ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলি সেনাকে জুতার প্রচারে ব্যবহার, এমন অভিযোগকে ঘিরে তীব্র বিতর্কে জড়িয়েছে বিশ্বখ্যাত ক্রীড়া ব্র্যান্ড অ্যাডিডাস।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড়ের পাশাপাশি উঠেছে বয়কটের ডাক। এক প্রচারণাই কীভাবে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়াল, তা নিয়েই এখন চলছে আলোচনা।
সমালোচকদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে সমর্থন জোগাচ্ছে এবং বিটনকে দিয়ে এমনভাবে তাদের ‘সিঙ্গেল শু সার্ভিস’ (একক জুতার সেবা)-এর প্রচারণা চালাচ্ছে, যা মূলত ইসরায়েলি সেনাসদস্যদেরই সুবিধা প্রদান করে।
গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ চলাকালে একজন ইসরায়েলি সেনা সদস্যকে দিয়ে প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সুবিধার্থে নেয়া একটি উদ্যোগের প্রচারণা চালানো নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কারীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় অন্তত ৫,০০০ মানুষ গুরুতর আঘাতের কারণে অঙ্গ হারিয়েছেন (অ্যাম্পুটেশন)। এমন মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে এ প্রচারণাকে কেন্দ্র করে অ্যাডিডাসের তীব্র সমালোচনা করা হচ্ছে।
২০২১ সালের মে মাসে গাজার কাছে যুদ্ধ চলাকালীন আহত হয়ে নিজের বাঁ পা হারানো বিটনকে এ প্রচারণায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি অ্যাডিডাসের নীতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে উপত্যকাটিতে চলমান গণহত্যার মধ্যে অ্যাডিডাস কীভাবে প্রতিবন্ধকতার বিষয়টিকে দেখছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছেন অনেকে।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ৫,০০০-এর বেশি মানুষের অঙ্গচ্ছেদ করতে হয়েছে এবং ২২,০০০-এরও বেশি মানুষ গুরুতর শারীরিক আঘাতের শিকার হয়েছেন।
আরও পড়ুন : অ্যামাজনের কার্গো প্লেন বিধ্বস্ত, নিহত ৫
ইউনিসেফের ফিলিস্তিন বিষয়ক সর্বশেষ আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১১,০০০-এরও বেশি শিশু এমন আঘাত পেয়েছে যা তাদের জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে।
এছাড়া সেভ দ্য চিলড্রেন ও ইউনিসেফ কে উদ্ধৃত করে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০টিরও বেশি শিশু এক বা উভয় পা হারিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে মে ২০২৬-এর মধ্যে ২,২৭৭ জন অঙ্গচ্ছেদ হওয়া রোগী কে মূল্যায়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৫০২ জনকে কৃত্রিম অঙ্গ (প্রস্থেটিক্স) সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, গাজায় পুনর্বাসন সেবা এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক পণ্যের চরম সংকট রয়েছে। এছাড়া ৪২,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন সেবার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, অঙ্গ হারানো ফিলিস্তিনিরা কি অ্যাডিডাসের এ সেবা বা আলোচনায় সমান গুরুত্ব পাচ্ছে? মূলত 'সিঙ্গেল শু সার্ভিস' উদ্যোগটির চেয়ে অ্যাডিডাসের প্রতিনিধি নির্বাচন এবং যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েই এ সমালোচনা ও ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু।
বিটনকে প্রচারণার মুখ হিসেবে বেছে নেয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিখ্যাত স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেম তাঁর ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে ইসরায়েলি সাবেক সেনাকে দিয়ে অ্যাডিডাসের এ প্রচারণার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অনুসারীদের অ্যাডিডাস বয়কটের আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, অ্যাডিডাস ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ইউরোপে প্রথম এ 'সিঙ্গেল শু সার্ভিস' চালু করে এবং মার্চ মাসে তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইউরোপের ২৩টি দেশের নিজস্ব আউট লেটগুলোতে এ সুবিধা পাওয়া যাবে।
বেলা হাদিদকে নিয়ে অ্যাডিডাসের পূর্ববর্তী বিতর্ক : আমেরিকান-ফিলিস্তিনি মডেল বেলা হাদিদের সঙ্গে ঘটা একটি বিতর্কের ঠিক দু বছর পর অ্যাডিডাস আবারও এ ধরণের সমালোচনার মুখে পড়ল।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে, ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকের স্মৃতিবিজড়িত একটি স্নিকার্স প্রচারণার কাজ থেকে বেলা হাদিদকে সরিয়ে দেয় অ্যাডিডাস। ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় প্রকাশ্যে কথা বলা বেলা হাদিদের উপস্থিতিতে ইসরায়েল সরকার আপত্তি জানানোর পর প্রতিষ্ঠানটি এই পদক্ষেপ নেয়।
ডেইলি মেইলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনার পর বেলা হাদিদ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আইনজীবী নিয়োগ করেছিলেন।
পরবর্তীতে অ্যাডিডাস হাদিদ ও অন্যান্য সহযোগীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, আমরা অনিচ্ছাকৃত একটি ভুল করেছি। এই ঘটনার কারণে আমাদের সঙ্গী বেলা হাদিদ, এএসএপি নাস্ট, জুলস কুন্দে এবং অন্যদের ওপর পড়া নেতিবাচক প্রভাবের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত এবং আমরা প্রচারণাটি পুনর্মূল্যায়ন করছি।
তবে ক্ষমা চাইলেও হাদিদকে প্রচারণায় ফিরিয়ে নেয়নি তারা, যার ফলে সেসময়ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বয়কটের ঝড় ওঠে।
এক ব্যবহারকারী লিখেছিলেন, বেলা হাদিদ একজন নায়ক! আশা করি বেলাকে বয়কট করার খেসারত অ্যাডিডাসকে দিতে হবে।
অন্য একজন পোস্ট করেছিলেন, দুঃখিত, বেলা হাদিদের প্রতি এমন মেরুদণ্ড হীন আচরণের পর আমি আর অ্যাডিডাসের পণ্য কিনছি না।
ইস্তাম্বুল জাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর পরিচালক এবং ফিলিস্তিনি অ্যাক্টিভিস্ট সামি আল-আরিয়ান বার্তা সংস্থা আনাদঝলুকে বলেছেন, অ্যাডিডাস বারবার ফিলিস্তিনিদের মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন করা বিখ্যাত ব্যক্তিদের নিশানা করার অপরাধে দোষী।
তিনি বলেন, আমার মনে হয় এবার অ্যাডিডাসের পণ্যের বিরুদ্ধে জোরালো বয়কট হওয়া উচিত। নীতি-নৈতিকতার চেয়ে মুনাফাকে প্রাধান্য দেওয়ার শিক্ষা তাদের পাওয়া উচিত। ফিলিস্তিন ইস্যুতে কোম্পানির এই আচরণকে তিনি ‘ভণ্ডামির চরম সীমা’ বলে অভিহিত করেন।
ব্রিটিশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক সামি হামদি আনাদোলুকে জানান, গাজা যুদ্ধের পর বয়কটের মুখোমুখি হওয়া অন্যান্য বড় ব্র্যান্ডগুলোর মতো অ্যাডিডাসকেও এবার বড় ধরনের মাসুল গুনতে হতে পারে।
হামদি বলেন, ম্যাকডোনাল্ডস, স্টারবাকস, কেএফসি এবং অন্যান্য ব্র্যান্ডগুলো ইতিমধ্যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে বয়কট আন্দোলনের প্রভাবে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছে, অনেক জায়গায় আউটলেট বন্ধ করতে হয়েছে। অ্যাডিডাসকেও একইভাবে বয়কটের ডাক দেয়া হচ্ছে।
আপন দেশ/এমটিআই
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































