ছবি: আপন দেশ
ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের শিকার কক্সবাজারের ইনানিতে মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় অবস্থিত টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। গত জুন মাসেই রেস্টুরেন্টটিকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে ফায়ার সার্ভিসের সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
এ সময় তিনি দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় রিসোর্ট ও হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, অনুমোদনহীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা এবং ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে মহাপরিচালক জানান, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনাবশত অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। ঘটনাস্থলটি সংশ্লিষ্ট ফায়ার স্টেশন থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। আগুন নেভানোর কাজ শেষ হলেও এরই মধ্যে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে কোনো কারণ উল্লেখ করা ঠিক হবে না। অনুমানের ভিত্তিতে কোনো বক্তব্য দিলে তা তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে রিসোর্টটির নিচতলায় রেস্টুরেন্ট থাকা এবং স্থাপনাটি কাঠের তৈরি হওয়ায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার ধরন নিয়ে ধারণা করা সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে কী কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা তদন্তের ফলাফল পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
মহাপরিচালক জানান, ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটি অধিদফতরের কোনো লাইসেন্স নেয়নি। গত জুন মাসে ফায়ার সার্ভিসের একজন পরিদর্শক সেখানে গিয়ে অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি দেখতে পান। পরে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে নোটিশ দেয়া হয়। কিন্তু সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ না করে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় গড়ে ওঠা রিসোর্ট ও হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন শ্রেণির পর্যটকের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়। অনেক রিসোর্ট তিনতলাবিশিষ্ট। এসব ভবনের নিচতলায় রেস্টুরেন্ট থাকে, যেখানে খাবার তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা থাকে। ফলে একই ভবনে রান্নার কার্যক্রম ও আবাসনের ব্যবস্থা থাকলেও যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ অনেক রিসোর্ট ফায়ার সার্ভিসের তদারকির আওতায় নেই এবং প্রয়োজনীয় সনদও গ্রহণ করেনি।
আরও পড়ুন<<>>কক্সবাজারে রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত বেড়ে ১০
অনুমোদনহীন রিসোর্ট ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হবে। পাশাপাশি পর্যটন এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং প্রয়োজন হলে সেগুলো বন্ধ করার বিষয়ে তিনি বলেন, জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পর্যাপ্ত সড়ক ও অবকাঠামোর অভাব অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম পরিচালনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অনেক এলাকায় ভবনগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে। এতে আগুন লাগার পর অগ্নিনির্বাপণকারী যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, নতুন ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলতে সংশ্লিষ্টদের বারবার সচেতন করা হচ্ছে। ভবন নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় বিধিবিধান অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে আগে থেকেই ঘনবসতি গড়ে ওঠা এলাকাগুলোতে বিদ্যমান অবকাঠামোতে হঠাৎ করে সব ধরনের পরিবর্তন আনা কঠিন। এ জন্য সময়ের প্রয়োজন। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে কীভাবে মানুষের কাছে দ্রুত অগ্নিনির্বাপণ সেবা পৌঁছানো যায়, সে বিষয়ে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস।
অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে বিশেষ ধরনের থ্রি-হুইলার যানবাহন আনার পরিকল্পনার কথাও জানান মহাপরিচালক। পাশাপাশি মোটরসাইকেলের মাধ্যমে হোস পাইপ বহন করে বিভিন্ন স্থানে আগুন নেভানোর কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। কোনো ভবনে নিজস্ব পানির রিজার্ভার থাকলে সেখান থেকে পানি সংগ্রহ করে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম পরিচালনার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো এবং সহজে আগুন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
ফায়ার সার্ভিসের স্টেশনসংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণের লক্ষ্যে ১৩০টি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় নতুন স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উখিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা এবং কক্সবাজারের মতো পর্যটন অঞ্চলে অগ্নিনির্বাপণ সেবা আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় পর্যায়ক্রমে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মহাপরিচালক বলেন, দেশের অনেক এলাকায় শপিং কমপ্লেক্স, দোকানপাট, হোটেল ও আবাসিক ভবন ঘনবসতিপূর্ণভাবে নির্মিত হয়েছে। বিশেষ করে পর্যটন এলাকাগুলোতে একটি হোটেলের সঙ্গে আরেকটি হোটেল ঘেঁষে থাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ে। এমন পরিস্থিতিতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস তাদের বিদ্যমান পরিকল্পনা আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে।
অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে জনসচেতনতাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ সচেতন হলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। পর্যটন এলাকায় ধূমপান, আগুনের ব্যবহার এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে আগুন ব্যবহার করতে দেখলে অন্যদেরও প্রতিবাদ করা উচিত। রেস্টুরেন্ট, রিসোর্ট কিংবা অন্য কোনো স্থাপনা নিরাপদ না হলে সেখানে অবস্থানের ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
আপন দেশ/জেডআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































