Apan Desh | আপন দেশ

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা, ১০ ব্যাংকেই ৭২ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, আপন দেশ 

প্রকাশিত: ১৯:৫৮, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপডেট: ১৯:৫৮, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা, ১০ ব্যাংকেই ৭২ শতাংশ

ছবি: ফাইল ছবি

ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের (এনপিএল) পরিমান ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এই টাকার ৭২ শতাংশের বেশি রয়েছে ১০টি ব্যাংকেই। চলতি বছরের জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে। 
 
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি।

মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপির অংক বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

জুন শেষে এই দুর্বল ১০টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। এর অর্থ হলো, পুরো ব্যাংকখাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই কেন্দ্রীভূত রয়েছে এ খাতের মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ ব্যাংকে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, দেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট সব ব্যাংকে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। বরং দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, প্রভাবশালী গ্রাহকদের ঋণ সুবিধা দেওয়া, ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারা এবং আদায়ে ব্যর্থতার কারণে কয়েকটি ব্যাংকের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে, বড় করপোরেট ঋণের একটি অংশ বছরের পর বছর আদায় না হওয়ায়—এসব ব্যাংকের সম্পদের মান দ্রুত অবনতি হয়েছে। অনেক ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করার পরও শেষপর্যন্ত খেলাপি হয়ে পড়ছে। ফলে কাগজে-কলমে ঋণের মান ঠিক রাখার বিভিন্ন উদ্যোগও সংকটকে স্থায়ীভাবে ঠেকাতে পারছে না।

মূল্যায়নে অবনতি 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও ব্যাংকিং খাতের সম্পদের মানের বড় ধরনের অবনতির বিষয়টি উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের 'ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট- ২০২৫' অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকখাতে মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ হয়। এক বছর আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এ হার ছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ।

এরপর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে। জুন শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায়—ব্যাংকগুলোর মূলধন, প্রভিশন সংরক্ষণ ও মুনাফার ওপরও চাপ বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ আদায় জোরদার, ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোর তদারকি এবং ব্যাংকের সম্পদের মান যাচাইয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার, একীভূতকরণ ও পুনর্গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার মতো কারণে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। মার্চ ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের মতে, ব্যাংকিংখাত বাংলাদেশের মোট আর্থিক খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পদের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতা শুধু আমানতকারী বা ব্যাংকের নিজস্ব আর্থিক অবস্থার বিষয় নয়; এর প্রভাব বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও পড়ে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক বলেন, "শুধু নতুন করে ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে এ সংকট সমাধান করা যাবে না। যেসব ঋণ দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী রয়েছে, সেগুলোর প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং দ্রুত আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।"

একই সঙ্গে নতুন করে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই, ঋণের ব্যবহার পর্যবেক্ষণ এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় কয়েকটি ব্যাংকের সংকট ধীরে ধীরে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।  

দশ ব্যাংকের চিত্র

জুন শেষে সর্বোচ্চ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংকে, যা তাদের মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বড় অংশই এস আলম গ্রুপ সংশ্লিষ্ট। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ এ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর্যন্ত গ্রুপটির নেওয়া ঋণের বড় অংশই এখন খেলাপি।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংকে, যা তাদের দেওয়া মোট ঋণের ৭৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপি হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ। এ ছাড়া এস আলম গ্রুপ ও এননটেক্স-ও বড় খেলাপি।

খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে একীভূত ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ ও এক্সিম ব্যাংকের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। এসব ব্যাংকের বড় খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদারসহ কয়েকটি গ্রুপ।

ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ ও এবি ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৪০ শতাংশ ঋণ খেলাপি।

এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে জজ ভূঁইয়া গ্রুপ, জাকিয়া গ্রুপ, মুহিব স্টিল অ্যান্ড শিপ রিসাইক্লিং, মুন গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। 

আপন দেশ/মিম 

 

মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়