ছবি: আপন দেশ
আমন মৌসুম সামনে রেখে কৃষকের সারের চাহিদা বাড়ছে। এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার নিয়ে একধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, সার মজুত থাকার পরও কিছু অসাধু ডিলার কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ফলে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে খুচরা বাজার থেকে সার কিনতে হচ্ছে তাদের।
অথচ সরকারি হিসাবে, জাতীয় পর্যায়ে সারের মজুতে ঘাটতি নেই। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, দেশে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার সরকারের হাতে মজুত রয়েছে। কৃষকদের অগ্রিম সার কেনার কোনো প্রয়োজন নেই।
কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু কৃষক অগ্রিম সার কিনতে যাওয়ায় এবং কয়েকজন ডিলার সময়মতো সার উত্তোলন ও বিতরণ না করায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। যারা সার উত্তোলন বা বিতরণে দেরি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারকে হেয় করার উদ্দেশ্যে বিচ্ছিন্নভাবে সৃষ্ট ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, দেশে মোট কত সার মজুত আছে এবং এলাকাভেদে কত সার বরাদ্দ ও বিতরণ করা হচ্ছে, তা স্বচ্ছভাবে জানানো দরকার। উপজেলা পর্যায়ে মজুত ও বিতরণব্যবস্থায় সরকারের সরাসরি তদারকি বাড়ানো গেলে চলমান অস্থিরতা কমতে পারে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন খাতের মতো কৃষি উপকরণের বিপণন ও সরবরাহব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে সার নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ উঠেছে।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সার না পাওয়ার আশঙ্কায় এক ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে ২২৫ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান কৃষকেরা। বগুড়ায়ও সার নিয়ে অস্থিরতার খবর পাওয়া গেছে। মেহেরপুরের গাংনীতে ডিলারদের কারসাজি, কালোবাজারি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ রয়েছে। যশোরের চৌগাছায়ও অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলারদের একটি চক্র সার নিয়ে কারসাজি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ডিলারের গুদাম থেকে কৃষকের সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাতেও গুদামে পর্যাপ্ত সার ছিল। ঘাটতি ছিল না। তাঁর দাবি, সেখানে কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করা হয়েছিল। সরকারি পদক্ষেপের ফলে এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন তিনি।
বদলেছে সার বিতরণের নীতিমালা
সার বিতরণব্যবস্থায় অস্থিরতার আরেকটি কারণ হিসেবে সামনে এসেছে নতুন ডিলার নিয়োগ নীতিমালা। ২০২৫ সালের সমন্বিত নীতিমালায় সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাব্যবস্থা বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর ফলে দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে সার বিতরণের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ীর ভূমিকা বদলে যায়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, দেশে প্রায় ১০ হাজার ৮০০ ডিলারের পাশাপাশি প্রায় ৪৫ হাজার খুচরা বিক্রেতা ছিলেন। নতুন ব্যবস্থায় তাদের আগের ভূমিকায় থাকার সুযোগ নেই। গত ৯ আগস্ট সংশোধিত নীতিমালা বাস্তবায়নে অফিস আদেশ জারির পর এ পরিবর্তন আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
সরকারি হিসাবে মজুত পর্যাপ্ত
দেশে সারের চাহিদা মেটাতে প্রতিবছরই আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। কারণ দেশের উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় কম। আবার গ্যাস-সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি ও কাঁচামালের সংকটে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোও বছরের বড় একটি সময় বন্ধ থাকে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও দেশের মোট সারের চাহিদার প্রায় ৮৩ শতাংশ আমদানি করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন রাসায়নিক সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টন।
আরও পড়ুন<<>>স্বর্ণের দামে বড় পতন, ভরিতে কত কমলো
কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে চার ধরনের প্রধান সারের চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টন। সারা বছরের মোট চাহিদা ৬৭ দশমিক ৭০ লাখ টন।
মৌসুমের শুরুতে ইউরিয়ার প্রারম্ভিক মজুত ছিল ৬ দশমিক ১৪২ লাখ টন, ডিএপি ৪ দশমিক ৫৮৮ লাখ, টিএসপি ৪ দশমিক ০৯৫ লাখ এবং এমওপি ২ দশমিক ৮৪৯ লাখ টন। ১৯ আগস্ট চার ধরনের সারের সম্মিলিত মজুত ছিল ১৭ দশমিক ৬৭৪ লাখ টন।
ফলে প্রারম্ভিক মজুতের পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন ও নিয়মিত আমদানির চালান অব্যাহত থাকলে জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের সারের ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সরকারি হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার পার্থক্যই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের ছয়টি সার কারখানায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৩ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে গড়ে ১৫ থেকে ১৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে তিনটি কারখানা বন্ধ রয়েছে। বাকি তিনটি কারখানাতেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় সার উৎপাদন কমেছে।
কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে তো?
সারের সংকটের প্রভাব শুধু সার না পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে আমন মৌসুমে সময়মতো সার না পেলে কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, সরকারি গুদাম বা ডিলার পর্যায়ে কত সার মজুত আছে—শুধু এ তথ্য দিয়ে সরবরাহব্যবস্থার কার্যকারিতা বিচার করা যায় না। নির্ধারিত দামে কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, দেশে সার কম থাকলেও যতটুকু আছে, সেটি সঠিকভাবে মাঠপর্যায়ে যাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা দরকার। তিনি বলেন, ধরে নিলাম সার কম আছে, কিন্তু যতটা আছে, সেটা মাঠে যাচ্ছে না কেন? কুড়িগ্রামে যে সার গুদাম ভেঙে নেয়া হলো, সার পেলে তো আর সেটা হয় না।
অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডলের মতে, সার বিতরণব্যবস্থায় আগে একটি মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী ছিল। এখন নতুন কোনো গোষ্ঠী সেখানে যুক্ত হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি বলেন, এখন একটা পিক সময়। সার যদি সঠিক সময়ে না পায়, তাহলে কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা কাজ করবে। ফলে অনেক কৃষকের মধ্যে ভবিষ্যতের জন্য সার মজুত করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
এ অধ্যাপকের মতে, দেশে মোট কত সার মজুত আছে এবং এলাকাভেদে কত সার বরাদ্দ ও বিতরণ করা হচ্ছে, তা সরকারকে স্বচ্ছভাবে জানানো উচিত।
রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, কোন উপজেলায় কী পরিমান সার বরাদ্দ আছে, সেটা যখন সবাই জানবে এবং সে অনুযায়ী সরবরাহ করা হবে, তাহলে ডিলার পর্যায়ে বা যেকোনো পর্যায়ে মজুতের অভিযোগ উঠবে না।
সার জাতীয় পর্যায়ে কী পরিমান আছে, তার হিসাবের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে সে সার কোথায় যাচ্ছে, কতটা যাচ্ছে এবং কৃষকেরা নির্ধারিত দামে তা পাচ্ছেন কি না—এসব তথ্য প্রকাশ ও নিয়মিত তদারকিই এখন সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতা কমানোর অন্যতম উপায় হতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
আপন দেশ/মিম
মন্তব্য করুন # খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, আপন দেশ ডটকম- এর দায়ভার নেবে না।





































