Apan Desh | আপন দেশ

ঢাকায় কাছাকাছি, পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ঘিরে শঙ্কা-উত্তেজনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩:১৮, ২৮ জুলাই ২০২৩

আপডেট: ১৩:৫৬, ২৮ জুলাই ২০২৩

ঢাকায় কাছাকাছি, পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ঘিরে  শঙ্কা-উত্তেজনা

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছেই। দেশের বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনড় অবস্থানে সংকট সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণই দেখা যাচ্ছে। এখন রাজপথ দখলে ব্যস্ত দুই দল। একইসঙ্গে আছে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও। 

কয়েক মাস ধরে একই দিনে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করে আসছে দুই দল। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে উত্তেজনা।

আজ শুক্রবার (২৮ জুলাই) রাজধানীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বড় ধরনের সমাবেশ হতে যাচ্ছে। সরকারের পদত্যাগসহ নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক দফা দাবিতে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে শরীক আরও ৩৭ দল। রাজধানীর ১১টি স্থানে আজ সমাবেশ করবে এসব রাজনৈতিক দল।

দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের কাছাকাছি স্থান ও সময়ে এই পাল্টাপাল্টি সমাবেশ আয়োজনের প্রভাব পড়েছে নগরের জনজীবনে। তৈরি হয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা। জনমনে বিরাজ করছে উদ্বেগ, আতঙ্ক। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে কেউ বের হচ্ছেন না।

আওয়ামী লীগের দুই সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগ এবং ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন ছাত্রলীগ শুক্রবার বিকেল ৩টায় যৌথভাবে ‘শান্তি সমাবেশ’ করবে। বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে এই সমাবেশ আয়োজনের অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।

একই দিন বেলা ২টায় মহাসমাবেশ করবে বিএনপি। নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে এই কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে এই কর্মসূচি আয়োজনে দুই পক্ষকেই ২৩টি শর্ত জুড়ে দিয়েছে ডিএমপি।

শান্তি সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের। এ ছাড়া সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম ও সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এই সমাবেশে কোনো চেয়ার থাকবে না।

অপরদিকে নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এদিকে সরকারের পদত্যাগ দাবিতে রাজধানীর মৎস্য ভবনের সামনে শুক্রবার সমাবেশ করবে গণতন্ত্র মঞ্চ। বৃহস্পতিবার বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সংহতি মিলনায়তনে গণতন্ত্র মঞ্চের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।

মঞ্চের সমন্বয়ক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক জানান, সরকারের পদত্যাগ, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন, সংবিধান সংস্কার করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক দফা দাবিতে বিকেল ৩টায় এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।

এদিকে সকাল ১০টায় সমাবেশ শুরুর চার ঘণ্টা আগেই বিএনপির নেতা–কর্মীতে ভরে গেছে দলটির সমাবেশস্থল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিপুলসংখ্যক নেতা–কর্মী বৃহস্পতিবার রাতেই সমাবেশস্থলে এসে হাজির হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে রাতভর নয়াপল্টনে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিয়েছেন।

সরেজমিন দেখা যায়, কাকরাইল মসজিদের সামনে থেকে নাইটিঙ্গেল মোড় এবং নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়ক হয়ে ফকিরাপুল পর্যন্ত সড়কে বিএনপির নেতা–কর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে মালিবাগ আবুল হোটেল থেকে শুরু করে মালিবাগ, মৌচাক, সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজার, বিজয়নগর পানির ট্যাংকসহ নয়াপল্টনের আশপাশের অলিগলিতে বিপুলসংখ্যক নেতা–কর্মী অবস্থান নিয়েছেন।

রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানা থেকে পৃথক মিছিল নিয়ে নয়াপল্টনে আসছেন নেতা–কর্মীরা। ঢাকার আশপাশের জেলা–উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মিছিল নিয়ে নেতা–কর্মীরা মহাসমাবেশস্থলে আসছেন।

অন্যদিকে গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট থেকে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট এবং সেখান থেকে গুলিস্তানের হল মার্কেট মোড় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশের জন্য রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মসজিদসংলগ্ন রাস্তার অংশ বন্ধ থাকলেও রাস্তার আরেক পাশ দিয়ে যান চলাচল করছে। বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটে মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছে।

মঞ্চের কাছেই বহুসংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি রয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সমাবেশের আশপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাঁজোয়া যানের উপস্থিতি রয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ঢাকার ব্যস্ততম সড়কগুলো ফাঁকা দেখা গেছে। গণপরিবহন চলাচল কমেছে, যাত্রীর সংখ্যাও অন্যদিনের তুলনায় কম। আর জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষ যানবাহন সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন। এ অবস্থা আজ সকালেও বিরাজ করছে। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা নেই বললেই চলে। মানুষের উপস্থিতিও কম। আর যেকোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট। ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়েছে পুলিশ, চলছে ব্যাপক তল্লাশি।

বৃহস্পতিবার রাত থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার এলাকায় পুলিশের নিয়মিত অস্থায়ী চেকপোস্টে তল্লাশি কার্যক্রম চলছে। এ সময় সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে অনেককে। 

ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস ও ট্রাফিক উত্তর বিভাগ) আব্দুল্লাহ হিল কাফী জানান, নিয়মিত তল্লাশির অংশ হিসেবে এখানে সবসময় তল্লাশি চালানো হয়। এ ছাড়া সাভারের বিরুলিয়া, আশুলিয়ার ধউর, জিরানী, জিরাবো ও বাইপাইল এলাকায় চেকপোস্ট কার্যক্রম চলছে। আজ ঢাকায় দুটি দলের কর্মসূচি থাকায় কেউ যাতে কোনো ধরনের নৈরাজ্য চালাতে না পারে তাই তল্লাশিতে জোর দিচ্ছি।

বৃহস্পতিবার রাতে সমাবেশের মঞ্চ নির্মাণ পরিদর্শনে এসে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ঢাকার প্রতিটি এলাকাতে ডাইনি শিকারের মতো আচার-আচরণ করছে পুলিশ। সমাবেশ ঘিরে অসংখ্য নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এখানে সমাবেশের অনুমতি দিয়েও তারা অগণতান্ত্রিক আচরণ করছে। পুলিশ সার্বিক সহায়তা না করে সরকারের হয়ে কাজ করছে।

একইভাবে বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতা প্রতিরোধে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ক্ষমতাসীনদের সতর্ক পাহারায় থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের উচ্চ পর্যায় থেকে। যদিও আওয়ামী লীগ কোনো সংঘাতে যাবে না বলে মঙ্গলবারের যৌথ সভায় বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা সংঘাত করব না। আমরা মাঠে সতর্ক থাকব। যারা সংঘাত করতে আসবে, তাদের প্রতিহত করব। নির্বাচন পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

একই সুরে কথা বললেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি বলেন, যারা উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে বাধা হবে, তাদেরই প্রতিরোধ করা হবে।  আন্দোলনের নামে রাজনীতির মাঠ অরাজকতা করার সুযোগ কাউকে দেয়া হবে না।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে মহাসমাবেশ করার অনুমতি দিয়ে এবার নজরদারিতে নেমেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। বিশেষ করে কাকরাইল, পল্টন, বিজয়নগর ও ফকিরাপুলের প্রতিটি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। অলিগলিতে সাদা পোশাকে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি। ঢাকায় প্রবেশমুখের সবকটি পয়েন্টে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। যানবাহনে চলছে ব্যপক তল্লাশি।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, দুই দলের সমাবেশকে ঘিরে অন্তত ৩০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। র‍্যাব, আনসার, এপিবিএনের থাকবে অন্তত পাঁচ হাজার সদস্য। যাদের প্রায় সবার নজর থাকবে বিএনপির সমাবেশের দিকে। সেখানে কোনো ধরনের সংঘাতের খবর পেলেই অ্যাকশনে যাবে পুলিশ।

এ ছাড়া, বিজিবি থাকবে স্ট্যান্ডবাই। বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হলে তারা মাঠে নামবে। গোয়েন্দা সংস্থা, আনসার, বিজিবি, র‍্যাব ও ঢাকা হাইওয়ে রেঞ্জের কর্মকর্তারা কন্ট্রোল রুমে বসে দুই সমাবেশে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখবেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘সবাই যদি জনদুর্ভোগ সৃষ্টি, জানমালের ক্ষতি, ভাঙচুর করেন কিংবা জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করেন, তখন আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর যার যা কাজ বা অর্পিত দায়িত্ব, তারা তা পালন করবেন। নিরাপত্তা বাহিনী অনেক সুদক্ষ, অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে একটি সুন্দর জায়গায় নিয়ে আসতে তারা রাতদিন সহযোগিতা করছে।’

আপনে দেশ/আরএ

মন্তব্য করুন ।। খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত,আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।

শেয়ার করুনঃ

সর্বশেষ

Advertisement

জনপ্রিয়