Apan Desh | আপন দেশ

জামালপুর ডায়াবেটিক হাসপাতাল: সেবার আড়ালে ‘বাণিজ্য সাম্রাজ্য’! 

শওকত জামান, জামালপুর প্রতিনিধি, আপন দেশ

প্রকাশিত: ১৪:৩৭, ২৭ জুলাই ২০২৬

আপডেট: ২১:১৮, ৩০ জুলাই ২০২৬

জামালপুর ডায়াবেটিক হাসপাতাল: সেবার আড়ালে ‘বাণিজ্য সাম্রাজ্য’! 

ফাইল ছবি, আপন দেশ

মানবসেবার মহান লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জামালপুর ডায়াবেটিক হাসপাতাল। সমাজসেবা অধিদফতরের সহায়তায় গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল ডায়াবেটিসে আক্রান্ত সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সে সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটিই এখন ক্ষমতার অপব্যবহার, গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন, আর্থিক অস্বচ্ছতা, অনিয়ম এবং বাণিজ্যিকীকরণের গুরুতর অভিযোগে আলোচিত। 

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের প্রভাব বিস্তারের পর থেকেই হাসপাতালটির মূল চরিত্র বদলে যেতে শুরু করে। বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে থাকলেও হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ এখনো তার অনুসারীদের হাতেই রয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালের নির্বাচিত পরিচালনা কমিটিকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়  জামালপুর ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল। পরে সভাপতি করা হয় মির্জা আজমকে এবং সাধারণ সম্পাদকের পুনরায় দায়িত্ব দেয়া হয়  সৈয়দ তরিকুল ইসলামকে। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী, তৎকালীন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ চৌধুরীকে যুগ্ন-সাধারন সম্পাদকের পদে বসিয়ে হাসপাতালটি নিয়ন্ত্রণ করেন। সে সময় থেকেই হাসপাতালটি ধীরে ধীরে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থেকে বাণিজ্যিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতালে চালু করা হয় বৈকালিক চিকিৎসাসেবা। ডায়াবেটিসের বাইরে প্রায় সব ধরনের রোগের চিকিৎসা শুরু হয়। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের এনে রোগী দেখানো, উচ্চ ভিজিট ফি আদায় এবং রোগীদের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর অভিযোগও রয়েছে। এতে সমাজসেবামূলক হাসপাতালটি কার্যত একটি বাণিজ্যিক ডায়াগনস্টিক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মির্জা আজম ও ফারুক আহমেদ চৌধুরী প্রকাশ্যে না থাকলেও হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগপন্থী চিকিৎসক প্রফেসর ড.এস এম জাহিদ হোসেন, রবিকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি  ও সৈয়দ তারিকুল ইসলামকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি পুর্ণগঠন করা হয়েছে। ২১ সদস্যের কমিটির সিংহভাগ সদস্য আওয়ামীলীগের সমর্থক মির্জা আজমের অনুসারী।

পরিচালক থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে এখনো রয়েছেন আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা। তাদের মাধ্যমেই পরোক্ষভাবে হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. হাফিজুর রহমান লিটনের পেশাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি নিজেকে হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দিয়ে ক্যান্সার, থ্যালাসেমিয়াসহ বিভিন্ন রক্তরোগের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। তবে তার বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় পরিচালকসহ আটজন চিকিৎসকের এমবিবিএস ও বিশেষজ্ঞ ডিগ্রির সনদ সাত দিনের মধ্যে জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পরিচালকের কক্ষ অধিকাংশ সময় ফাঁকা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে তিনি অন্য চিকিৎসকদের মতো রোগী দেখেন এবং বৈকালিক চেম্বারে রোগীপ্রতি ৫০০ টাকা ভিজিট নেন।

এ বিষয়ে ডা. হাফিজুর রহমান  লিটন আপন দেশ’কে বলেন, তিনি এফসিপিএস পাস না করলেও ফাইনাল পার্ট পরীক্ষা দিয়েছেন এবং বিদেশ থেকে কয়েকটি অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করেছেন। তবে বাংলাদেশে এসব অনলাইন কোর্স বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে স্বীকৃত কিনা- সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তিনি আরও দাবি করেন, তাকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়নি; পরিচালক না থাকায় তিনি সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আরও পড়ুন<<>>জামালপুরে এক অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, হাসপাতাল পরিচালনাকারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ তারিকুল ইসলাম প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একই পদে বহাল রয়েছেন। অথচ সমাজসেবা অধিদফতর অনুমোদিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালনা কমিটির মেয়াদ দুই বছর এবং একই ব্যক্তি টানা দুই মেয়াদের বেশি সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক থাকতে পারেন না।

একাধিক সাবেক সদস্যের অভিযোগ, ক্ষমতা ধরে রাখতে বিভিন্ন সময়ে গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হয়েছে এবং সাধারণ সদস্যদের মতামতের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তই প্রতিষ্ঠানের নীতিতে পরিণত হয়েছে।

দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়ার শর্তে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে কতজন রোগী সে সুবিধা পেয়েছেন, তার কোনো প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। রোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য সেবার খরচ এখন অনেক বেসরকারি হাসপাতালের সমপর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে হাসপাতালটির সেবামূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি আইসিইউ ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। অনুদানের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কেন হয়নি। ব্যয়ের হিসাব কেন প্রকাশ করা হয়নি- এসব বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আইসিইউ প্রকল্পে আর্থিক ও কারিগরি অডিট করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, দৈনিক আয়-ব্যয়ের প্রচলিত রেজিস্টারের পরিবর্তে অধিকাংশ হিসাব সফটওয়্যারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, ফলে স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতি বছর নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও তা কতটা নিয়মমাফিক হয়েছে, সে বিষয়েও রয়েছে সংশয়। হাসপাতালের আয়, অনুদান, ব্যাংক হিসাব, উন্নয়ন ব্যয় ও ক্রয়সংক্রান্ত নথিপত্রের ফরেনসিক অডিট হলে বহু অনিয়ম বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্রয়প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও মালামাল কেনা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক কোটেশন গ্রহণের বিধানও অনুসরণ করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে একই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকায় ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সীমিত। পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না বলেও তারা অভিযোগ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ তারিকুল ইসলাম দাবী করে আপন দেশ’কে বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। নেতৃত্ব দিতে না পেরে একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অন্যন্য অভিযোগ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি।

জামালপুরের সিভিল সার্জন, ডা: আজিজুল হক বলেন, এ হাসপাতালে অনিয়ম,দূর্ণীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের কাছেও অভিযোগ এসেছে। হাসপাতালটি পরিদর্শনে গিয়েও এসব আমার নজরে পড়েছে। ওই হাসপাতাল যাকে পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে, তার পরিচালক হতে যে যোগত্যা প্রয়োজন সেটি নেই।

সিভিল সার্জন অফিস থেকে বিশেষজ্ঞের ডিগ্রিসহ অন্যন্য কাগজ পত্র তলব করা হয়েছিল। তিনি যেসব কাগজপত্র জমা দিয়েছিল তা বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদফতরে গ্রহনযোগ্য নয়। তিনি আরো বলেন, অনিয়ম,দূর্নীতি অব্যবস্থাপনা বিষয়ে তদন্ত স্বাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সাবেক সভাপতি মির্জা আজম ও সাধারন সম্পাদক আত্মগোপনে থাকায় তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন, ক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ, চিকিৎসকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, আইসিইউ প্রকল্পের অগ্রগতি, আর্থিক অস্বচ্ছতা এবং সরকারি অনুদানের ব্যবহার নিয়ে ওঠা অভিযোগ এখন জামালপুরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। জনসেবার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি হাসপাতাল কীভাবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো তার উত্তর খুঁজতে জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদফতর, স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।

আপন দেশ/জেডআই/এবি

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়