডাক বিভাগের সাধারণ কর্মচারিদের ওপর খলিলের দোর্দণ্ড প্রতাপ ছিল এক বিষাদময় বাস্তবতা। ‘অমুক প্রভাবশালী মন্ত্রী’ কিংবা ‘তমুক ডাকসাইটে নেতা’র ভুয়া ও বানানো পরিচয় ভাঙিয়েছেন। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা তোয়াক্কা না করে ভাগিয়ে নিতেন মোক্ষম সব পোস্টিং। কেবল নিজের ভাগ্য বদলই নয়, মোটা অঙ্কের গোপন অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে অন্যদেরও নিশ্চিত করে দিতেন কাঙ্ক্ষিত ‘প্রাইজ পোস্টিং’।
দাফতরিক পদমর্যাদায় তিনি স্রেফ নগণ্য একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারি। কিন্তু চালচলনে তার বাহ্যিক যাপন রীতিমতো রাজকীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ। ১২তম গ্রেডের স্কেল অনুযায়ী তার সর্বোচ্চ মূল বেতন মাত্র ২৭ হাজার ৩০০ টাকা এবং সর্বসাকুল্যে ভাতা পান মাত্র ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। অথচ বাস্তবে তিনি কোটি কোটি টাকার এক বিশাল ও রহস্যময় সাম্রাজ্যের অধিপতি।

বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে আউটসোর্সিং নিয়োগে জঘন্য দুর্নীতি, লাভজনক প্রকল্প বাণিজ্য ও বদলি সিন্ডিকেট চতুরতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করে তিনি হাতিয়েছেন অবৈধ সম্পদের পর্বতসম পাহাড়। সরকারি চাকরি বিধিমালার কঠোর বিধানগুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সমান্তরালে চালিয়ে যাচ্ছেন বিশাল সব ব্যবসাও। প্রশ্ন উঠেছে- একজন সাধারণ তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারি রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হলেন কোন আলাদিনের চেরাগের বলে?

স্বভাবে চরম ধূর্ত ও বর্ণচোরা খলিল ভুঞার ভোল পাল্টাতে এক মুহূর্তও সময় লাগে না। নিজের হীন স্বার্থ হাসিলে তিনি যেকোনো মানুষের পা ধরতে দ্বিধা করেন না, আবার প্রয়োজন ফুরালে দেন নির্মম ও আছাড়সম ধাক্কা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার মসনদে বসার পর থেকেই খলিল হয়ে ওঠেন সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রতিরোধ্য। নানা বাহানায় তৎকালীন বিতর্কিত ডাক ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, মাদারীপুরের তৎকালীন এমপি আব্দুস সোবহান গোলাপ, সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের পুত্র রেদওয়ান আহমেদ তৌফিক, নাজমুল আহসান পাপন, তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী আহসানুল হক টিটো এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত আ’লীগের মহানগর সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদসহ ডজনখানেক প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও বলদর্পী নেতার সঙ্গে গড়ে তোলেন সুগভীর ও নিবিড় সখ্যতা।

আওয়ামী লীগের প্রতিটি রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলেও ছিল তার রাজপথ কাঁপানো সক্রিয় উপস্থিতি। এমনকি ডিবি পুলিশের বিতর্কিত ও আলোচিত কর্মকর্তা হারুন অর রশীদও (ডিবি হারুন) হয়ে ওঠেন তার চরম 'কাছের মানুষ'। ক্ষমতার এ দুর্ভেদ্য বলয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিরীহ ডাক কর্মচারিদের ওপর অবিরত ভয়ভীতি ছড়াতেন খলিল। এ কায়েমি স্বার্থান্বেষী চক্রের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই জুটত চরম প্রশাসনিক হয়রানি ও মানসিক নির্যাতন। স্বৈরাচারপন্থী পোস্টম্যানদের সংগঠিত করে গড়ে তোলেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যার স্বঘোষিত সভাপতি তিনি নিজে। ডাক বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে খলিল নিয়মিত ২ থেকে ৩ শতাংশের মোটা অঙ্কের কমিশন কেটে নিতেন।
এছাড়া জালিয়াতিপূর্ণ আউটসোর্সিং নিয়োগ, কেনাকাটা, টেন্ডার বাণিজ্য এবং সঞ্চয়পত্র জালিয়াতি ছিল তার অবৈধ উপার্জনের মূল চালিকাশক্তি। আউটসোর্সিংয়ের নামে নিয়োগ দেন স্বজনপ্রীতি করে নিজের নিকটাত্মীয় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট টিএসও’র পোস্টম্যান মো: ইমরান মিয়াকে। এছাড়া বনানী পোস্ট অফিসের মো: আসিফুল ইসলাম, খিলক্ষেত টিএসও’র রানার মোঃ আতিকুল ইসলাম জিহাদ, মোহাম্মদপুর টিএসও’র রানার মো: আলমগীর, খিলগাঁও টিএসও’র প্যাকার তাকলিমা আক্তার ও গুলশান টিএসও’র রানার মো: মামুনুর রশীদকে চাকরি দেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, এদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে ২ লাখ টাকা করে ঘুষ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সব পোস্ট অফিসে তার বসানো অনুগত লোকগুলো এখনো বহাল তবিয়তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

মাসিক আয় সর্বসাকুল্যে ৩০-৩২ হাজার টাকা হলেও খলিলের বসবাস বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এফ ব্লকের ১৫/এ সড়কের ৫২১ নম্বর ভবনে, যার ভাড়া মাসে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। যাতায়াত করেন ৪৫ লাখ টাকা দামের রাজকীয় ব্যক্তিগত গাড়িতে (ঢাকা মেট্রো গ-৪৩-৮৯৭৩)। কেবল গাড়িই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন লাভজনক রুটে তার নিজস্ব ৫২ সিটের অন্তত ৪টি বিশাল বাস চলছে। এর মধ্যে 'ঢাকা মেট্রো-১১-এ-৭৩২০' বাসটি 'স্টাফ বাস' হিসেবে চলাচল করে তার বিভাগেই। ‘ভিআইপি পরিবহন' লাইনে একটি বাস নিউমার্কেট-গাজীপুর এবং আরও দুটি বাস চলছে 'অনাবিল' নামে। জন্মস্থান কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে হাঁকিয়েছেন কোটি টাকার ডুপ্লেক্স বাড়ি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর খলিল কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি অসাধু কর্মচারিদের সংগঠিত করে পুনরায় প্রকাশ্যে সরব হচ্ছেন এ ধূর্ত সিন্ডিকেট প্রধান। চরম শঙ্কার বিষয় হলো, ডাক বিভাগের 'ডাকাত' খ্যাত এ ফ্যাসিস্টের দোসর খলিলুর রহমান ভুঞার এ বেপরোয়া সিন্ডিকেট রুখবে কে?

এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আপন দেশ’কে বলেন, অভিযোগগুলো সত্য হলে এতদিন তিনি কীভাবে নির্বিঘ্নে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেন- সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তিনি বলেন, তার ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণ, গাড়ি ও বাসের মালিকানা, সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা ব্যবসায়িক স্বার্থ, নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি, বদলি আদেশ এবং প্রকল্প-টেন্ডারের কাগজপত্র যাচাই করলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।
একজন সরকারি কর্মচারির বৈধ আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে বাস্তব জীবনযাপনের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকলে সেটি কেবল গুঞ্জনের বিষয় নয়- প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানের বিষয়। ডাক বিভাগ কতো দুর্নীতিমুক্ত বা দুর্নীতিপরায়ন তার কিছুটা চিত্র মিলে এসব কর্মচারীদের জীবনমান দেখলেই। বিষয়গুলো দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদকের কতিয়ে দেখা উচিৎ বলে মনে করেন ড. বদিউল আলম মজুমদার।
খলিলুর রহমানের বক্তব্য
প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগের বিষয়ে লিখিতভাবে মোহাম্মদ খলিলুর রহমান ভুঞার বক্তব্য চাওয়া হয়। তবে ফোনে তিনি দাবি করেন, ডাক বিভাগে হয়তো তিনি তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারি তবে পৈত্রিকভাবেই তিনি বহু সম্পদের মালিক। সরকারি চাকরিবিধি মেনেই তিনি ব্যবসা করছেন বলেও মৌখিক দাবি করেন। প্রকাশিত ছবি এআই দিয়ে তৈরী বলে খলিলের দাবি। বদলি, টেন্ডার, পদেতান্নতি এসবে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
আপন দেশ/এবি
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































