ছবি : সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশের সংকট নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি। তীব্র তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা ও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। প্রাণ হারাচ্ছেন লাখো মানুষ। প্রতিবছর ৫ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্বজুড়ে।
নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনকে বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনার আহবান জানানো হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের নেতৃত্বে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় তৈরি ল্যানসেট কাউন্টডাউন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ৩০টির বেশি দেশের শতাধিক প্রতিষ্ঠানের ১৪৬ জন গবেষক এতে অংশ নেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তীব্র গরমের সঙ্গে বছরে গড়ে ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষকদের হিসাব, এসব মৃত্যুর ৬৮ শতাংশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী। ২০২৩ সালে তীব্র গরমের সঙ্গে প্রায় ৭ লাখ ১০ হাজার মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া যায়। এর ৭১ শতাংশের বেশি মৃত্যুর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকেরা জানান, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে প্রায় ৩০ লাখ মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাদের মতে, জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার গতি মোকাবিলার উদ্যোগের চেয়ে দ্রুততর হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তীব্র গরমের কারণে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় ২০২৫ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য আয়হানি হয়েছে ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি। টানা তৃতীয় বছরের মতো এই ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
আরও পড়ুন <> ইউনিক্লোকে বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগের আহবান প্রধানমন্ত্রীর
এছাড়া ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আগের দশকের তুলনায় চরম খরার কবলে পড়া স্থলভাগের বিস্তারের গতি প্রায় ৭০০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি স্থলভাগ অন্তত এক মাস চরম খরার শিকার হয়।
অন্যদিকে, অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কবলে পড়া স্থলভাগের হার ২০০৬–২০১৫ সালের ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৬–২০২৫ সালে ১৭ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির কথাও বলা হয়েছে। ২০২৫ সালে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে রেকর্ড ২ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এই বিনিয়োগ জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগের তুলনায় ৮২ শতাংশ বেশি।
২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি গৃহীত হওয়ার সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন, আমাদের এই একমাত্র গ্রহটিকে রক্ষার জন্য এ চুক্তিই এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে বড় সুযোগ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার ২০১৬ সালের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। পরিচ্ছন্ন বায়ুর কারণে বিভিন্ন দেশে বছরে আনুমানিক ৩ লাখ ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। তবে অন্য অঞ্চলে বায়ুদূষণ বাড়ায় বিশ্বজুড়ে এই সুফলের পুরোটা পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বে মোট জ্বালানি সরবরাহের ৮০ শতাংশের বেশি এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এর ফলে সৃষ্ট বায়ুদূষণে বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় ২৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।
গবেষকেরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত ও ন্যায্যভাবে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো, স্বাস্থ্যকে জলবায়ু নীতির মূল লক্ষ্য করা, জলবায়ু ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি এবং উন্নত দেশগুলোর অনুদান ও স্বল্প সুদের ঋণ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন।
পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগ নেয়ার আহবান জানিয়েছেন তারা। সূত্র: এবিসি নিউজ
আপন দেশ/এমটিআই





































